ঘুমের মধ্যে নাক ডাকেন বা শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে? হতে পারে ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’

রাতে ঘুমানোর সময় প্রচণ্ড নাক ডাকা, হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা কিংবা ঘুমের মধ্যে হাসফাস করার মতো সমস্যা হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরও দিনের বেলায় ঝিমুনি বা ক্লান্তি থাকলেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এসব লক্ষণ স্লিপ অ্যাপনিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।

স্লিপ অ্যাপনিয়া শনাক্ত করতে পালমোনোলজিস্ট বা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে চিকিৎসা না করালে বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কী?

‘স্লিপ’ অর্থ ঘুম এবং ‘অ্যাপনিয়া’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় শ্বাসরুদ্ধ হওয়াকে বোঝায়। ঘুমের সময় কিছুক্ষণের জন্য শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যাওয়াকেই স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা হয়।

শ্বাসনালী বন্ধ থাকলে কিছু সময়ের জন্য শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। তখন মস্তিষ্ক সংকেত দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে জাগিয়ে তোলে, যাতে তিনি আবার শ্বাস নিতে পারেন। এ কারণে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুম বারবার ভেঙে যেতে পারে।

ঘন ঘন ঘুম ভাঙার ফলে পর্যাপ্ত ঘুম হলেও দিনের বেলায় ক্লান্তি ও ঝিমুনি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলতে থাকলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ঘুমের সময় ঘাড় ও গলার চারপাশের পেশি শিথিল হয়ে ভেতরের দিকে এলিয়ে পড়ায় স্বাভাবিকভাবেই শ্বাসনালী কিছুটা সংকুচিত হয়। যাদের পেশি তুলনামূলক বেশি শিথিল হয়, বিশেষ করে যাদের ওজন বেশি, তাদের ক্ষেত্রে শ্বাসনালী বেশি সংকুচিত হয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

যেসব লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন

স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে -

  • অস্বাভাবিকভাবে নাক ডাকা। কখনো জোরে নাক ডাকা, আবার কিছুক্ষণ বন্ধ থাকার পর ভিন্ন শব্দে শুরু হওয়া।
  • ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি।
  • বিশেষ করে চিৎ হয়ে ঘুমানোর সময় শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া।
  • ঘুমের মধ্যে ঝাঁকুনি দিয়ে জেগে ওঠা বা বসে পড়া।
  • জেগে ওঠার পর কিছু সময়ের জন্য হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া।
  • দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরও ক্লান্তি থাকা।
  • কাজের সময় কিংবা গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়া।
  • মেজাজ খিটখিটে থাকা বা অবসাদগ্রস্ত বোধ করা।
  • কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হওয়া।
  • ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়া।
  • ওষুধ সেবনের পরও রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকা।
  • পায়ে ম্যাজম্যাজ ভাব ও মাথাব্যথা।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকলে গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। একটি সুইডিশ গবেষণায় স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা আড়াই গুণ বেশি দেখা গেছে।

কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?

স্লিপ অ্যাপনিয়া শনাক্ত করতে বিশেষজ্ঞরা সাধারণত স্লিপ স্টাডি বা পলিসমনোগ্রাফি পরীক্ষা করেন। এতে রোগী ঘুমানোর সময় শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়।

পরীক্ষায় চোখের নড়াচড়া, নাক ডাকার মাত্রা, হৃদস্পন্দন, মস্তিষ্কের তরঙ্গ, পেশির নড়াচড়া এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রাসহ প্রায় ২০টি বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে। একই সঙ্গে রোগী কতক্ষণ গভীর ঘুমে ছিলেন, কখন ঘুম পাতলা হয়েছে বা কখন জেগে উঠেছেন, সেটিও দেখা হয়।

এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে স্লিপ অ্যাপনিয়া রয়েছে কি না এবং থাকলে এর মাত্রা কতটা, তা নির্ধারণ করেন চিকিৎসকেরা। প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে বা রোগীর বাড়িতেও স্লিপ স্টাডি করা যেতে পারে।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসা

প্রাথমিক পর্যায়ে স্লিপ অ্যাপনিয়া শনাক্ত করা গেলে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করলে সমস্যা জটিল হতে পারে এবং হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা ও ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

স্লিপ অ্যাপনিয়া গুরুতর হলে চিকিৎসকেরা সি-প্যাপ বা কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার যন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন। যন্ত্রটির সঙ্গে একটি পাইপ ও মাস্ক থাকে। ঘুমানোর সময় মাস্কটি ব্যবহার করলে এটি শ্বাসনালী খোলা রাখতে এবং অক্সিজেনের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

শুরুতে সি-প্যাপ ব্যবহারে অস্বস্তি হতে পারে। তবে ধীরে ধীরে অনেকেরই এর সঙ্গে অভ্যাস হয়ে যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিবার ঘুমানোর সময় এটি ব্যবহার করতে হয়, এমনকি ভ্রমণের সময়ও সঙ্গে রাখতে হয়।

সি-প্যাপ ব্যবহার সম্ভব না হলে রোগীর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিকল্প চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে। যেমন, টনসিল বা নাকের ভেতরের মাংসপেশি বড় হয়ে শ্বাসনালীতে সমস্যা তৈরি করলে অস্ত্রোপচার করা হতে পারে। আবার ম্যান্ডিবুলার অ্যাডভান্সমেন্ট ডিভাইস বা এমএডি ব্যবহার করেও শ্বাসনালী খোলা রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহারে চোয়াল, মাড়ি ও দাঁতে ব্যথা বা মুখ শুকিয়ে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে লেজার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শ্বাসনালীর পরিধি বাড়ানোর প্রক্রিয়াও করা হয়।

জীবনযাত্রায় পরিবর্তন

স্লিপ অ্যাপনিয়া নিয়ন্ত্রণে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তনও সহায়ক হতে পারে। যেমন -

  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা
  • সুষম খাবার খাওয়া
  • ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • ধূমপান ও মদপান এড়িয়ে চলা
  • কাত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা

তবে শুধু ওজন কমালেই স্লিপ অ্যাপনিয়া পুরোপুরি চলে যাবে - এমন নয়। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে রোগটি মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে এবং জটিলতার ঝুঁকিও কমতে পারে।

নাক ডাকা মানেই কি স্লিপ অ্যাপনিয়া?

নাক ডাকলেই যে স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়েছে, তা নয়। তবে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষের নাক ডাকার সমস্যা থাকতে পারে।

ঘুমের সময় পেশি শিথিল হয়ে শ্বাসনালী সংকুচিত হলে বাতাস চলাচলের সময় শব্দ তৈরি হয়। এটিই নাক ডাকা। শ্বাসনালী পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে নাক ডাকাও সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে। পরে মস্তিষ্কের সংকেতে ঘুম ভেঙে শ্বাস-প্রশ্বাস শুরু হলে আবার নাক ডাকার শব্দ হতে পারে।

সাধারণ নাক ডাকার চিকিৎসা স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসার চেয়ে ভিন্ন ও তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঝিমুনির মতো সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ যে কারও স্লিপ অ্যাপনিয়া হতে পারে। তবে যাদের ওজন বেশি বা স্থূলতা রয়েছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

এছাড়া যাদের গলা ও ঘাড় চওড়া, জিহ্বা ভারী, টনসিল ফুলে আছে কিংবা গলা ও নাকের ভেতরের কোনো অংশের মাংসপেশি বড় হয়ে গেছে, তাদেরও শ্বাসনালী বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। পুরুষদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা নারীদের তুলনায় বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাধারণত ৩৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। পরিবারের কোনো সদস্যের স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ধূমপানকারীদের মধ্যেও স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি বেশি। ধূমপানের কারণে গলার পেছনের মাংসপেশি ফুলে গিয়ে শ্বাসনালী সংকুচিত হতে পারে। এ ছাড়া চিৎ হয়ে ঘুমানো এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত রোগ সিওপিডি থাকলেও স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই অস্বাভাবিক নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা কিংবা পর্যাপ্ত ঘুমের পরও দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঝিমুনি থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।