খাওয়ার পর ঘুমঘুম ভাব, কেন হয় এমন?

খাবার খাওয়ার পরই চোখ ভার হয়ে আসে, কাজে মন বসে না - এমন অনেকের সাথেই হয়ে থাকে। বিশেষ করে দুপুরের খাবারের পর এই ঝিমুনি যেন আরও বেশি অনুভূত হয়। অনেকে এর জন্য ভাতকে দায়ী করেন। কিন্তু খাবারের পর ঘুমঘুম ভাবের পেছনে শুধু একটি খাবার নয়, একাধিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে। 

চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, খাবারের পর যে সাময়িক তন্দ্রাভাব তৈরি হয়, তাকে ‘পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল সোমনোলেন্স’ বলা হয়। খাবারের পর অন্ত্র থেকে আসা সংকেত, রক্তে গ্লুকোজ ও অন্যান্য বিপাকীয় পরিবর্তন এবং মস্তিষ্কের জাগ্রত থাকার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন - সব মিলিয়ে এই ঝিমুনি তৈরি হতে পারে।

একসময় মনে করা হতো, খাবার হজম করার জন্য শরীরের রক্তের বড় অংশ পাকস্থলীর দিকে চলে যায় এবং মস্তিষ্কে রক্ত কম পৌঁছানোর কারণে ঘুম আসে। তবে এই ব্যাখ্যাকে সঠিক বলে মনে করা হয় না। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকও খাবারের পর তন্দ্রাভাবের কারণ হিসেবে একাধিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছে।

বেশি খেলে ঘুমও বেশি লাগে?

খাবারের পরিমাণের সঙ্গে ঘুমঘুম ভাবের সম্পর্ক থাকতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বড় ও বেশি শক্তিসমৃদ্ধ খাবারের পর তন্দ্রাভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। সাধারণত খাবারের পর কিছু সময়ের মধ্যে এই অনুভূতি শুরু হয় এবং পরে ধীরে ধীরে কমে আসে।

তাই দুপুরে একসঙ্গে অনেকটা খাবার খাওয়ার পর কাজে বসে চোখ ভার হয়ে আসা অস্বাভাবিক নয়। তবে সবার ক্ষেত্রে একই মাত্রায় এমনটা হবে, এমন নয়।

ভাত খেলেই কি ঘুম আসে?

ভাত খাওয়ার পর ঘুমঘুম ভাব হওয়ায় অনেকেই মনে করেন, ভাতই এর মূল কারণ। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে এমন সরল সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ নেই।

পাবমেডে প্রকাশিত একটি গবেষণায় খাবারের ধরন ও খাবারের পর তন্দ্রাভাব নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবারের মধ্যে তন্দ্রাভাবের পার্থক্য স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। গবেষকেরা দেখেছেন, খাবার খাওয়ার পর তন্দ্রাভাব বাড়তে পারে; তবে শুধু খাবারের নির্দিষ্ট উপাদানকে এর একমাত্র কারণ বলা যায় না। আরেকটি গবেষণাতেও খাবারের পর তন্দ্রাভাব বেড়েছে, কিন্তু খাবারে চর্বি ও কার্বোহাইড্রেটের অনুপাতের কারণে সেই পার্থক্য স্পষ্ট ছিল না।

তাই ‘ভাত খেলেই ঘুম আসে’ - এভাবে বলা ঠিক হবে না। বরং কতটা খাবার খাওয়া হচ্ছে, খাবারটি কতটা ভারী এবং দিনের কোন সময়ে খাওয়া হচ্ছে - এসব বিষয়ও বিবেচনায় রাখা দরকার।

দুপুরের খাবারের পরই বেশি ঘুম পায় কেন?

এখানে খাবারের পাশাপাশি দিনের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের শরীরে ২৪ ঘণ্টার একটি জৈবিক ছন্দ রয়েছে। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে স্বাভাবিকভাবেই সতর্কতা কিছুটা কমে ঘুমের প্রবণতা বাড়তে পারে।

পাবমেডে প্রকাশিত গবেষণায় দুপুরের পরের এই তন্দ্রাভাবকে দিনের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে খাবারের পরও তন্দ্রাভাব বাড়তে পারে। ফলে দুপুরের স্বাভাবিক ‘ঘুমের টান’-এর সঙ্গে খাবারের পরের ঝিমুনি যোগ হয়ে বিষয়টি আরও বেশি অনুভূত হতে পারে। অর্থাৎ, দুপুরের খাবারের পর ঘুম পাওয়ার জন্য শুধু খাবারকে দায়ী করা ঠিক হবে না।

আগের রাতে ঘুম কম হলেও সমস্যা বাড়ে

দুপুরে খাবার খাওয়ার পর ঘুম পাচ্ছে মানেই খাবারই এর কারণ - এমনটা নয়। আগের রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলেও দিনের বেলায় তন্দ্রাভাব বাড়তে পারে। পাবমেডে প্রকাশিত গবেষণায় আগের রাতের ঘুম কম হওয়ার সঙ্গে দুপুরের পরের তন্দ্রাভাব বেড়ে যাওয়ার সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএসও দিনের ক্লান্তি ও ঘুমঘুম ভাবের একটি সাধারণ কারণ হিসেবে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। তাই দুপুরের খাবারের পর নিয়মিত ঘুম পেলে শুধু খাবারের দিকে নয়, আগের রাতের ঘুমের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

ঘুমঘুম ভাব কমাতে কী করবেন?

খাবারের পর সামান্য ঝিমুনি স্বাভাবিক হতে পারে। তবে এটি যদি কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে, তাহলে কিছু অভ্যাস কাজে আসতে পারে।

একসঙ্গে খুব বেশি খাবার না খেয়ে পরিমাণ বুঝে খাওয়া যেতে পারে। খাবারে শাকসবজি, আঁশ ও প্রোটিন রাখলে খাবারটি তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ হয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকও ছোট ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবার এবং প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

খাবারের পর ১০ থেকে ৩০ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটিও তন্দ্রাভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক জানিয়েছে। এর পাশাপাশি রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কখন বিষয়টি নিয়ে ভাববেন?

মাঝেমধ্যে খাবারের পর ঘুমঘুম ভাব হওয়া সাধারণ বিষয়। কিন্তু প্রায় প্রতিবার খাবারের পর অতিরিক্ত ঘুম আসে, দিনের অন্য সময়েও তীব্র ঘুম পায় বা পর্যাপ্ত ঘুমের পরও সারাদিন ক্লান্ত লাগে - তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত দিনের ঘুমঘুম ভাবের পেছনে ঘুমের সমস্যা বা অন্য শারীরিক কারণ থাকতে পারে। নিয়মিত এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, দিনের ক্লান্তির সঙ্গে রাতে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ বা আটকে যাওয়ার মতো ঘটনা থাকলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা বিবেচনায় নেওয়া হয়। আবার অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব ও ওজন কমে যাওয়ার সঙ্গে ক্লান্তি থাকলে ডায়াবেটিসের মতো কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শেষ কথা

খাওয়ার পর একটু ঝিমুনি আসা অস্বাভাবিক নয়। খাবারের পর শরীরে বিভিন্ন বিপাকীয় পরিবর্তন, অন্ত্রের সংকেত, দিনের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ এবং আগের রাতের ঘুম - সবকিছু মিলেই এই তন্দ্রাভাব তৈরি হতে পারে।

তাই দুপুরের খাবারের পর চোখ একটু ভার হয়ে এলে শুধু ভাতকে দায়ী করার কারণ নেই। পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খাওয়া, খাবারের পর কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস এই অস্বস্তিকর ঝিমুনি কমাতে সাহায্য করতে পারে। আর অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব নিয়মিত হলে বা অন্য উপসর্গের সঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।