সকালে নাকি সন্ধ্যায়, কখন ব্যায়াম করলে বেশি উপকার?

সুস্থ থাকতে নিয়মিত শরীরচর্চার বিকল্প নেই। কেউ হাঁটেন বা দৌড়ান, কেউ সাঁতার কাটেন, আবার কেউ জিমে গিয়ে ব্যায়াম করেন। তবে শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না, দিনের কোন সময়ে শরীরচর্চা করছেন, সেটিও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি বা দেহঘড়ির সঙ্গে মিল রেখে ব্যায়াম করলে উপকার বেশি পাওয়া যেতে পারে।

যারা সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠেন, তাদের জন্য সকালে ব্যায়াম করা বেশি উপযোগী হতে পারে। অন্যদিকে, যারা রাতে বেশি সক্রিয় থাকেন এবং দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন, তাদের সন্ধ্যার দিকে ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ওপেন হার্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের স্বাভাবিক সময়সূচির সঙ্গে মিল রেখে ব্যায়াম করলে হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে যাদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি আগে থেকেই বেশি, তাদের জন্য এ ধরনের শরীরচর্চা বাড়তি উপকার বয়ে আনতে পারে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ঘুমের মান উন্নত হয়েছে, রক্তচাপ কমেছে এবং রক্তে শর্করার মাত্রায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।

দেহঘড়ি অনুযায়ী ব্যায়ামের সুফল

গবেষণায় পাকিস্তানের ৪০ ও ৫০ বছর বয়সী প্রায় ১৩৫ জন ব্যক্তি অংশ নেন। তাদের কেউই খুব বেশি শারীরিকভাবে ফিট ছিলেন না। অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের উচ্চ রক্তচাপ বা অতিরিক্ত ওজনের মতো অন্তত একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের তিন মাস ধরে সপ্তাহে পাঁচ দিন ট্রেডমিলে ৪০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭০ জন ছিলেন ‘মর্নিং লার্ক’ বা সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা ব্যক্তি। আর ৬৪ জন ছিলেন ‘নাইট আউল’ বা রাতে বেশি সক্রিয় থাকা এবং সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা ব্যক্তি।

অংশগ্রহণকারীদের একাংশ নিজেদের দেহঘড়ি অনুযায়ী ব্যায়াম করেন। অন্যরা ব্যায়াম করেন তাদের স্বাভাবিক সক্রিয় থাকার সময়ের বিপরীতে। অর্থাৎ, এক দল সকালে বা সন্ধ্যায় বেশি সক্রিয় থাকার স্বাভাবিক প্রবণতা অনুসরণ করেন, আর অন্য দল এর বিপরীত সময়ে ব্যায়াম করেন।

দুই দলের সদস্যদেরই শারীরিক উন্নতি দেখা যায়। তবে যারা নিজেদের দেহঘড়ি বা ক্রোনোটাইপ অনুযায়ী ব্যায়াম করেছেন, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি উপকার পেয়েছেন। তাদের রক্তচাপ, অ্যারোবিক সক্ষমতা, শরীরের নমনীয়তা, বিপাকীয় স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচক এবং ঘুমের মানের উন্নতি বেশি দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি ঘুমের ধরন ও হরমোনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে এটি শরীরচর্চার ফলাফলকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সবার জন্য একই সময় নয়

সবার জন্য একই সময়ে ব্যায়াম করার নিয়ম আদর্শ নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। শরীরের স্বাভাবিক সময়সূচি এবং সামাজিক জীবনের সময়সূচির মধ্যে অমিল থাকলে তাকে ‘সোশ্যাল জেটল্যাগ’ বলা হয়। এ ধরনের অমিল হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে যারা রাতে বেশি সক্রিয় থাকেন, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের জোর করে ভোরে ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই।

ব্রিটিশ কার্ডিওভাসকুলার সোসাইটির সদস্য ড. রাজিভ শঙ্করাণারায়ণ বলেন, “গবেষণাটি দেহঘড়ি অনুযায়ী ব্যায়াম করার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।”

অন্যদিকে, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. নিনা জেকরজেক মনে করেন, ব্যায়ামের সময় গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিয়মিত পর্যাপ্ত ব্যায়াম করাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।

সপ্তাহে কতক্ষণ ব্যায়াম করবেন

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএস প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছে। সেগুলো হলো - 

  • সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশির শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করতে হবে। যেমন - যোগব্যায়াম, পিলাটিস ও ভারোত্তোলন।
  • সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম, যেমন দ্রুত হাঁটা, অথবা ৭৫ মিনিট উচ্চমাত্রার ব্যায়াম, যেমন দৌড়ানো, করতে হবে।
  • সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যায়াম করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিদিন শরীরচর্চা করা যেতে পারে।
  • দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস কমাতে হবে।