খাওয়ার টেবিলে বসে পছন্দের খাবারটি খেতে খেতে কখন যে পেট ভরে যায়, তা টেরই পাওয়া যায় না। একসময় মনে হয়, আর খাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু খাবার শেষে পরিবেশন করা হলো চকোলেট কেক কিংবা আইসক্রিম। ব্যস, আবার যেন খাওয়ার ইচ্ছা জেগে উঠল! পেট ভরে যাওয়ার পরও দিব্যি খাওয়া হয়ে গেল এক বাটি আইসক্রিম কিংবা এক টুকরা কেক। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। প্রশ্ন হলো, পেট ভরে যাওয়ার পরও মিষ্টি খাবারের প্রতি এই টান তৈরি হয় কেন? সত্যিই কি পেটে মিষ্টির জন্য আলাদা জায়গা থাকে?
আসলে এর পেছনে রয়েছে খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্যের প্রতি আমাদের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া। একই খাবার খেতে খেতে একসময় সেটির প্রতি আগ্রহ কমে আসে। কিন্তু সামনে ভিন্ন স্বাদের কিছু এলে আবার খেতে ইচ্ছা করে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে বলেন ‘সেন্সরি-স্পেসিফিক স্যাটাইটি’। বাংলায় একে বলা যায় সংবেদননির্ভর তৃপ্তি।
একই খাবার খেতে খেতে একঘেয়েমি আসে কেন?
ধরুন, দুপুরে পছন্দের বিরিয়ানি খাচ্ছেন। বেশ তৃপ্তি নিয়ে খেলেন। কিন্তু একসময় সেই একই স্বাদ আর আগের মতো ভালো লাগছে না। অথচ বিরিয়ানি সরিয়ে সামনে যদি আইসক্রিম বা চকোলেট কেক রাখা হয়, তখন সেটি খাওয়ার আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
এর কারণ, একই খাবার বারবার খেতে থাকলে তার স্বাদ, গন্ধ ও অনুভূতির প্রতি মস্তিষ্কের সাড়া ধীরে ধীরে কমে আসে। কিন্তু ভিন্ন স্বাদের খাবার সামনে এলে সেটি আবার নতুন করে আকর্ষণ তৈরি করে। অর্থাৎ একটি খাবার খেয়ে তৃপ্ত হয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে অন্য খাবার খাওয়ার আগ্রহও একইভাবে কমে যাবে।
নিউইয়র্কের বাফেলো ইউনিভার্সিটির বিহেভিয়ারাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক লেন এপস্টাইন এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, একই খাবার নিয়মিত খেলে একসময় সেটির প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
২০১১ সালে ‘The American Journal of Clinical Nutrition’ সাময়িকীতে প্রকাশিত লেন এপস্টাইন ও তার সহগবেষকদের একটি গবেষণায় ৩২ জন নারী অংশ নেন। তাদের মধ্যে ১৬ জন স্থূলতা এবং ১৬ জন স্বাভাবিক ওজনের ছিলেন।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ম্যাকারনি অ্যান্ড চিজ খেতে দেওয়া হয়। এক দলকে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন এই খাবার দেওয়া হয়েছিল। অন্য দলকে পাঁচ সপ্তাহে সপ্তাহে এক দিন করে খাবারটি পরিবেশন করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, যারা প্রতিদিন একই খাবার খেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে খাবারটির প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই খাবার থেকে তাদের শক্তি গ্রহণের পরিমাণও কমে আসে। অর্থাৎ একই খাবার বারবার খেতে থাকলে সেটির প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
গবেষণাটি খাবারের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অভ্যস্ততা নিয়ে হলেও এর ফল থেকে বোঝা যায়, খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্য খাওয়ার আগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বুফেতে গেলে বেশি খাওয়া হয় কেন?
বুফে রেস্তোরাঁয় গিয়ে অনেকেই খেয়াল করেন, পেট ভরে যাওয়ার পরও একের পর এক খাবার টেস্ট করে দেখতে ইচ্ছা করে। কখনো বিরিয়ানি, কখনো গ্রিল, আবার কখনো পাস্তা কিংবা সালাদ। সবশেষে থাকে নানা ধরনের মিষ্টি ও ডেজার্ট। একটি খাবার খেয়ে তৃপ্তি এলেও অন্য খাবারের স্বাদ নেওয়ার আগ্রহ কমে না।
এর পেছনেও কাজ করে খাবারের বৈচিত্র্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বারবারা রোলস ও তার সহকর্মীরা ১৯৮১ সালে এ বিষয়ে একটি গবেষণা করেন।
‘Physiology & Behavior’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে দেখা যায়, খাবারের স্বাদে বৈচিত্র্য থাকলে মানুষ বেশি খেতে পারেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একই ধরনের খাবারের পরিবর্তে বিভিন্ন স্বাদের খাবার পরিবেশন করা হলে তাঁদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যায়।
অর্থাৎ, একই খাবার খেতে খেতে আগ্রহ কমে গেলেও নতুন স্বাদের খাবার সামনে এলে আবার খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হতে পারে। বুফেতে বিভিন্ন পদ সাজানো থাকার কারণে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
খাবারে বৈচিত্র্য কি সব সময় ভালো?
বিভিন্ন ধরনের খাবারের প্রতি আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কারণ, শরীরের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি একটি খাবার থেকে পাওয়া যায় না। ফল, শাকসবজি, মাছ, মাংস ও অন্যান্য খাবার থেকে শরীর বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান পায়। তাই খাবারে বৈচিত্র্য থাকা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসেরও একটি অংশ।
তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন খাবারের বৈচিত্র্যের আকর্ষণে পেট ভরে যাওয়ার পরও আমরা খেতে থাকি। বিশেষ করে মিষ্টি, ভাজাপোড়া ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার সহজলভ্য হলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়া হয়ে যেতে পারে।
অধ্যাপক বারবারা রোলসের গবেষণায় খাবারের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি খাবারের ক্যালরির ঘনত্বও খাওয়ার পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উঠে এসেছে। অর্থাৎ খাবার কতটা সুস্বাদু বা বৈচিত্র্যময়, তার পাশাপাশি তাতে কত ক্যালরি রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মিষ্টি খাবারের প্রতি এত আকর্ষণ কেন?
মিষ্টি খাবার খাওয়ার সময় মস্তিষ্কের পুরস্কার-সম্পর্কিত ব্যবস্থাও সক্রিয় হয়। ডোপামিনের মতো রাসায়নিক আনন্দ ও ভালো লাগার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। তাই মিষ্টি খাবার অনেকের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। খাবারের পর নিয়মিত ডেজার্ট খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সেই সময় মিষ্টির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
এছাড়া খাবারের পর ডেজার্ট খাওয়ার অভ্যাস থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সব সময় শারীরিক ক্ষুধা থেকে নয়, কখনো স্বাদ ও অভ্যাসের কারণেও খাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়।
কখন এই অভ্যাস বাড়তি চিন্তার কারণ?
নতুন খাবারের প্রতি আকর্ষণ থাকাটা স্বাভাবিক। তবে এই আকর্ষণের কারণে পেট ভরে যাওয়ার পরও খেতে থাকলে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ, বুফে কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নানা ধরনের খাবার একসঙ্গে পাওয়া যায়। তখন একটি খাবার খেয়ে তৃপ্তি পেলেও অন্য খাবারের স্বাদ নেওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়।
উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খেলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমতে পারে। নিয়মিত এমন হলে ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই খাবারের বৈচিত্র্য উপভোগ করার পাশাপাশি কতটুকু খাওয়া হচ্ছে, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
পেট ভরে যাওয়ার পরও খেতে ইচ্ছা করলে কী করবেন?
পেট ভরে যাওয়ার পরও পছন্দের কোনো খাবার খেতে ইচ্ছে করতে পারে -এটা অস্বাভাবিক নয়। তবে মিষ্টি বা অন্য খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলে খাবারের ধরন ও পরিমাণে একটু সচেতন হওয়া জরুরি।
ডেজার্ট খেতে ইচ্ছা করলে অল্প পরিমাণে নিতে পারেন। মিষ্টি স্বাদের চাহিদা মেটাতে আম, আপেল, কমলা কিংবা মৌসুমি ফলও বেছে নেওয়া যায়। পাশাপাশি খাবার খাওয়ার সময় পেট ভরে গেছে কি না, সেটি বুঝে খাওয়া বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
পেট ভরে যাওয়ার পরও মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করার পেছনে তাই শুধু ক্ষুধা কাজ করে না। একই খাবারের প্রতি একঘেয়েমি, নতুন স্বাদের আকর্ষণ, মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া এবং খাবারসংক্রান্ত অভ্যাস - সব মিলিয়েই তৈরি হয় এই প্রবণতা। তাই পেটে মিষ্টির জন্য আলাদা জায়গা না থাকলেও মিষ্টি দেখলে খেতে ইচ্ছা করার পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা।