রাতের ঘুমটা হয়তো ভালোভাবেই শুরু করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পাশের মানুষটির নাক ডাকার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। আবার ঘুমালেন, কিছুক্ষণ পর একই ঘটনা। কখনো তাকে কাত করে শুইয়ে দিলেন, কখনো নিজেই কান চেপে ধরলেন বালিশ দিয়ে। এভাবে রাত কেটে যাওয়ার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল, শরীরটা যেন ঠিকমতো বিশ্রামই পায়নি।
সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন অনেকেই। নাক ডাকা খুব সাধারণ একটি বিষয় হওয়ায় এটিকে অনেক সময় নিছক বিরক্তিকর শব্দ হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নাক ডাকার জন্য পাশে ঘুমানো ব্যক্তির ঘুম ও দৈনন্দিন সুস্থতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ডেন্টাল স্লিপ মেডিসিনে বিশেষ আগ্রহী দন্তচিকিৎসক ডা. ক্লেয়ার সাইমনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঘুমের সময় ঊর্ধ্ব শ্বাসনালির নরম টিস্যুতে কম্পন তৈরি হলে নাক ডাকার শব্দ হয়।
ব্রিটিশ স্নোরিং অ্যান্ড স্লিপ অ্যাপনিয়া অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএসএএ) তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৪০% নাক ডাকেন। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে নাক ডাকার প্রবণতাও বেশি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্লিপ ফাউন্ডেশনের এক জরিপে নাক ডাকা ব্যক্তিদের সঙ্গীদের ৭৫% জানিয়েছেন, এর কারণে তাদের ঘুমে প্রভাব পড়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ঘুম ভাঙলে শুধু ক্লান্তিই আসে না
ঘুমের সময় মানুষ একটানা একই পর্যায়ে থাকে না। প্রায় ৯০ মিনিট পরপর ঘুমের চক্রগুলো বদলাতে থাকে। এর মধ্যে গভীর ঘুমের পর্যায় শরীরের পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাক ডাকার শব্দে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে এই পুনরুদ্ধারমূলক ঘুমে পর্যাপ্ত সময় কাটানো নাও হতে পারে।
ফলে বিছানায় দীর্ঘ সময় কাটানোর পরও সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত লাগতে পারে। অর্থাৎ ঘুমের মোট সময় ঠিক থাকলেও তার মান কমে যেতে পারে।
অ্যারোক্স হেলথের পরামর্শক অর্থোডন্টিস্ট ও ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আমা জোহাল বলেন, “সঙ্গীর নাক ডাকার প্রভাব কখনো কখনো এতটাই বেশি হয় যে পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য একজনকে অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমাতে হতে পারে।”
তার মতে, ঘুম মানুষের শারীরিকভাবে কার্যকর থাকার জন্য অপরিহার্য। তাই নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাতকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
মনোযোগ ও স্মৃতিতেও প্রভাব পড়তে পারে
ঘুমের সময় শুধু শরীর বিশ্রাম নেয় না, মস্তিষ্কও দিনের বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করে। তাই ঘুম বারবার ভেঙে গেলে এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে রাতের ঘুম ভালোভাবে না হলে পরদিন মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। একইসঙ্গে স্মৃতিশক্তিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ঘুমের ব্যাঘাত হরমোন নিয়ন্ত্রণের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে শক্তির মাত্রা কমে যেতে পারে এবং কাজের প্রতি আগ্রহ বা প্রেরণাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
ঘুম আবার চাপ ও আবেগগত প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও যুক্ত। পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম না হলে এসব ব্যবস্থার ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মানুষ বেশি খিটখিটে হয়ে উঠতে পারেন এবং দৈনন্দিন চাপ সামলানো কঠিন মনে হতে পারে।
‘হ্যাংওভারের মতো’ লাগতো মেগের
২৯ বছর বয়সী মেগ ওয়ারেনের অভিজ্ঞতাও এমনই। সাবেক সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে রাতে তার বারবার ঘুম ভেঙে যেত।
মেগ জানান, প্রতিবার নাক ডাকার শব্দে ঘুম ভাঙার পর নিজেকে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় মনে হতো। নাক ডাকা বন্ধ করতে তিনি রাতে সঙ্গীকে ধাক্কা দিতেন এবং চিৎ হয়ে শোয়া থেকে কাত হয়ে শোয়ার চেষ্টা করতেন।
কিন্তু তাতেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে তার ঝিমঝিম ও দিশেহারা লাগত। কখনো কখনো অনুভূতিটা এত তীব্র ছিল যে তার মনে হতো, যেন হ্যাংওভার হয়েছে।
নাক ডাকার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কেও চাপ তৈরি করেছিল। মেগ বলেছিলেন, তারা যদি একসঙ্গে থাকতেন, তাহলে নাক ডাকার অসহনীয় রাতগুলোর জন্য আলাদা শোবার ঘরের প্রয়োজন হতো।
আলাদা ঘরে ঘুমানোই কি সমাধান?
সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে আলাদা ঘরে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
৫২ বছর বয়সী সাংবাদিক আনা-লুইজ ডিয়ার্ডেন জানান, তার সঙ্গীর নাক ডাকা বেশি হলে কখনো কখনো তিনি অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমান। কারণ নিজের পর্যাপ্ত বিশ্রামকে তিনি অগ্রাধিকার দেন।
তার অভিজ্ঞতায়, খারাপ ঘুমের পর ক্ষুধাও বাড়ে এবং মেজাজ বেশি খিটখিটে লাগে।
তবে একই বিছানায় ঘুমানোর ক্ষেত্রে ইয়ারপ্লাগ তার জন্য বেশ কার্যকর হয়েছে বলে জানান আনা-লুইজ। তার ভাষায়, এটি অনেকটা ‘জীবন রক্ষাকারীর’ মতো কাজ করেছে - সঙ্গীর নাক ডাকার বেশিরভাগ শব্দ উপেক্ষা করে ঘুমাতে সাহায্য করেছে।
ডা. ক্লেয়ার সাইমনের মতে, সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে ঘুম বারবার ভাঙলে খিটখিটে মেজাজ, ঝগড়া এবং একপর্যায়ে আলাদা ঘরে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এর ফলে দুজনের ঘনিষ্ঠতাও কমে যেতে পারে।
অধ্যাপক আমা জোহালের মতে, অনেক দম্পতি দীর্ঘ সময় ধরে নাক ডাকার সমস্যা সহ্য করে যান। অথচ এর প্রভাব তাদের সম্পর্ক ও সুস্থতার ওপর পড়তে পারে।
নিছক শব্দ, নাকি লুকানো রোগ ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’?
সঙ্গীর নাক ডাকা কমানোর জন্য শুধু কান ঢেকে রাখা বা ধাক্কা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। সবার আগে নিশ্চিত হতে হবে - এটি কেবলই সাধারণ নাক ডাকা, নাকি মারাত্মক কোনো রোগ ‘অ্যাবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’?
স্লিপ অ্যাপনিয়া হলো এমন এক অবস্থা, যেখানে ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস কয়েক সেকেন্ডের জন্য বারবার আটকে যায়।
লক্ষণ
- ঘুমানোর সময় হঠাৎ দম আটকে হাঁসফাঁস করে ওঠা
- রাতে ঘন ঘন গলা শুকিয়ে ঘুম ভাঙা
- সকালে ঘুম থেকে উঠে তীব্র মাথাব্যথা অনুভব করা
ডা. সাইমন সতর্ক করে বলেন, শ্বাসনালিতে বাতাস চলাচলের পথ অবরুদ্ধ থাকলে তা হৃদরোগ থেকে শুরু করে স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই এটি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে সিপিএপি মেশিনের সাহায্যে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে ছোট অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
একটু সতর্কতায় স্বস্তির ঘুম
সব নাক ডাকাই কিন্তু আবার স্লিপ অ্যাপনিয়া নয়। জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব -
- ওজন কমানো: গলার চর্বি কমে এলে শ্বাসনালির ওপর চাপ কমে এবং বাতাস চলাচলের পথ সহজ হয়।
- শোয়ার ভঙ্গি বদলানো: সোজা চিত হয়ে শোয়ার বদলে যেকোনো এক কাত হয়ে ঘুমালে শ্বাসনালি খোলা থাকে।
- নেশা ত্যাগ: ধূমপান এবং রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে অ্যালকোহল গ্রহণ করার অভ্যাস টিস্যুগুলোকে শিথিল করে দেয়, যা নাক ডাকার অন্যতম প্রধান কারণ।
- অ্যালার্জি ও মাউথগার্ড: নাকের ভেতরে কোনো জটিলতা থাকলে তার দ্রুত চিকিৎসা করা কিংবা দন্তচিকিৎসকের পরামর্শে চোয়াল সামান্য সামনে রাখার ‘ওরাল অ্যাপ্লায়েন্স’ বা বিশেষ মাউথগার্ড ব্যবহার করা।
সঙ্গীর নাক ডাকা কোনো হাসির বিষয় নয়, আবার এটি কেবলই একটি বিরক্তিকর অভ্যাস ভাবাও ভুল। স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, পরের দিনের কর্মক্ষমতা কিংবা প্রিয় মানুষটার সাথে সম্পর্কের মাধুর্য টিকিয়ে রাখতে হলেও এই শব্দকে অবহেলা করবেন না। সঠিক কারণ খুঁজে বের করুন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।