গুলশানে একটা ক্যাফে আছে। সেখানে আমি গিয়েছি মাত্র দুইবার। কফিটা সাধারণ, বসার জায়গাগুলো মোটাদাগে অস্বস্তিকর, আর এসি মাঝেমধ্যে চলে তো চলে না। কিন্তু ওই সপ্তাহে আমার ইনস্টাগ্রাম ফিডে একই জায়গাটা এগারোবারের কম দেখিনি। প্রতিটা ছবি একটু আলাদা, প্রতিটা ক্যাপশনে যত্ন করে উদাসীন একটা ভাব আনার চেষ্টা - “Just a quiet Sunday”, “Good Vibes Only”। প্রতিটা ছবিতে একই কোণার টেবিলটা চেনা যাচ্ছিল। একই আলো, একই অ্যাঙ্গেল। তখন বুঝিনি এই পুরো ব্যাপারটার পেছনে শুধু ট্রেন্ড নেই, একটা পুরো কারবার আছে।
আমরা ভাবি নিজেদের প্রকাশ করছি। আসলে আমাদেরকেই আমাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
ঢাকার তরুণ মধ্যবিত্তদের জীবনযাপনে গত কয়েক বছরে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। হঠাৎ করে না, ধীরে ধীরে। কখন যে আমরা যেভাবে বাঁচি আর যেভাবে বেঁচে থাকার ছবি তুলে ধরি - এই দুটো একসাথে মিলে গেছে, বুঝতে পারিনি। এখন ক্যাফেতে যাওয়া মানে শুধু কফি খাওয়া না। যাওয়ার আগেই ঠিক হয়ে যায় কী পরা হবে, কোন কোণে বসা হবে, ছবিটা কীভাবে উঠবে। অভিজ্ঞতাটা পরিকল্পনা করা হয় কন্টেন্টের কথা মাথায় রেখে। অনেক সময় মনে হয়, কন্টেন্টটাই আসল উদ্দেশ্য, বাকিটা অজুহাত।
আর এই মেলবন্ধনের প্রতিটা বিন্দুতে কেউ না কেউ মুনাফা করছে। গুলশানের ক্যাফে কফির জন্য বেশি নেয় না, নেয় তার দেয়ালের জন্য। ধানমন্ডির বুটিক কাপড় বিক্রি করে না, বিক্রি করে একটা ব্যক্তিত্ব। বনানীর ছাদের রেস্তোরাঁয় খাবারের পরিবর্তে গুরুত্ব পায় এর ব্যাকগ্রাউন্ড। পাশাপাশি স্মার্টফোন কোম্পানি যন্ত্র বিক্রি করে এমন একটা জীবন নথিভুক্ত করার সুযোগ - যা দেখে অন্যের মনে ঈর্ষা জাগে। আমরা একই সাথে ক্রেতা এবং ক্রমশ নিজেরাই পণ্য। এটা কাকতালীয় নয়। এটা সুপরিকল্পিত।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে পারফরম্যান্সকে পুরস্কার দেওয়া যায়। ভালো আলোয় তোলা ছবি বেশি লাইক পায়। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ক্যাপশন বেশি শেয়ার হয়। এমন জীবনধারা যা একই সাথে রুচি আর সামর্থ্যের সংকেত দেয়, সেটা বেশি ফলো পায়। অ্যালগরিদম জানে কোনটা মানুষকে থামিয়ে দেয়, কোনটা স্ক্রোল করিয়ে নিয়ে যায়। আর সেই অ্যালগরিদমের চাহিদা মেটাতে মেটাতে আমরা নিজেদের জীবনকে ধীরে ধীরে একটা শোরুমে পরিণত করেছি।
ঢাকায় শ্রেণি-উদ্বেগটা সবসময় পৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি একদিকে বাড়ছে, অন্যদিকে নিজের অবস্থান নিয়ে ভেতরে ভেতরে অনিশ্চিত। কে কোথায় যাচ্ছে, কে কী পরছে, কে কোন ক্যাফেতে বসছে - এগুলো এখন শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ না, এগুলো সামাজিক সংকেত। নান্দনিক জীবন, যেখানে ক্যাফে হপিং, পোশাকের সমন্বয়, পরিকল্পিত উইকেন্ড - হয়ে উঠেছে সেই ভাষা যেটা দিয়ে একটা প্রজন্ম জানান দিচ্ছে: আমরা এসে গেছি, আমরা প্রাসঙ্গিক। আমরা গণনায় আছি।
সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান একসময় লিখেছিলেন, সমস্ত সামাজিক জীবনই এক ধরনের অভিনয়। আমরা সবসময় দর্শকদের সামনে নিজেদের উপস্থাপনা সামলায়, ভূমিকা পালন করি এবং ছাপ তৈরি করি। তিনি লিখেছিলেন, মুখোমুখি মিথস্ক্রিয়ার কথা ভেবে। কিন্তু তার যুক্তিটা আজকের ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের সাথে অবিশ্বাস্যভাবে ভালো মিলে যায়। মঞ্চ বড় হয়েছে। দর্শক তাত্ত্বিকভাবে অসীম।
