ভারতে একের পর এক জাতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, ফলাফল জালিয়াতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার নজিরবিহীন সংকটের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি।
শনিবার (৬ জুন) দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত ক্ষুব্ধ তরুণ ও শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্ব পদত্যাগ দাবি করেছেন। ব্যতিক্রমী এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা এবং সিবিএসই বোর্ডের ফলাফল নিয়ে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয়। এই ক্ষোভের পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করেন। ভারতের প্রধান বিচারপতির এক বক্তব্যে কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ বলে অভিহিত করার পর অভিজিৎ প্রশ্ন তুলেছিলেন, “যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে জড়ো হয়, তাহলে কী হবে?”
সেখান থেকেই মূলত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র উৎপত্তি। ব্যঙ্গাত্মক নাম নিয়ে শুরু হলেও এটি দ্রুতই তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত অনলাইনের সেই ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তা বাস্তব রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেয়।
গতকাল ভোর থেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে দলে দলে তরুণরা দিল্লিতে পৌঁছাতে শুরু করেন। মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সৌরভ কুশওয়াহা জানান, শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজা হিসেবে একে অনুসরণ করলেও এখন তাঁর বিশ্বাস, এই আন্দোলনের মাধ্যমে সত্যিই পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বিক্ষোভস্থলে অনেক তরুণকেই প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে তেলাপোকার মুখোশ পরে উপস্থিত হতে দেখা যায়। কারও হাতে ছিল ফুল, আবার কারও হাতে বই। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি পরে বক্তব্য দেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
তিনি আরও যোগ করেন, দেশের প্রতিটি মা এখন এই ভয়ে থাকেন যে সন্তান যদি সরকারের ভুল নীতির সমালোচনা করে, তবে তাকে হয়তো গ্রেপ্তার হতে হবে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দিল্লির বাসিন্দা মোহাম্মদ আফতাব জানান, তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে তিনি পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি এবং বর্তমানে পণ্য সরবরাহের (ডেলিভারি বয়) কাজ করেন। একদিনের আয় হারানোর ঝুঁকি নিয়েও তিনি আন্দোলনে এসেছেন। আফতাবের ভাষায়, “লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের প্রশ্নে এভাবে আর নীরব থাকা যায় না।”
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, এই তীব্র আন্দোলন ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে যন্তর মন্তরে দায়িত্বরত এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা (যার নিজের মেয়েও এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই উদ্বেগ খুবই স্বাভাবিক। এমন এক সময় আসে যখন মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এবং রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না।



