Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিয়ের নামে ঋণের বোঝা বাড়ানো কি খুব জরুরি?

বাঙালি শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য বিয়ের জমকালো আয়োজন যেন আজকাল মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিয়েতে কে কত অর্থ ব্যয় করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলে। যত জমকালো অনুষ্ঠান, তত মর্যাদা বেশি

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৩, ০৯:৩২ পিএম

দুটি মানুষের এক হওয়া, দুটি পরিবারের আত্মীয়তার শুরু আর প্যান্ডেলের নিচে পাত পেড়ে খাওয়ানো-একসময় আপামর বাঙালি মধ্যবিত্তের বিয়ে ছিল এটা। কিন্তু এখন বিয়ে মানে রীতিমত সিনেমার শ্যুটিং চলে! লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন…

এনগেজমেন্ট, প্রিওয়েডিং ফটোশ্যুট, ব্রাইডাল শাওয়ার, আকদ, হলদি নাইট, মেহেন্দি নাইট, সাংগীত, বিয়ে, বৌভাত.. টানা কয়েকদিন ধরে এত এত অনুষ্ঠান আর তার জন্য কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ।

কোনো একটি অনুষ্ঠান বাদ গেলে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কাছে মান থাকে না। কখনো কখনো বর-কনে মুখভার করে আফসোস করে। বাড়ির ছোটরা রাগ করতে থাকে তাদের আনন্দে কমতি হলো বলে। না, আমি কোনো উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়ের বিয়ের কথা বলছি না। মধ্যবিত্ত আমার উঁচুদরের উচ্চবিত্ত পরিবারের বিয়ে খাওয়ার “সৌভাগ্য” হয়নি। তাই তাদের আয়োজনে আরো কী কী সব এলাহি কারবার থাকে তা আমি বলতে পারছি না।

আমি বাঙালি শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে কথা বলছি। যারা আমার চারপাশেই থাকে। তাদের কারো কারো বিয়েতে কখনো আত্মীয় হয়ে, কখনো বন্ধু হয়ে এবং কালেভাদ্রে প্রতিবেশী হয়ে আমি নিমন্ত্রিত হই। ওইসব বিয়ের জৌলুস দেখলেও বেশিরভাগ সময়ই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ব্যতিক্রম যে নেই তা কিন্তু নয়। তবে বেশিরভাগ বিয়েতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় রকম অনুষ্ঠান তো থাকেই।

মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে

বাঙালি শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য বিয়ের জমকালো আয়োজন যেন আজকাল মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিয়েতে কে কত অর্থ ব্যয় করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলে। যত জমকালো অনুষ্ঠান, তত মর্যাদা বেশি। আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী জমকালো সেসব বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা অনেক দিন মনে রাখবে আর তাদের মুখোমুখি হলেই শুনতে পাওয়া যাবে প্রশংসা।

মর্যাদার এই লড়াই করতে গিয়ে এক বিয়েতেই শুধু অনুষ্ঠান আয়োজন বাবদ ২০-২৫ লাখ টাকা নেমে যায়, কারো কারো ৩০-৩৫ লাখ খরচের কথাও শুনেছি। চোখ তো আমার কপালে উঠবেই।

সম্প্রতি একটি বিয়ে বাংলাদেশে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেটা হলো টেন মিনিট স্কুলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আয়মান সাদিক এবং ওই স্কুলেরই ইংরেজির শিক্ষক মুনজেরিন শহীদের বিয়ে। এ জুটি এবং তাদের পরিবার অবশ্য মধ্যবিত্তের মধ্যে পড়ে কিনা তা নিয়ে আপনারা প্রশ্ন করতেই পারেন। আমার নিজের মনেও সেই প্রশ্ন আছে।

