ঢাকাকে প্রায়ই একটা কুৎসিত ও ট্রাফিক জটলার শহর বলে কটাক্ষ করা হয়। কিন্তু এই একপেশে ধারণা পুরো সত্যটা তুলে ধরে না। ঢাকা আসলে এক দারুন ও প্রবল প্রাণবন্ত শহর, যার মানুষজন দারুণ উদ্ভাবনী, কর্মঠ এবং শহরের ছন্দ-তাল-এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানকার গিজগিজ করা বাজার, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত অবকাঠামো এ সব মিলিয়ে ঢাকার ভেতরে একটি আধুনিক শহর হয়ে ওঠার শক্ত বনিয়াদ ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে আছে।
আমি যেহেতু কয়েকবার দেশে আসি, আমার কাছে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি ঢাকায় একেবারে স্পষ্ট। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মতিঝিল ও গুলশানের ঝকঝকে বাণিজ্যিক এলাকা এগুলো একটা এগিয়ে চলা শহরের জমজমাট ছবি তুলে ধরে। তবে এটাও সত্য যে শহরের সৌন্দর্য শুধু ইট-পাথরের কাঠামো দিয়ে মাপা যায় না। এর জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নগরবাসীর নৈতিক দায়িত্ববোধ। শহর উন্নত হয় শুধু খারাপ অভ্যাস ঝেড়ে ফেলে নয়, বরং গোড়া থেকেই ভালো অভ্যাস ধরে তোলার মাধ্যমে।
ঢাকার চেহারা ভালো করার সবচেয়ে সহজ ও কম খরচের উপায়গুলোর মধ্যে একটা হলো: যত্রতত্র দেয়ালে পোস্টার ও দেয়াল লিখন বন্ধ করা। দেয়াল, সেতু, স্মৃতিস্তম্ভ, এমনকি সদ্য রং করা মেট্রো বা এক্সপ্রেসওয়ের পিলারেও নির্বিচারে পোস্টার লাগানো শহরের সৌন্দর্যকে পুরোপুরি মাটি করে দিচ্ছে। অনেক জায়গায় ‘পোস্টার লাগানো নিষেধ’ লেখা থাকলেও দেখা যায়, ঐ লেখাটিকে ডেকে ফেলা হয় পোস্টের দিয়ে , তারই ওপরে সাঁটা হচ্ছে নতুন পোস্টার। এটা দেখলেই বোঝা যায়—আইনের কড়াকড়ি কতটা ঢিলেঢালা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও নাগরিক সচেতনতার অভাব কতটা জ্বলন্ত।
তাই ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২’–এর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। পোস্টার লাগানোর প্রয়োজন হলে তা নির্দিষ্ট জায়গায় এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে সীমিত রাখতে হবে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলে হবে না, জনসচেতনতা জাগানোও অপরিহার্য। পরিষ্কার দেয়াল শুধু চোখের আরাম নয়, এটা নাগরিক শৃঙ্খলার প্রতীক।
ঢাকার আরেকটি বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধার অভাব। সড়ক ও ফুটপাথে যেমন-তেমনভাবে গাড়ি পার্ক করায় যানজট বাড়ে হু-হু করে এবং পথচারীদের চলাচল ভীষণভাবে ব্যাহত হয়। অনেক সময় ওবার বা পাঠাও ট্যাক্সিগুলো যাত্রী না পেয়ে শুধু শুধু রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে বা ব্যস্ত রাস্তায় ডেকে দাঁড়িয়ে থাকে, ফলে জ্বালানি পোড়ে এবং বায়ুদূষণ বাড়ে।
মেট্রোরেল সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে মেট্রো করিডোরের গা ঘেঁষে নিরাপদ বহুতল পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এতে ‘পার্ক অ্যান্ড রাইড’ ব্যবস্থা চালু হবে এবং মূল সড়কের জটলা কমবে। নির্দিষ্ট এলাকায় সাইকেল চালানোর সুযোগ ও মেট্রো স্টেশনের কাছে নিরাপদ সাইকেল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা পরিবেশবান্ধব যাতায়াতে বড় সহায়ক হতে পারে।
ঢাকায় হাঁটাচলা অনেক সময় আসল বিপদ, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য। ফুটপাত বেদখল হয়ে যাওয়ায় মানুষকে নিরুপায় হয়ে ব্যস্ত সড়কে নামতে হয়। মেট্রো স্টেশন, বড় অফিস পাড়া, বিপণিবিতান ও বাস টার্মিনালকে যুক্ত করে আলাদাভাবে উড়াল হাঁটার পথ (ফুটওভার ব্রিজ) তৈরি করলে পথচারীদের নিরাপত্তা ও চলাচল দুটোই অনেক স্বচ্ছন্দ হবে।
এ ক্ষেত্রে কাঠমান্ডুর একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সেখানকার অনেক এলাকায় দেয়ালে পোস্টার লাগানোকে সামাজিকভাবেই খুব খারাপ চোখে দেখা হয়। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের সময়ও সরকারি দেয়ালে একটা পোস্টারও দেখা যায় না। আইন প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে কম হলেও মানুষ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনার প্রতি বড় সম্মান দেখায়। এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে ধারাবাহিক নাগরিক উদ্যোগ, প্রাথমিক শিক্ষা স্তর থেকে নাগরিক শিক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতার প্রচারের মাধ্যমে। পরিষ্কার দেয়াল সেখানে নাগরিক গর্বের প্রতীক। একইভাবে অযথা হর্ন বাজানোও সেখানে বিরল। রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে জনসাধারণের সহযোগিতা থাকলে ঢাকাতেও এমন সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব।
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা এখনো বড় এক পরীক্ষার মুখে। বাসগুলোর বাহ্যিক চেহারা যেন রেসলিং টিমের মেম্বারের মতো—আঁকাবাঁকা, ঠোকাঠুকি খাওয়া এবং উদ্ভট রঙের ছটা। বাসের ভেতরের নোংরা আসন ও অতিরিক্ত ভিড় এবং তাদের অনিয়মিত চলাচল মানুষকে বাধ্য হয়েই ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে, যা যানজট ও দূষণ দুই-ই পাল্লা দিয়ে বাড়াচ্ছে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিয়মমাফিক বাসের সংখ্যা বাড়ানো এবং সময়সূচি নিশ্চিতভাবে মেনে চলা অতীব জরুরি। বাস সেবাকে একটি নিয়ন্ত্রিত ও গোছানো কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে এটা সবার এক সুদীর্ঘ প্রত্যাশা।
শব্দদূষণ ঢাকার আরেকটি মারাত্মক সমস্যা। লাগাতার হর্ন এবং সাইরেনের অপব্যবহার জনস্বাস্থ্য ও নগর শৃঙ্খলার জন্য খুবই ক্ষতিকর। কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়।
ঢাকার রূপান্তর শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। নাগরিকদের দৈনন্দিন দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই এক হয়ে একটি শহরের চরিত্র গড়ে তোলে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক দায়িত্ববোধ যখন হাতে হাত রেখে কাজ করবে, তখন ঢাকা সত্যিকার অর্থেই বদলে যেতে পারে। তখন ঢাকা হবে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ একটি শহর, যা তার বাসিন্দাদের জন্য গর্বের বিষয় এবং অন্য শহরগুলোর জন্য উপযোগী উদাহরণ।
কবির উদ্দিন, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞ
বাংলাদেশ কান্ট্রি ফোকাল পয়েন্ট, ইসিমোড, নেপাল