খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু শর্করা বেড়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে এখন ভাত, রুটি, সাদা পাউরুটি ও পাস্তার মতো কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলছেন। কেউ কেউ আবার সারা দিন রক্তে শর্করার মাত্রা মাপছেন বিশেষ যন্ত্র দিয়ে। ডায়াবেটিস নেই, এমন মানুষের মধ্যেও এ প্রবণতা বাড়ছে। তবে সুস্থ মানুষের রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়া কি সত্যিই ক্ষতিকর?
লেখক, পডকাস্টার ও সুস্থতাবিষয়ক প্রভাবশালীদের অনেকে মনে করেন, রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। তাদের দাবি, ডায়াবেটিস না থাকলেও এমনটা ঘটলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ব্রণ ও মেজাজে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়লেই তা ক্ষতিকর, এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং কখন এই বৃদ্ধি স্বাভাবিক আর কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, তা বোঝা জরুরি।
বিবিসির প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
কেন বাড়ে রক্তে শর্করা
চিনি, ফল কিংবা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। হজমের সময় এসব খাবারের কার্বোহাইড্রেট ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়। পরে এই গ্লুকোজ রক্তপ্রবাহে মিশে যায়।
গ্লুকোজের মাত্রা বাড়লে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন রক্ত থেকে গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছাতে সাহায্য করে। কোষগুলো তখন গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে।
খাবার ছাড়াও ব্যায়ামের কারণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে। উচ্চমাত্রার শারীরিক পরিশ্রমের সময় অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন যকৃতকে রক্তে আরও গ্লুকোজ ছাড়তে সংকেত দেয়। এতে কর্মরত পেশিগুলো বাড়তি শক্তি পায় এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের শিশু হরমোন বিশেষজ্ঞ জেনিফার শের এ বিষয়ে এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তাদের শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না-ও হতে পারে। আবার ইনসুলিন তৈরি হলেও তা ঠিকমতো কাজ না করতে পারে। ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার এই অবস্থাকে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স।
এ কারণে খাবার খাওয়ার পর তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারও কারও ক্ষেত্রে ইনসুলিন বা মেটফরমিনের মতো ওষুধও প্রয়োজন হয়।
কখন রক্তে শর্করা বাড়লে উদ্বেগের প্রয়োজন নেই
সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের পুষ্টি ও খাদ্যনির্বাচনবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ব্রাউন বলেন, “প্রতিবার গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে ক্ষতিকর মনে করাই বড় একটি ভুল ধারণা।”
সাধারণত খাবার খাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর রক্তে শর্করার মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে তা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। শরীরের বিপাকপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকলে এবং এই বৃদ্ধি স্বল্পস্থায়ী হলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই বলে মনে করেন ব্রাউন।
তবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় ধরে উঁচু থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। জেনিফার শেরের মতে, এমনটা হলে শরীর স্বাভাবিকভাবে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের লক্ষণ হতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা অনেক বেশি থাকলে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তশর্করা থেকে চোখ ও স্নায়ুর ক্ষতি, হৃদ্রোগ এবং স্ট্রোকের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
তবে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়াই সরাসরি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণ - এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই বলে মনে করেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েটিশিয়ান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো নিকোলা গেস বলেন, শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেলে অতিরিক্ত ক্যালোরি সাধারণত চর্বিতে রূপান্তরিত হয়। এতে ওজন বাড়ে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সুস্থ মানুষের কি গ্লুকোজ মাপার যন্ত্র প্রয়োজন
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করেন। এ কাজে ব্যবহৃত একটি যন্ত্র হলো কনটিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর বা সিজিএম। এটি সারা দিন রক্তে শর্করার মাত্রার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
বর্তমানে ডায়াবেটিস নেই, এমন মানুষের মধ্যেও এই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। তবে তাদের জন্য এটি কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
ডায়াবেটিস নেই, এমন ব্যক্তিদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা ৯৬% সময়ই স্বাস্থ্যকর সীমার মধ্যে ছিল।
কিছু বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, এসব যন্ত্রের তথ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করলে মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে খাবার বাদ দিতে পারেন। বিশেষ করে যন্ত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি দেখালে তা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে খাদ্যাভ্যাসেও ক্ষতিকর পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্রাউন ও তার সহকর্মীদের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিস নেই এমন মানুষের ক্ষেত্রে সিজিএম ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় - এমন ধারাবাহিক ও উচ্চমানের প্রমাণের অভাব রয়েছে।
তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই যন্ত্র উপকারী হতে পারে। জেনিফার শের বলেন, “নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণের যন্ত্র ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে সিজিএম সত্যিই কতটা কার্যকর, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।”
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে যেসব খাবার খাবেন
রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে খাবারের ধরন গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে পারে। অন্যদিকে সাদা পাউরুটি ও সাদা চালের মতো সাধারণ কার্বোহাইড্রেট দ্রুত রক্তপ্রবাহে শোষিত হয়।
কোন খাবার আগে খাওয়া হচ্ছে, সেটিও রক্তে শর্করার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবারের আগে প্রোটিন ও শাকসবজি খেলে পরে রক্তে শর্করার মাত্রা যে হারে বাড়ে, তা কমতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, খাবারে প্রোটিন, আঁশসমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ খাবার ও স্বাস্থ্যকর চর্বির সমন্বয় রাখা। এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ খাবার হজমের প্রক্রিয়া ধীর করতে, শরীরে তুলনামূলক স্থিতিশীলভাবে শক্তি সরবরাহ করতে এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে সব মানুষের শরীরে একই খাবারের প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না। ঘুম, মানসিক চাপ, শারীরিক কার্যকলাপ এবং খাবারের ধরন অনুযায়ী রক্তে শর্করার পরিবর্তন হতে পারে। একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এসব কারণে প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।
কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়া কি ঠিক
রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন এসব খাবার সীমিত রাখার পর আবার কার্বোহাইড্রেট খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাড়তে পারে বলে মনে করেন নিকোলা গেস।
তার মতে, নির্দিষ্ট ধরনের খাবার বাদ দিতে গিয়ে অনেক সময় উপকারী খাবারও খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। অথচ কার্বোহাইড্রেট ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার বদলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার অভ্যাস কমানো এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে গেলেই তা বিপদের লক্ষণ নয়। বরং এই বৃদ্ধি কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে এবং শরীর স্বাভাবিকভাবে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।