তারকা জুটি আয়মান-মুনজেরিন কাজি ডেকে বিয়ে করেছেন ঢাকার একটি মসজিদে। কনের সাজে বাহুল্য নেই, বরও বেশ সাধারণ পোশাকে। তাদের এমন বিয়ের ছবি সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে যায়। অনেক তরুণ-তরুণী এমন সাধারণ বিয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু গোল বাঁধে পরদিন। যখন তাদের জাঁকজমকপূর্ণ গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ও ডিজে পার্টির ভিডিও রীতিমতো ভাইরাল হয়। শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা, বিতর্ক।

তাদের বিয়ে বা বৌভাতের আয়োজনও ছিল দারুণ জমকালো। আয়মান নাকি বিয়ের গেটেই ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন! অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের ছেলে আয়মান সাদিক। টেন মিনিট স্কুল দিয়ে নিজেও বেশ অর্থকড়ির মালিক হয়েছেন। মুনজেরিনের পরিবারও উচ্চমধ্যবিত্ত। তাই তারা বিয়েতে টাকা খরচ করতেই পারেন! আমার তাতে এত হিংসে হচ্ছে কেন?

ঠিক ধরেছেন, হিংসে যে একটু হচ্ছে সেটা কিন্তু সত্যি। আর এ কারণেই আমি তাদের বিয়ের প্রসঙ্গ টেনেছি। লাখো বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর চোখে আয়মান-মুনজেরিন আদর্শ জুটি। তাই তারাও তাদের মতো করে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখবে। গোলমালটা এখানে। আমার বাবা উচ্চবিত্ত নন, আর আমিও আয়মান বা মুনজেরিনের মত রোজগার করি না। কিন্তু স্বপ্ন দেখি তাদের মত বিয়ের আয়োজনের। যার পুরোটা চাপ গিয়ে পড়ে পরিবার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের ওপর।

সঞ্চয় ব্যয় হচ্ছে বিয়েতে

সন্তানের বিয়েতে বাবা-মা কে তাদের শেষ সঞ্চয় পর্যন্ত ব্যয় করতে দেখেছি, বিশেষ করে মেয়ের বিয়েতে। এদিকে, বরের পরিবারকে অতটা চাপ না নিতে হলেও অনেক ছেলেকে দেখেছি বিয়ের খরচের জন্য বড় অংকের ঋণ করতে। গায়ে হলুদ বা হালদি নাইটে রাতভর উচ্চ শব্দে ডিজে পার্টি না করতে পারলে মান যাবে যে। মেহেদি পরতে পার্লার থেকে লোক আনা চাই, সব অনুষ্ঠানের জন্য সাজতে পার্লারে যেতেই হবে। ফটোগ্রাফার দিয়ে নানান ধাপে ছবি তুলতে হবে। “বিয়েতে ফটোগ্রাফার না থাকলে বিয়ে করে কী লাভ, পরে তো শুধু এই ছবিগুলোই থাকবে” ...অনেক কনের মুখে আমি এ কথা শুনেছি। যেন বর না থাকলেও চলবে কিন্তু ফটোগ্রাফার থাকা চাই-ই চাই।

এই ফটোগ্রাফারদের যন্ত্রণায় বিয়ে বাড়িতে আজকাল বর-কনের দেখা মেলাই ভার। ফটোগ্রাফাররাই থাকে বিয়ে নামক সিনেমার শ্যুটিংয়ে পরিচালকের ভূমিকায়। তারা বর-কনেকে তুলে নিয়ে শহরময় ছবি তুলে বেড়ায়, বিয়ের স্টেজেও থাকে তাদেরই রাজত্ব। তাদের অনুমতি ছাড়া বর-কনের কাছে ঘেঁষার কোনো উপায় নেই। কেন রে ভাই?

বিয়ে আসলে কী?

বিয়ে মানে আসলে কী? বিয়ে মানে তো দুজন মানুষের বন্ধন, দুটো পরিবারের আত্মীয়তা। বিয়ে সমাজের ধারক, বাহক। খুব বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই। এই আশি-নব্বইয়ের দশকে মধ্যবিত্তের বিয়ে মানে ছিল বাড়ির ছাদে কিংবা উঠানে প্যান্ডেল টানিয়ে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। আত্মীয়-প্রতিবেশীদের মধ্যে যে ভালো সাজাতে পারতো, তার ডাক পড়তো কনে সাজাতে। তখন বউ মানে লাল টুকটুকে বেনারশী শাড়ি, মুখে স্নো-পাউডার, ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে কাজল, খোঁপায় ফুল, গায়ে সাধ্য অনুযায়ী গহনা আর মিষ্টি লাজুক হাসি। কারো কারো পারিবারিক আবহে গায়ে হলুদের ছোট্ট আয়োজনও হতো।

যারা নিমন্ত্রিত তারাও নতুন শাড়ি কিনতে এখনকার মত বাজারে ছুটতেন না। বরং আলমারি খুলে সবচেয়ে ভালো শাড়িটা আর নিজের থাকা গয়না থেকে কিছু একটা পরে যেতেন অনুষ্ঠানে। তারপর আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, নতুন আত্মীয়দের সঙ্গে পরিচয় আর বর-কনেকে দোয়া বা আশীর্বাদ করা। সঙ্গে খাওয়া- দাওয়া। ছবি তুলতে খোঁজ পড়তো যার কাছে ক্যামেরা আছে তার। প্রয়োজন মত “ফ্লিম” কিনে দিলে ক্যামেরার মালিক দায়িত্ব নিয়ে বিয়ের আয়োজনের ছবি তুলে দিত।

সেই সময়ের আয়োজনের তুলনায় এই সময়ের আয়োজনে কোনো এত তফাৎ। কেনো আজকাল বিয়ের আয়োজনে এত জাঁকজমক। বিয়ের সব আয়োজনের জন্য আলাদা করে হল ঘর ভাড়া না করলেই নয় (ভাগ্যিস বলিউডের মত ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের ভূত এখনো মধ্যবিত্তের ঘাড়ে সেভাবে চেপে বসতে পারেনি), সেইসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, অনুষ্ঠান অনুযায়ী পোশাক-গহনা, ডিজে পার্টি, পার্লার; তবে কী ওই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা এগিয়ে গেছে। সরকার অবশ্য তাই দাবি করে। বলে, বাংলাদেশ এখন মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চমধ্যবিত্ত দেশে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো মন্ত্রী তো আরো কয়েক কাঠি এগিয়ে দেশকে সিঙ্গাপুর-সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করেন।

ঊর্ধ্বগতির দ্রব্যমূল্যের বাজারে বিয়ের প্রস্তুতি কেমন?

অথচ, আমি দেখতে পাই মধ্যবিত্তের দৈনিক খাবারের তালিকা থেকে মাংস-মাছের পর এবার ডিম বরাদ্দও কমে গেছে। বাজার করতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খাওয়া মানুষগুলো যখন তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলে, তখন সত্যিই বুকের কোথায় যেনো ব্যথায় চিনচিন করে ওঠে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে জ্যামিতিক হারে আর চাকরিজীবীর আয় বাড়ে গাণিতিক হারে। তাই মধ্যবিত্ত পরিবারে এখন আর সঞ্চয় বলে কিছু থাকে না।

আগে সন্তান জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে খরচ কমিয়ে তাদের লেখাপড়া ও বিয়ে বাবদ একটু একটু করে সঞ্চয় শুরু করতো বাবা-মা। এটা আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে একরকম প্রথায় পরিণত হয়েছিল। মেয়ের জন্য একটু একটু করে গয়না গড়া হত। যাতে বিয়ের সময় চাপ না পড়ে।

এখন এসব কিছু সম্ভবই না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমার সরকারি চাকুরে বাবার একার রোজগারে পুরো নয় সদস্যের পরিবার চলতো। সঙ্গে বাড়িতে বাবা-মাকে খরচ পাঠানো। ভাইবোনদের বিপদে-আপদে, আনন্দ-অনুষ্ঠানে এগিয়ে যাওয়া। সবই চলতো তার একার রোজগারে। রোজার ঈদ আর জন্মদিন ছাড়াও যে নতুন জামা কেনা যায় সেটা জানা ছিল না। বছরে এক জোড়া জুতাই বরাদ্দ ছিল। তখন বিত্তবৈভব দেখি মিথ্যা সামজিক মর্যাদা আদায়ের চল ছোট্ট মফস্বল শহরে তেমন একটা ছিল না। ব্যয় কমিয়ে আমাদের চার বোনের জন্য বাবা কিছু সঞ্চয় করে রেখে গেছেন বিধায় তার অকালমৃত্যুর পরও আমার পরিবারকে ভেসে যেতে হয়নি।

অথচ, আমি আর আমার স্বামী দুজনই চাকরি করি। রোজগার নেহাৎ মন্দ নয়। চাল-চলনে সচ্ছল মধ্যবিত্ত। অথচ, সঞ্চয়ের খাতা শূন্য। নিত্যপণ্যসহ সব কিছুর আকাশছোঁয়া দামে যা আয় তার পুরোটাই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।

আমাদের সমাজ এবং আমাদের দেশেরও আমার মত অবস্থা। আয় বাড়ছে বটে, কিন্তু তার থেকে ব্যয় বাড়ার গতি অনেক বেশি। তাই মাসে অধিক ব্যয় করা দেখে এটা ভাববেন না আমাদের সামর্থ্য বেড়েছে। বরং ভেতরটা দিন দিন ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে।

মাথার ওপর বিশাল ঋণের বোঝা

বিয়ে পারিবারিক এবং সামাজিক দিক দিয়ে অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ। বিয়ের একটি পবিত্র বন্ধন এবং এর নিজস্ব মর্যাদা রয়েছে। প্রকৃত মর্যাদাকে পাশ কাটিয়ে বিয়ে নিয়ে ঠুনকো মর্যাদার যে প্রতিযোগিতায় বাঙালি মধ্যবিত্ত নেমেছে তাতে নিজের মাথার উপর বিপদ ডেকে আনা ছাড়ার আর কোনো কাজই হয় না। জাঁকজমকে ভরা বিয়ের আয়োজন করে পরিবার অথবা নিজের মাথার ওপর বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে আনন্দের সঙ্গে নতুন জীবন কী শুরু করা সম্ভব? আমার তো মনে হয় না।

ধর্মীয়ভাবেও বিয়ে নিয়ে অতিসজ্জার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, কম খরচের বিয়েই দীর্ঘস্থায়ী হয়। এমরি বিশ্ববিদ্যালয় ও সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা বিয়ের খরচের সঙ্গে বিয়ে স্থায়িত্বের সময়কালের মধ্যে যোগসূত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা দেখতে পান, জাঁকজমকভাবে বিয়ে সারতে অনেকেই সাধ্যের অতীত খরচ করেন। যেজন্য ঋণ করতে হয়। যা শোধ করতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে সংসারে চাপ বাড়ে। ওই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে অনেকেই বিপাকে পড়েন। কারণ নতুন সংসারেও যে অনেক খরচ। ফলে বিয়ের পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া ও মনোমালিন্য দেখা দেয়।

তাই ফেসবুকে বছর জুড়ে নিজের বিয়ের ছবি-ভিডিও পোস্ট করে অন্যকে বিরক্ত করা আর গালভরা গল্প বলে অন্যের চোখে হিংসের ঝলক দেখার চাইতে স্বল্প খরচে বিয়ে করাই উত্তম। না হলে আয়মান-মুনজেরিনের প্রথম দিনের মসজিদে গিয়ে সাদাসিধে বিয়ে কী আর এত প্রশংসা কুড়াতো। পরের দিনগুলোর জাঁকজমক তো প্রশংসার চেয়ে সমালোচনা কুড়িয়েছে বেশি।

শামীমা নাসরিন, সাংবাদিক।

 

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়। মূল লেখাটি জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণে প্রকাশিত।
   

About

Popular Links

x