সর্বসম্মতিক্রমে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের অভিশংসন বহাল রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছেন দেশটির সাংবিধানিক আদালতের বিচারকদের প্যানেল।
শুক্রবার (৪ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির প্রেসিডেন্টের পদ থেকে তাকে অপসারণ করা হলো। ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অযাচিতভাবে সামরিক আইন জারির দায়ে প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলকে অভিশংসন ও বরখাস্ত করা হয়। সেসময় দেশটির সংসদের ভোটে তাকে সাময়িকভাবে অপসারণ করা হয়।
অবশেষে শুক্রবার সাংবিধানিক আদালতের রায়ে এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হলো। পরবর্তী ৬০ দিনের মাঝে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এ রায়ের মধ্য দিয়ে ইউনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হলেও দেশটির পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রাজধানী সিউলের রাস্তায় ইউনপন্থী ও বিরোধী হাজারো বিক্ষোভকারী অবস্থান নিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে দেশটির বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যান ডাক-স্যু জননিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য একটি জরুরি আদেশ জারি করেছেন।
তিনি বলেছেন, “প্রশাসন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখবে এবং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও বিদেশ নীতিতে শূন্যতা সৃষ্টি হতে দেবে না।”
নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
শুক্রবার আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ইওলের সামরিক শাসন জারি ন্যায়সঙ্গত ছিল না। গত বছর তড়িঘড়ি করে সামরিক আইন জারি করে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছিলেন ইউন সুক ইওল।
সাংবিধানিক আদালতের কার্যনির্বাহী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি মুন হিয়ং-বে বলেন, “জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ওই পরিস্থিতি সেনা মোতায়েন ছাড়া ভিন্ন উপায়ে সমাধান করা সম্ভব ছিল।”
দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন জারি করতে ইউন সুক ইওলের সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত জাতীয় পরিষদের বৈধতার ওপর হস্তক্ষেপ করেছে বলে মতামত দিয়েছেন বিচারপতি। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বা জাতীয় পরিষদ বলতে দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদকে বোঝানো হয়।
বিচারপতি মুন হিয়ং-বে আরও বলেন, “প্রেসিডেন্ট নিজের দায়িত্ব পালন করেননি এবং সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে গিয়েছেন। অথচ তার তাদেরকে রক্ষা করার কথা ছিল।”
অভিশংসন বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রসিকিউটর হিসেবে ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা জাং চুং-রে।
তিনি রায় ঘোষণার পরে বলেন, “এটি সংবিধান, গণতন্ত্র ও জনগণের জন্য এক বিজয়। আমি জনগণকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের শত্রুকে পরাজিত করেছে।”
জানা গেছে, ইউন সুক ইওলের দল শাসন ক্ষমতায় থাকা “পিপল পাওয়ার পার্টি” আদালতের রায় মেনে নিয়েছে এবং কোরিয়ার জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে।
তবে, ইউন সুক ইওলের অ্যাটর্নি ইউন গ্যাপ-গেউন এই সম্পূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়া অবৈধ ও অন্যায্য বলে মন্তব্য করেছেন।
রায় ঘোষণার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই রায়ের ফলাফল তাদের বোধগম্য না। আমার দুঃখ লাগছে এই ভেবে যে এটি সম্পূর্ণভাবে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।”
রাজনীতিতে নবাগত নেতা ইউন সুক ইউল ২০২২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে জয়ী হন। কিন্তু দ্রুতই তিনি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন, যার বেশিরভাগ ছিল তার স্ত্রী কিম কিওন হি-কে নিয়ে।
ইউনের স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি এক পাদ্রির কাছ থেকে ডিওর ব্র্যান্ডের লাক্সারি হ্যান্ডব্যাগ গ্রহণ করেছেন।
গত এপ্রিলের পার্লামেন্টারি নির্বাচনে বিরোধী দল ভূমিধ্বস জয় পাওয়ার পর, ইউন কার্যত দুর্বল প্রেসিডেন্টে পরিণত হন, যার ক্ষমতা বলতে ছিল কেবল বিলে ভেটো দেওয়া।
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ইউন মার্শাল ল মানে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেন। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের পরে একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে, শেষ পর্যন্ত তা প্রেসিডেন্টের গ্রেপ্তারে গিয়ে ঠেকেছে।
ডিসেম্বর মাসের শুরুতে প্রেসিডেন্ট সামরিক আইন জারি করলে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পার্লামেন্ট এর বিরুদ্ধে ভোট দেয়। ফলে সামরিক আইন প্রত্যাহারে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট।
ভোটে পরাজিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তিনি পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত মেনে নেন এবং সামরিক আইন জারির আদেশ প্রত্যাহার করেন।
এশিয়ার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত এই দেশটিতে প্রায় অর্ধশত বছরের মধ্যে প্রথম সামরিক আইন জারির ঘটনা ঘটলে তাতে হতবাক হন দেশটির মানুষ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সর্বশেষ সামরিক শাসন জারি হয়েছিলো ১৯৭৯ সালে। সেসময় দেশটির দীর্ঘসময়কার সামরিক স্বৈরশাসক পার্ক চুং হি অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছিলেন। পরে ১৯৮৭ সালে দেশটি সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করার পর এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি।