লন্ডনে সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ গ্রেপ্তার

সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ বেশ কয়েকজনকে লন্ডন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লন্ডনের একটি হোটেলে তেল ও গ্যাস কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্মেলন চলছিল। ওই হোটেলের সামনে “ওয়েলি মানি আউট” শীর্ষক এক বিক্ষোভে অংশ নেন থুনবার্গরা।

সেখান থেকে মঙ্গলবার (১৭ অক্টোবর) তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বিক্ষোভের আয়োজক ছিল পরিবেশবাদী সংগঠন ফসিল ফ্রি লন্ডন ও গ্রিনপিস৷

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, “জীবাশ্ব জ্বালানি নিয়ে কাজ করা কোম্পানিগুলো বেশি লাভের জন্য ইচ্ছে করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিচ্ছে৷”

গ্রেপ্তারের আগে থুনবার্গ গণমাধ্যমকে বলেন, “দরজা বন্ধ করে সম্মেলনের নামে মেরুদণ্ডহীন রাজনীতিবিদেরা ধ্বংসাত্মক জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের লবিস্টদের সাথে চুক্তি এবং আপস করছেন৷”

তিনি আরও বলেন, “জীবাশ্ম জ্বালানিতে পৃথিবী ডুবে যাচ্ছে৷ আমাদের আশা, স্বপ্ন ও জীবন মিথ্যার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে এটি স্পষ্ট যে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কাজ করা কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক মডেলগুলোর পরিণতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত ছিল৷ কিন্তু তারপরও তারা কিছু করেনি৷”

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচিত থুনবার্গ বলেন, ‘‘শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে এই সম্মেলন বিঘ্নিত করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই৷ আমাদের প্রতিবারই তা করতে হবে৷ আমাদের তাদের দেখিয়ে দিতে হবে যে, এ থেকে তারা রেহাই পাবেন না।”

লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ “এক্সে” (সাবেক টুইটার) বিক্ষোভস্থল থেকে ২০ জনকে আটকের খবর জানিয়েছে৷

এর আগে এই বছর বিক্ষোভ করতে গিয়ে সুইডেন, নরওয়ে ও জার্মানিতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন থুনবার্গ৷

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে সফল হয়েছেন গ্রেটা। বিষয়টিকে বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছেন। বলা যায়, এই আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন কৈশোরেই।

গ্রেটার জন্ম ২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি সুইডেনের স্টকহোমে। ৮ বছর বয়সে তার “অ্যাসপারজার সিনড্রোম” ধরা পড়ে, যা একধরনের বিকাশগত ব্যাধি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষেরা একটা ধারণা বা আগ্রহের ওপর গভীরভাবে মনোনিবেশ করে। গ্রেটার ক্ষেত্রে এই বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তন।

গ্রেটা ২০১৮ সালে স্থানীয় এক পত্রিকায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পান। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সুইডেনের জাতীয় নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে পার্লামেন্টের সামনে বসে পড়েন গ্রেটা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আইনপ্রণেতাদের উদ্বুদ্ধ করতে “স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট” লেখা একটা ব্যানার নিয়ে শুরু করেন অবস্থান কর্মসূচি। এই আন্দোলন গ্রেটা একাই শুরু করেছিলেন। পরদিন থেকে অনেকেই তার পাশে দাঁড়াতে শুরু করে। তার এই আন্দোলন প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাখ লাখ মানুষ একই আদলে আন্দোলন শুরু করে। সংসদ নির্বাচনের পর গ্রেটা আবার স্কুলে ফিরে যান। এরপর “ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার” নামে একটা আন্দোলন শুরু করেন। প্রতি শুক্রবার স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন গ্রেটা। তার এই অভিনব প্রতিবাদও অল্প দিনের মধ্যে সুইডেন এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেটা ইউরোপজুড়ে ট্রেন ভ্রমণ শুরু করেন এবং বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিতে থাকেন। গ্রেটা পুরো ২০১৯ সাল স্কুল থেকে ছুটি নেন।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ জলবায়ুবিষয়ক অধিবেশনে গ্রেটার আবেগপূর্ণ ভাষণ বিশ্বনেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

গ্রেটা নেতাদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা আমাদের স্বপ্ন ও শৈশব হরণ করেছেন। বিশ্বের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ মারা যাচ্ছে। পুরো বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। আমরা একটা ব্যাপক বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে আছি। আর আপনারা শুধু অর্থ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গালগল্প করে যাচ্ছেন। কত বড় দুঃসাহস আপনাদের!”