Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ভালো পাত্র

বাবার অনেক সম্পত্তি, মামাদের বড় ব্যবসা, বড় ভাই প্রফেসর, ছোট ভাই সরকারি চাকুরে, বোন জামাইরা ভালো ঘরের ছেলে- এগুলোর মধ্যে ছেলে তথা পাত্রের কৃতিত্ব কোথায়

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৪৯ পিএম

আগে গ্রামে কিংবা আত্মীয়দের মধ্যে কোনো মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র যাচাই গুণাবলীর মধ্যে দেখা হতো- গোত্র, মাতুল কুল, বাবার সম্পত্তি কেমন আছে ইত্যাদি বিষয়। আমার এক বাল্যবন্ধু তার পরিবারের ফুফুদের, বোনেদের বিয়ের পর করুণ দশা দেখে বলতেন- “আমার বাবা-চাচাদের তো খ্যাড়ের গাদা দেখলি (এক জায়গাতে জড় করে রাখা খড়) আর মাথা কাজ করে না।” অর্থাৎ বাড়িতে খড়ের গাদা মানে মাঠে ধানি জমি আছে, গরু আছে। আর কী চাই!

এই বাড়িতে বিয়ে হলে মেয়ে নিশ্চয় খেয়ে-পরে থাকবে, সুখে থাকবে! শুধুমাত্র এই বিবেচনাতেই বয়োঃজ্যেষ্ঠরা মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ পাকা করে আসতেন।

এমনও শুনতাম-

“ছেলের বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, উনি অবসরে গেলে ওই চাকরি তো ছেলেই পাবে! এমন পাত্র কি আর সহজে মেলে?” অথবা, “ছেলের মামাদের বিশাল বড় ব্যবসা, মামারা ছেলেকে খুব বিশ্বাস করে। বলা যায়, এই ছেলেই ব্যবসা সামলায়।”

“ছেলের বড় ভাই কলেজের প্রফেসর, বোনদেরও সব ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে। ছোট ভাই সরকারি চাকরি করে, ভাইয়ে ভাইয়ে দারুণ মিল।” 

“ছেলেরা একটু দুর্বল বটে কিন্তু ওদের মাতুলকুলের সুনাম আছে, মামাদের অবস্থাও বেশ ভালো।”

“বাবার অবস্থা তেমন ভালো না, মামার বাড়ি থেকে লেখাপড়া করেছে, মামারাই তো বিয়ে দিচ্ছে। আমাদের মেয়ে তো মামা শ্বশুরবাড়িতেই উঠবে। মামা শ্বশুররা আশীর্বাদের সময় সোনার বালা দিয়েছে।”

সেই ছোটবেলা থেকেই একটা বিষয় আমি বুঝে উঠতে পারতাম না, এই যে ছেলের বাবার অনেক সম্পত্তি, মামাদের অনেক বড় ব্যবসা, বড় ভাই প্রফেসর, ছোট ভাই সরকারি চাকুরে, বোনের জামাইরা ভালো ঘরের ছেলে- এগুলোর মধ্যে ছেলে তথা পাত্রের কৃতিত্ব কোথায়?

এরপর একটা লম্বা সময় আমি পাত্র নির্বাচনে এই গ্রামীণ হিসেব, বিবেচনা চেনাজানা মানুষদের বিয়ে সম্পর্কিত আলোচনা থেকে দূরেই ছিলাম। এমনকি বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান থেকেই দূরে থাকতাম। পারিবারিক ও পেশাগত কারণে আবার এই বিষয়ক আলোচনায় যুক্ত হতে হচ্ছে। 

একটা বিষয় খেয়াল করে দেখেছি, পাত্র নির্বাচনে উপরোক্ত বিবেচনা এখন অনেকটাই গৌণ হয়ে পড়েছে। তবে এখন যাদের কথা বলছি, তাদের বেশিরভাগই গ্রামের তুলনামূলক  শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর অংশ, কমপক্ষে জেলা শহরের বাসিন্দা, ঢাকা শহরে বসবাসরত মানুষ। কাজেই এই চিত্র দিয়ে আমার ছোটববেলায় দেখা গ্রামীণ সেই অংশের মানুষদের মন-মানসিকতার অগ্রসরতা পরিমাপ করা ঠিক হবে না।

সম্প্রতি আমি এমন একটা কাজের সাথে যুক্ত হয়েছি, যেখানে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী গ্রামীণ কিশোরীদের সঙ্গে সরাসরি আলাপের সুযোগ হচ্ছে। যাদের একাংশের বাল্যবিয়ের ঝুঁকি রয়েছে। তিনটি প্রশ্নের আলোকে এমন একাধিক গ্রামীণ কিশোরী দলের কথা শোনার সুযোগ হয়েছে। 

প্রথম প্রশ্ন হলো- বিয়ের সময় তোমার এবং জীবনসঙ্গীর বয়স কত হওয়া উচিত বলে মনে কর? দ্বিতীয়, বিয়ের সময় তোমার এবং জীবনসঙ্গীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কী হবে? তৃতীয় প্রশ্ন, জীবনসঙ্গীর কী কী গুণাবলী থাকা উচিত বলে মনে কর?

প্রশ্নগুলোর উত্তরে কিশোরীদের একাংশের এখনও বদ্ধমূল ধারণা তাদের নিজেদের বয়স ১৮ এবং ছেলের বয়স ২২ হলেই যথেষ্ট। কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে বলে, “আমার বাইশ, ছেলের ২৪-২৫ বছর হলেই হবে।” 

খুব অল্পসংখ্যক মেয়েই মনে করে, তাদের বয়স ২৫ এবং তাদের জীবনসঙ্গীর বয়স ২৭-২৮ বছর হলেই ভালো। হাতেগোনা দু-একজন বলেন দু’জনেই স্বাবলম্বী হয়ে বিয়ে করা উচিৎ। 

প্রথম দু’টি প্রশ্ন পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। মূলতঃ তিনটি প্রশ্নই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু আমি তৃতীয় প্রশ্নে উত্তরের আলোকেই আলোচনা এগিয়ে নিতে চাই। 

প্রশ্নে কিশোরীদের উত্তর হলো- জীবনসঙ্গীর পরিবারের সবার সাথে মানিয়ে চলার ক্ষমতা থাকতে হবে, সৎ হতে হবে, চেহারা সুন্দর হতে হবে, টাকা-পয়সা থাকতে হবে ইত্যাদি। তবে একটা সাধারণ প্রত্যাশা ছেলেকে ধার্মিক হতে হবে। আমার কাছে একটু অবাক লাগল, আমি পূর্বে উল্লেখিত  পাত্রের যে গুণাবলীর কথা গ্রামীণ মানুষেরা বিবেচনা করতেন, সেগুলোর কোনোটার সাথেই আমি একমত নই। কিন্তু তাদের সেই গুণাবলী’র মধ্যে ধার্মিক হতে হবে কিংবা ধার্মিক হওয়াটাকে কৃতিত্ব হিসাবে গণ্য  করা হয়নি।  

আজ থেকে ২০-২৫  বছর আগে গ্রামীণ মা-বাবারা পাত্র নির্বাচনে যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেননি বটে, কিন্তু সবার বিবেচনায় একটা জাগতিক ব্যাপার ছিল, যেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কন্যার ভবিষ্যৎ জীবনের ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা, খেয়ে-পরে থাকার নিশ্চয়তা প্রাধান্য পেয়েছে। আজ প্রায় দুই-যুগ পরে এসে আমরা শুনছি, আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম তাদের জীবনসঙ্গী নির্বাচনে ধর্মপরায়ণতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এই ধর্মপরায়ণতার ইহজাগতিক ইতিবাচক দিকগুলো আসলে কী? এটা কেন আমাদের ভবিষ্যৎ যাদের বলছি তাদের একাংশের কাছে এত প্রত্যাশিত? 

এর পেছেনে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে কিন্তু ধর্মীয় কোনো কারণ যে নেই, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ যে কিশোরীরা ধার্মিক জীবনসঙ্গী প্রত্যাশা করছে, তারা নিজেরা এখনও ধর্ম কী, ধর্মীয় জীবনাচরণ কী, ধার্মিক বলতে আসলে কী বোঝায়, সেগুলো বোঝার স্তরে পৌঁছায়নি বলে আমরা ধরে নিতে পারি। 

প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে কেন তারা ধার্মিক জীবনসঙ্গী প্রত্যাশা করছে? 

এর প্রধান কারণ হল সামাজিক। সমাজে কথিত ধর্মীয় জীবনযাপনের প্রবণতা, আমি, আমার পরিবার বেশি ধার্মিক এইটা জাহির করার প্রবণতা আজ থেকে ২০-২৫  বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। এই সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। যখন রাজনীতি সমাজকে নিযন্ত্রণ করে, কিংবা মানুষের কথা বলার, মতামত প্রকাশের অধিকার সীমিত হয়ে আসে তখন মানুষ ভিন্নপথে চলতে অভ্যস্ত হয়, ভিন্নভাবে নিজের মতামত জানান দিতে চায়। সেই ভিন্নপন্থার সবচেয়ে সহজতম উপায় হলো, কথিত ধর্মীয় জীবন-যাপন, মানুষকে কথিত ধর্মের পথে আহ্বান। এখানে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকি কম, আবার নিজের অস্তিত্বও জানান দেওয়া যায়। ভাবখানা এমন তুমি রাজনৈতিক নেতা ঠিক আছে, কিন্তু আমারও একদল অনুসারী আছে। তারা আমার কথা শোনে, আমলে নেয়। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদিতে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ব্যাপারেও আমার মতামত গ্রহণ করে। সমাজের এই কথিত ধর্মীয় নেতাদের মানুষকে ইহজাগতিক জীবনে পথের দিশা দেখানোর মতো জ্ঞান কিংবা কাণ্ডজ্ঞান কোনোটাই না থাকায় তাদের একটাই ছবক ধর্মের পথে চল। পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে ধার্মিক কি-না বিবেচনায় নাও। 

যে কিশোরীদের কথা বললাম, তারা তো এমন সমাজের মধ্যেই বড় হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবেও অসচ্ছল, এই সব পরিবারের কিশোরীদের এই প্রত্যাশার মধ্যে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের এক অনুজ্জ্বল ভবিষ্যতের চিত্র দেখে আমি বিমর্ষ বোধ করি। রাজধানী এবং গ্রামের সাথে কথিত উন্নয়নের কী ফারাক! কী উপরিকাঠামোতে, কী ভেতর কাঠামোতে। 

স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় সুউচ্চ ভবন নির্মিত হচ্ছে। সেই ভবনগুলোতে দিনের একটা লম্বা সময় পার করে আসা আমাদের কিশোরীরা এই স্বপ্ন দেখতে শিখছে না যে, তারা স্বাবলম্বী হয়ে বিয়ে করবে। তারা জোর দিয়ে বলতে শিখছে না, আমার জীবনসঙ্গী হবে এমন যে আমাকে সম্মান করবে। তাহলে আমাদের কথিত মানুষ গড়ার কারিগরেরা কেমন মানুষ গড়ছেন, প্রশ্ন থেকেই যায়। 

এই দেশে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে এখন দারুণ হাহাকার, সমাজে দেশে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের কথিত গণমাধ্যম আরও একধাপ এগিয়ে জানান দিচ্ছেন, ডিভোর্স বেশি দিচ্ছেন মেয়েরাই। তাতে হাহাকার করা মানুষদের হায় হায় ভাব আরও বেড়ে যায়, তারা এতদিন যাদের অবলা ভেবে আসছিলেন, তারা এতবড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন? এ তো সমাজের জন্য, গোটা পুরুষ জাতির জন্য হুমকি! 

কিন্ত এর কারণ নিয়ে কেউ কথা বলছেন না। পত্রিকাওয়ালারা যেগুলো বলছেন, সেগুলোও ভাসা ভাসা। আমার মনে হয়, এর মূল কারণ নিহিত এই কথিত পাত্র-পাত্রী তথা জীবনসঙ্গী নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যেই। এই একবিংশ শতাব্দিতে এসেও আমাদের প্রজন্মের গ্রামীণ কিশোরীদের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করে দিচ্ছেন, অভিভাবকেরা। যে মেয়েটি বুঝেই উঠতে শেখেনি জীবন কী? তার আবার জীবনসঙ্গী কী? তার জন্য “পাত্র” কথাটাই উপযুক্ত। যেন কোনো বস্তু একটি পাত্রে রাখলাম! 

কী অসংবেদনশীল আমাদের এই সমাজ। শুধু কি গ্রামীণ কিশোরী, শহুরে কথিত শিক্ষিত মেয়েদেরও এই সমাজে বিয়ে হয়, ছেলেরা বিয়ে করে। ফলাফল যা হওয়ারর, তাই হয়। শুধু বিচ্ছেদের জন্য হাহাকার করে কোনো লাভ আছে? যাদের মধ্যে কোনো বন্ধনই গড়ে উঠে না, তাদের আবার বিচ্ছেদ কী?

জীবনসঙ্গী নির্বাচনের উপযুক্ত বয়সের আগে যতদিন আমাদের মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হবে, যতদিন না “আমাদের মেয়েরাও বিয়ে করতে পারে,” এই ধারণা সমাজে জন্মলাভ করবে, যতদিন না আমাদের ছেলে-মেয়েরা জীবনসঙ্গী নির্বাচনে ব্যক্তি মানুষ হিসাবে সঙ্গী-সঙ্গিনীকে কেন্দ্রে না রাখতে শিখবে ততদিন কথিত সমাজ হিতৈষীদের এই হাহাকার চলতে থাকবে। 

আর যারা পরিবারের কথা ভেবে, সমাজের কথা ভেবে হিতৈষীদের কথা ভেবে বিচ্ছেদ ঘটাতে পাছেন না, পারবেন না, তাদেরকে এই জীবন কেবল বয়ে বেড়াতে হচ্ছে, বয়ে বেড়াতে হবে। সেই দিনের প্রত্যাশায় রইলাম, যেদিন আমাদের যুবক-যুবতীরা পাত্রী-পাত্র নয়; জীবনসঙ্গী খুঁজে নেবেন। অভিভাবকেরা তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাবেন। সঙ্গী নির্বাচনে কথিত ধার্মিক নয়; মানুষকে বিবেচনার কেন্দ্রে রাখবেন।

মানবাধিকার কর্মী অপূর্ব দাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমি অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও।
 

 

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links