সোমালিয়ার জলদস্যুরা কী চায়, তাদের উত্থান যেভাবে

ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের তৎপরতা বেশ আগে থেকেই। তবে সম্প্রতি তাদের কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) এই জলদস্যুরা বাংলাদেশি একটি জাহাজ ছিনতাই করে ২৩ জন নাবিককে জিম্মি করে আবার আলোচনায় এসেছে।

সোমালিয়ার জলদস্যুদের নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে। এদের উত্থানের নেপথ্যে কী কিংবা তাদের উদ্দেশ্যই বা কী। এক প্রতিবেদনে সেগুলো তুলে ধরেছে বিবিসি বাংলা।

হঠাৎ করে সোমালিয়ার জলদস্যুদের আবার তৎপর হয়ে ওঠার পেছনে লোহিত সাগরে হুথিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক বাহিনীগুলো বেশি ব্যস্ত থাকাকে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই সুযোগটি সোমালিয়ার জলদস্যুরা কাজে লাগাচ্ছে বলে মত তাদের। এভাবেই ভারত মহাসাগরের গালফ অফ এডেনে তারা আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে।

সোমালিয়ায় জলদস্যুতার উত্থান যেভাবে

১৯৬০ সালে সোমালিয়ার জন্ম; তার আগে দেশটি ইতালির উপনিবেশ ছিল। ১৯৯১ সালে সামরিক শাসনের উৎখাতের পরে নৈরাজ্যের মধ্যে পড়ে দেশটি। পরের দুই দশকের বেশি সময় যুদ্ধবিগ্রহে বিধ্বস্ত সোমলিয়াতে কার্যকর কোনো সরকার ছিল না।

এই সময়টাতে আফ্রিকার মধ্যে দীর্ঘতম উপকূল সমৃদ্ধ দেশটির জলসীমার নিরাপত্তায় কোনো কোস্টগার্ড বা বাহিনী ছিল না। এতে এই অঞ্চলে বিদেশি মাছ ধরা নৌযানের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। এতে স্থানীয় জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে, তারা দস্যুবৃত্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

ইন্ডিয়ান ওশান কমিশনের সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতেও ওই সময়ের দস্যুতার নেপথ্যে এই কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। তাছাড়া, মাছ শিকারের চেয়ে দস্যুতায় আয়ের পরিমাণও অনেকগুণ বেশি।

তবে, কয়েক বছর তাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ওই রুটে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়। এর ফলে, ২০১২ সাল নাগাদ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে দস্যুবৃত্তি।

আবার কেন সক্রিয় জলদস্যুরা?

গত কয়েক মাসে সোমালি জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধানে কাজ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনী বা ইইউন্যাভ ফর আটালান্টা। তাদের মতে, গত বছরের নভেম্বরে থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে সোমালি উপকূলে অন্তত ১৪টি জাহাজ হাইজ্যাক করা হয়েছে।

এর মধ্যে ইরানের পতাকাবাহী একটি মাছ ধরার নৌকা এবং লাইবেরিয়ান-পতাকাবাহী সেন্ট্রাল পার্ক নামের একটি জাহাজের জেলে ও নাবিকদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

সেন্ট্রাল পার্কের উদ্ধার তৎপরতায় মার্কিন নৌবাহিনী জড়িত ছিল। পরে তারা জানায়, এটা স্পষ্টতই দস্যুতা এবং আক্রমণকারীরা ছিল সম্ভবত সোমালিয়ার। ডিসেম্বরে এমভি রুয়েন নামে মাল্টার পতাকাবাহী একটি জাহাজ হাইজ্যাক করা হয়। এখনও জাহাজের নিয়ন্ত্রণ হামলাকারীদের হাতে, জিম্মি আছেন ১৭ জন ক্রু।

ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরোর (আইএমবি) মতে, এটি ছিল ছয় বছরের মধ্যে সোমালিয়ায় প্রথম সফল হাইজ্যাকিং। আইএমবি একটি প্রভাবশালী অলাভজনক সংস্থা যা সামুদ্রিক অপরাধ মোকাবিলা করার লক্ষ্যে কাজ করে।

জানুয়ারিতে ভারতীয় নৌবাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায়। এক সপ্তাহে তিনটি অভিযানে ১৯ জন জিম্মিকে মুক্ত করতে সমর্থ হয় তারা। তাদের মধ্যে ১১ জন ইরানি নাগরিক, বাকিরা পাকিস্তানি।

ভারতীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, “এদের সবাই সোমালিয়ার দস্যুদের হাতে বন্দী ছিলেন।”

বিবিসি’র রিয়েলিটি চেক টিমের প্রতিবেদন বলছে, শুধু ২০১৮ সালেই পূর্ব আফ্রিকান জলসীমায় ১১২টি নৌ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। যার সর্বশেষ শিকার বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ। কয়লা নিয়ে আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে দুবাইয়ের দিকে যাওয়ার পথে মঙ্গলবার ২৩ জন ক্রুসহ জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেয় জলদস্যুরা।

হুথিদের ঠেকাতে গিয়ে অরক্ষিত সোমালিয়া উপকূল

পূর্ব আফ্রিকা উপকূলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিকে কাজে লাগাচ্ছে জলদস্যুরা। দস্যুরা স্বভাবতই সুযোগসন্ধানী। তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করে নানাভাবে। এবারও সেটিই করছে তারা।

রয়্যাল ড্যানিশ ডিফেন্স কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ট্রোয়েলস বুরচাল হেনিংসেন বলেন, “২০০৫ থেকে ২০১২ সালে ব্যাপকভাবে জলদস্যুতা বেড়ে গিয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক বাহিনী ওই জলসীমায় টহল জোরদার করে। কিন্তু সম্প্রতি লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী বেশ কিছু জাহাজে আক্রমণ করায় পশ্চিমা বাহিনীগুলোকে সেইদিকে বেশি নজর দিতে হয়েছে।”

তিনি বলেন, “সামরিক দিক থেকে দেখলে (হুথিদের) ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের আক্রমণ মোকাবিলা করাটা বেশি জরুরি। তাই ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র সামাল দিতে গিয়ে জলদস্যুদের দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না তারা।”

ইন্ডিয়ান ওশান কমিশন (আইওসি) পূর্ব আফ্রিকার জলসীমার সেশেলস এবং কমোরোসের মতো দেশগুলোর একটি আঞ্চলিক সংস্থা। সংস্থাটিও বলছে একই কথা। গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে, আইওসি হাইজ্যাকিং বেড়ে যাওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণও উল্লেখ করেছে।

দেড় দশক আগে প্রথম দফায় জেলেরা যে দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েছিল, তার অন্যতম কারণ হলো বিদেশি ট্রলার এসে তাদের এলাকায় অবৈধভাবে মাছ ধরতো। ফলে, স্থানীয় জেলেরা জীবিকার সংকটে পড়ে ডাকাতিকে পেশা নিতে বাধ্য হয়।

আইওসি বলছে, বর্তমান সোমালি মৎস্য নীতির কারণে আবারও বিদেশি মাছ ধরার জাহাজের উপস্থিতি বাড়ছে। এতে আবার উপকূলীয় সোমালিরা জলদস্যুতার পথে পা বাড়াবে এমন সতর্কতা জানায় সংস্থাটি।

সোমালিয়াভিত্তিক আল-শাবাব সশস্ত্র গোষ্ঠী ডাকাতিতে উস্কানি দিচ্ছে এমন প্রসঙ্গও উঠে আসে আইওসি’র বিবৃতিতে। একটি কথিত সমঝোতার কথা শোনা যায়। যার বদৌলতে আল শাবাব দস্যুদের সুরক্ষা দেয়। বিনিময়ে আদায়কৃত মুক্তিপণের একটি ভাগ পায় তারা।

দস্যুদের উদ্দেশ্য কী? আয় কেমন?

পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলকে হর্ন অফ আফ্রিকা বলা হয়। ২০০৫ থেকে ২০১২ পর্যন্ত সময়কালে হর্ন অফ আফ্রিকার দস্যুরা কী পরিমাণ অর্থ আদায় করেছে তার একটি আনুমানিক হিসাব করেছে বিশ্বব্যাংক।

সেই হিসাব অনুযায়ী জলদস্যুরা ক্রুদের জিম্মি করে সাড়ে তিনশ’ থেকে সোয়া চারশ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ আদায় করেছে।

এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে নাইজেরিয়ার ফেডারেল ইউনিভার্সিটির লেকচারার স্যামুয়েল ওয়েওল বলেন, “ছিনতাইয়ের পেছনে মূল লক্ষ্য মুক্তিপণ আদায় বলেই ধারণা করা যায়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর নেপথ্য এটিই মূল কারণ।”

হামলার প্রতিক্রিয়া

আইওসি তার বিবৃতিতে পরিস্থিতিকে “উদ্বেগজনক” বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের অ্যান্টি পাইরেসি গ্রুপকে শিগগিরই জরুরি বৈঠকে বসার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরোর (আইএমবি) তথ্যমতে, এমভি রুয়েনের সেই ১৪ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত হাইজ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে থাকা “উদ্বেগের”।

সোমালি দস্যুতার পুনরুত্থান?

সাম্প্রতিক হামলাগুলোর অন্তত ছয়টিকে জলদস্যুতা বলে চিহ্নিত করেছে আইএমবি। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাগুলোকেই শুধু জলদস্যুতা হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে তারা।

ইউরোপিয়ান নৌবাহিনী এমভি রুয়েনের ঘটনাটিকে একটি টেস্টকেস হিসেবে দেখছে। তারা বলছে, এই জাহাজটির ভবিষ্যত থেকেই ইঙ্গিত মিলবে ওই অঞ্চলে দস্যুতার “পুনরুত্থান” দেখা যাবে কি-না। যদি এখান থেকে ভালো অর্থ আদায় করতে পারে, মৌসুমজুড়ে নৌ-ডাকাতি একটি লাভজনক পেশা হিসেবে আকৃষ্ট করতে পারে তাদের।

মার্চে বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজে আক্রমণ ক্রমবর্ধমান দস্যুবৃত্তিরই ইঙ্গিত দেয়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ চেস্টারের হর্ন অফ আফ্রিকার মেরিটাইম সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ জেস সিমন্ডস বলেন, “ছিনতাইগুলোকে অবশ্যই কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে সামলানো উচিত।” জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত একটি সংজ্ঞার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

সংজ্ঞা অনুসারে, জলদস্যুতা গভীর সমুদ্রে হয়, অর্থাৎ যে জলসীমা কোনো দেশের এখতিয়ারের বাইরে।

ইইউন্যাভ ফর আটালান্টার তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক ছিনতাইয়ের অর্ধেক সোমালিয়ার আঞ্চলিক জলসীমায় ঘটেছে। এর অন্য বিপদও আছে। সোমালিয়া থেকে দূরে হওয়ার কারণে যে কোনো আক্রমণই জলদস্যুতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হুথি আক্রমণ প্রতিহত করার পাশাপশি আন্তর্জাতিক নৌ বাহিনীর এই অঞ্চলেও উপস্থিতি বাড়ানো উচিত, যাতে জলদস্যুতায় পুনরুত্থান না ঘটে।

দস্যুদের সঙ্গে পেরে ওঠা যায় না কেন

জাহাজের মালিকদের লুকআউট বা দ্রুতগতিতে ভ্রমণের মতো পরামর্শ দিয়ে থাকে আইএমবি। যাতে জলদস্যুরা তাদের ধরতে না পারে। কিন্তু জলদস্যুরাও ঝটিকা আক্রমণ চালায়। রাতের অন্ধকারে হাজির হয় তারা। অনেকসময় ক্রদের বুঝে উঠার আগেই এটি ঘটে যায়।

একবার জলদস্যুরা কোনো জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়। কারণ তাতে জিম্মিদের হতাহত হওয়ার শঙ্কা বাড়ে।

গভীর সমুদ্রে আটক জলদস্যুদের বিচারের মুখোমুখি করতে জটিলতার কারণে কখনো কখনো ছেড়েও দেওয়া হতো। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি রেজুলেশন আছে যাতে নিরাপত্তায় নিয়োজিত দেশগুলোকে সোমালি জলসীমায় দস্যুদের ধরার অনুমতির কথা বলা আছে।

জলদস্যু মোকাবিলায় প্রতিবন্ধকতা কী

সমুদ্রে নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টায় দস্যুবৃত্তির পুনরায় ব্যাপকভাবে ফিরে আসা ঠেকাতে হবে। এক্ষেত্রে বাহিনীগুলোর সাফল্যও কম নয়।

ইউরোপিয়ান নৌবাহিনীর পাশাপাশি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি অনেক দস্যুতার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। আইওসি’র অভিযোগ, ইইউন্যাভ বর্তমানে স্প্যানিশ নৌবাহিনীর একটি মাত্র জাহাজ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতীয় নৌবাহিনী ছাড়া জলদস্যুতা প্রতিরোধে সক্রিয় থাকা অন্য নৌবাহিনীগুলোর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হয়েছে। সোমালিয়ায় হামলা মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দুটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে নজর দিতে হবে।

নাইজেরিয়ার ফেডারেল ইউনিভার্সিটির লেকচারার স্যামুয়েল ওয়েওল হুথি বিদ্রোহীদের বক্তব্য উল্লেখ করেন। গোষ্ঠীটির বক্তব্য, তারা জাহাজে আক্রমণ বন্ধ করবে এবং সামুদ্রিক তৎপরতা কমিয়ে আনবে যদি ইসরাইল গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করে।

দ্বিতীয়ত, নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করা সোমালিল্যান্ড এবং ইথিওপিয়ার মধ্যে একটি বিতর্কিত বন্দর চুক্তি হয়েছে। যা সোমালিয়াকে কূটনৈতিক টানাপোড়েনে ফেলে দিয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে জলদস্যুতা মোকাবিলা করা দেশটির জন্য কঠিন হবে।