তবে পার্থক্য একটাই, গফম্যানের অভিনয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল না। আজকের অভিনয়ে আছে। তরুণ ঢাকাইয়াদের ফিড ভরিয়ে রাখা ব্র্যান্ডগুলো এই নান্দনিক জোয়ারের নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়। তারাই এই জোয়ার তৈরি করেছে। একটা প্রজন্ম পরিচয়ের জন্য ক্ষুধার্ত ছিল। তারা সেই পরিচয়টা বানিয়ে দিয়েছে, একটা দামের বিনিময়ে।
জার্মান দার্শনিক এরিখ ফ্রম তার ‘The Sane Society’ গ্রন্থে লিখেছেন, আধুনিক মানুষ নিজেকে বাজারে বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসেবে দেখতে শুরু করে। নিজের মূল্য মাপে অন্যের চোখ দিয়ে। সেই মূল্য বাড়ানোর জন্য নিরন্তর ছুটে। ফ্রম লিখেছিলেন পঞ্চাশের দশকের পশ্চিমা সমাজের কথা ভেবে। কিন্তু আজকের ইনস্টাগ্রাম ফিড দেখলে মনে হয় তিনি এই শহরের কথাই বলে গেছেন। আমরা নিজেদের ব্র্যান্ড বানিয়েছি। জীবনকে কন্টেন্ট বানিয়েছি। অনুভূতিকে ক্যাপশন বানিয়েছি। আর এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের থেকে একটু একটু করে সরে এসেছি।
এর ফলাফলটা অদ্ভুত ধরনের। আমরা পরিপূর্ণ দেখতে জীবনগুলো স্ক্রোল করি, আর ভেতরে ভেতরে মনে হয় আমারটা বোধহয় যথেষ্ট না। তারপর খরচ করি - ক্যাফেতে, পোশাকে, ফটোজেনিক অভিজ্ঞতায় সেই ঘাটতি মেটাতে। কিন্তু ঘাটতি মেটে না। মেটার কথাও না। কারণ যে ঘাটতির অনুভূতিটা তৈরি করা হয়েছে, সেটা মেটানোর জন্য না, সেটা টিকিয়ে রাখার জন্য। সন্তুষ্ট ভোক্তা মানেই প্রাক্তন ভোক্তা।
এ বিষয়ে বন্ধুদের সাথে কথা হয়েছে আমার। সাধারণত রাতের দিকে, যখন ফোনগুলো টেবিলে উপুড় করে রাখা। দেখা যায় সবাই অনুভব করে যে পোস্ট করা জীবন আর আসল জীবনের মাঝে একটা ফাঁক আছে। উদ্বেগের মধ্যে লেখা আত্মবিশ্বাসী ক্যাপশন। চতুর্থ চেষ্টায় তোলা ক্যান্ডিড ছবি। অনলাইনে দেখানো শান্তিপূর্ণ রবিবার, যেটা সন্ধ্যায় প্রকৃতপক্ষে একা এবং ফাঁকা লেগেছিল। কেউ জোরে বলে না, কিন্তু সবাই জানে - আমাদের কিছু একটা বিক্রি করা হচ্ছে। তারপরও আমরা কিনি। কারণ না কেনাটা মনে হয় হারিয়ে যাওয়া।
এখানেই ভোক্তা পুঁজিবাদের সবচেয়ে চালাক নিষ্ঠুরতা - এটা জোর করে না। শুধু অংশগ্রহণ না করাকে ক্ষতির মতো অনুভব করায়। ঢাকার তরুণ মধ্যবিত্ত মহলে আপনার ডিজিটাল নান্দনিকতা হয়ে উঠেছে আপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষার, রুচি ও সামাজিক পরিচিতির মাপকাঠি। এখান থেকে সরে গেলে কোনো একটা অস্পষ্ট কিন্তু বাস্তব অর্থে আপনি সমবয়সীদের কাছে কম দৃশ্যমান হয়ে পড়বেন।
এর মানে এই না যে সৃজনশীলতাটা মিথ্যা। ঢাকার তরুণ প্রজন্ম যেভাবে তাদের দৃশ্যমান জগৎ গড়ছে তাতে সত্যিকারের শিল্পকলা আছে। সৌন্দর্যের জন্য যে শহরকে তৈরি করা হয়নি, এমন একটি শহরকে কোণে কোণে, ফ্রেমে ফ্রেমে সুন্দর করে তোলা হচ্ছে। ব্যাপারটায় এক ধরনের জেদও আছে, একটা শহরকে নিজের মতো করে দেখার জেদ।
কিন্তু সৎ থাকা দরকার - এই শিল্পকলা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ কার? আমাদের না। লাভ হচ্ছে সেই প্ল্যাটফর্মগুলোর যারা আমাদের মনোযোগ সংগ্রহ করছে, সেই ব্র্যান্ডগুলোর যারা আমাদের আকাঙ্ক্ষা সংগ্রহ করছে, আর সেই ক্যাফেগুলোর যারা তাদের সেরা দেয়ালের সামনে বসার সুযোগের জন্য তিনশো টাকা নিচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা যে পরিচয়টা গড়ছি, সেটা আমাদের নিজের তৈরি না। সেটা আমাদের দেখানো হয়েছে, শেখানো হয়েছে, বিক্রি করা হয়েছে। আমরা শুধু কিনেছি এবং সেটাকেই নিজের বলে ভেবেছি। নান্দনিক জীবনটা কখনো আসলে আমাদের ছিল না। আমরা শুধু এর দাম দিয়েছি।



