নাজমুল হোসেন
বর্তমান সময়টি তথ্যের অবাধ প্রবাহের। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনের স্ক্রল করলেই আমরা ভেসে যাই তথ্যের এক বিশাল মহাসমুদ্রে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই স্বর্ণযুগে নিউজ ফিড খুললেই চোখে পড়ে হাজারো খবরের লিংক, ভিডিও আর গ্রাফিক কার্ড। কিন্তু এই প্রাচুর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে ‘গভীর অন্ধকার’।
সঠিক ও ভুলের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে তৈরি এই ফিডে মানুষ দেদারছে তথ্য বিশ্বাস করছেন। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই একের পর এক শেয়ার, কমেন্ট আর লিংক আদান-প্রদানের মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ সব ভুল তথ্য। এমনকি, অনেক ক্ষেত্রে এই গুজব বা ভুল সংবাদ জাতীয় ইস্যুতে রূপ নিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করছে।
এত নেতিবাচকতার মাঝেও একটি বিশেষ শ্রেণি রয়েছে, যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ‘চাঞ্চল্যকর’ কিছু দেখলেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করেন না। তারা সত্যতা যাচাই করতে এখনো নির্ভরযোগ্য মূলধারার পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা টেলিভিশনের সংবাদের ওপর চোখ রাখে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবং দ্রুত তথ্য পাওয়ার দৌড়ে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো এক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে।
সঠিক নিউজ তাৎক্ষণিকভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে দেশের বেশ কিছু অনলাইন গণমাধ্যম দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, এই বিশ্বাসের জায়গাটুকুতেই এখন ফাটল ধরাচ্ছে এক শ্রেণির ক্লিকবেটনির্ভর সংবাদমাধ্যম।
গ্রামে প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, ‘এক মণ দুধে এক ফোঁটা চোনা-ই’ যথেষ্ট। আমাদের অতি চেনা গণ্ডির বেশ কিছু গণমাধ্যম বর্তমানে এই ‘চোনার’ কাজটাই অত্যন্ত সুচারুভাবে করে যাচ্ছে। তাদের প্রাথমিক এজেন্ডা হলো পাঠককে তথ্য দেওয়া, কিন্তু সেটা অত্যন্ত ‘বাজে প্রক্রিয়ায়’। সাংবাদিকতার পরিভাষায় আমরা এটাকে বলি ‘ক্লিকবেট জার্নালিজম’। এদের কাজ হলো এমনভাবে হেডলাইন সাজানো, যাতে পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে লিংকে ক্লিক করতে বাধ্য হন।
উদাহরণস্বরূপ, দেশের কোনো পরিচিত বা গুণী মানুষের নামের সঙ্গে যদি কোনো সাধারণ মানুষের নাম মিলে যায় এবং সেই সাধারণ মানুষটি মারা যান, তবে এই পোর্টালগুলো শিরোনাম করবে সেই বিখ্যাত ব্যক্তির নাম ধরে। শিরোনাম এমন ধোঁয়াশাপূর্ণ রাখা হয় যেন পাঠক বুঝতেই না পারেন আসলে কে মারা গেছেন। নিউজ পড়ার পর পাঠক যখন সত্যটা বোঝেন, ততক্ষণে ওই পোর্টালের রিচ বা ভিউয়ের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেছে। এমনকি অনেক সময় মূল ছবি ব্যবহার না করে ‘প্রতীকী ছবির’ আড়ালে আসল ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। স্রেফ সাংবাদিকতা নয়, এটি পাঠকের কৌতূহলকে পুঁজি করে এক ধরনের ডিজিটাল প্রতারণা।
সাধারণ কোনো তথ্য, যা খুব সহজেই পাঠককে বলা সম্ভব, সেখানেও ক্লিকবেট পোর্টালগুলো ব্যবহার করছে ‘রোমহর্ষক তথ্য’, ‘চমকে যাবেন’, ‘এতদিন যা জানা যায়নি’ ‘ঘটনা কী’- এই জাতীয় সব চটকদার শব্দ। পাঠক যখন বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে লিংকে প্রবেশ করেন, তখন ভেতরে গিয়ে দেখেন সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। হয়তো নিউজ বডিতে লেখা আছে ‘মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি’। এই যে তথ্যের শূন্যতা, কিন্তু শিরোনামে বিশালত্বের দাবি; এটি পাঠকের সঙ্গে এক অদ্ভুত মস্করা ছাড়া আর কিছুই নয়। তথ্যের চেয়ে এখানে ‘প্যাকেজিং’ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি অর্থাৎ সত্যনিষ্ঠাকে ধ্বংস করছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, একদল লোক বা মিডিয়া হাউজ এই চটকদার সাংবাদিকতাকেই ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট জার্নালিজম’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, শিরোনাম আকর্ষণীয় করা গণমাধ্যমের অন্যতম মূল দায়িত্ব। কিন্তু তারা জনস্বার্থ সাংবাদিকতার সংজ্ঞাটাই সম্ভবত বদলে ফেলেছেন।
আসল জনস্বার্থ সাংবাদিকতা হলো জনসাধারণের কল্যাণ, স্বচ্ছতা এবং সত্য উদঘাটনের লক্ষ্যে কাজ করে। অপরাধ, দুর্নীতি, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত সমস্যার মতো সমাজের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন বিষয়গুলোকে ফোকাস করে। যা গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য অপরিহার্য। অথচ বর্তমান সময়ে ‘চটকদার শিরোনাম’ বা ‘ভালগার হেডিং’ দিয়ে নিউজ করে সেটাকে জনস্বার্থ বলে প্রতিষ্ঠিত করার যে নির্লজ্জ প্রচেষ্টা চলছে, তা পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য লজ্জাজনক। সস্তা জনপ্রিয়তাকে জনস্বার্থের মোড়কে ঢাকা দেওয়ার এই প্রবণতা মিডিয়া এথিক্সের চরম লঙ্ঘন।
সোশ্যাল মিডিয়ার অবাধ বিচরণে আরেকটি বিষয় মহামারির পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো ‘ফটোকার্ড বাণিজ্য’। কোনো ঘটনা ঘটা মাত্রই তথ্যের ন্যূনতম যাচাই-বাছাই না করে একটি গ্রাফিক কার্ড পোস্ট করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মুহূর্তেই ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। যার নামে এই কার্ডটি তৈরি হয়, তিনি দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের রোষানলে পড়েন, তার সামাজিক ও ব্যক্তিগত মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়।
কিন্তু যখন দেখা যায় কার্ডের তথ্যটি ভুল ছিল, তখন সেই গণমাধ্যমটি কোনো প্রকার দুঃখ প্রকাশ বা সংশোধনী ছাড়াই পোস্টটি সরিয়ে নেয়। এটি অনেকটা ‘ঘণ্টার’ মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে; যখন মন চাচ্ছে বাজাচ্ছে, আবার যখন ইচ্ছে থামিয়ে দিচ্ছে। এই যে দায়হীনতা, এটি ভয়াবহ। এছাড়া ‘বিস্তারিত কমেন্টে’ লিখে শিরোনাম পোস্ট করার যে মহামারি চলছে, তা ক্লিকবেট চর্চাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পাঠককে কৌশলে কমেন্ট বক্সে নিয়ে আসা এবং সেখান থেকে রিচ বাড়ানোই এখন অনেক মিডিয়ার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পুরো পরিস্থিতির সব দায় এসে পড়ে সাধারণ সাংবাদিকদের ওপর। পাঠক যখন দেখেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন, তখন তিনি কমেন্টে ‘বাজে মন্তব্য’ করেন। এতে সংবাদমাধ্যমটির রিচ-ভিউ আরও বাড়ে, কিন্তু সম্মান যায় গোটা সাংবাদিক সমাজের। অথচ পর্দার আড়ালের সত্যটা হলো, সাংবাদিকদের এখানে ব্যক্তিগত দায় খুব কম। তারা অনেকটা চিত্রনাট্য অনুযায়ী অভিনয় করা শিল্পীর মতো। অফিসের পলিসি বা ম্যানেজমেন্ট যেভাবে নির্দেশনা দেয়, তারা সেটাই পালন করেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে যেখানে জীবিকা নির্বাহ করাই কঠিন, সেখানে স্রোতের বিপরীতে হাঁটা একজন সংবাদকর্মীর জন্য দুঃসাধ্য। অফিসের নির্দেশ অমান্য করলে বা ‘রিচ’ এনে দিতে না পারলে বেচারার চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। বিনিয়োগকারীরা যখন শর্টকাট মাধ্যমে আলোচনায় আসার পথ খোঁজেন, তখন নীতিবান সাংবাদিকতা গুরুত্ব হারায়। ফলে সাংবাদিকদের হাতে সম্মান নয়, কেবল টিকে থাকার লড়াইটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
দেশে এখন ব্যাঙের ছাতার মতো সংবাদমাধ্যম গজিয়ে উঠেছে। বিপুল বিনিয়োগ করে তারা স্টুডিও বা অফিস বানাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সচেতন পাঠক তৈরি করতে পারছে না। তাদের পাঠক মূলত ‘কচু পাতার পানির’ মতো; এই আছে, এই নেই। কারণ এই পাঠকেরা কোনো তথ্যের প্রয়োজনে সেখানে যান না, বরং চটকদার শিরোনামে বিভ্রান্ত হয়ে ক্লিক করেন।
অন্যদিকে, সচেতন মানুষ এখনো সঠিক খবরের আশায় হাতেগোনা কয়েকটা মিডিয়াকেই অনুসরণ করেন। বিনিয়োগকারীদের শর্টকাট মানসিকতার কারণে দেশে এখনো বড় কোনো মিডিয়া ব্র্যান্ড ওভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না। মানুষ দিনশেষে সেই গণমাধ্যমের কাছেই ফিরে যায়, যারা ক্লিকবেট চর্চা করে না বরং তথ্যের সত্যতা বজায় রাখে।
আমরা যদি আমাদের গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের সত্যিকারের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে দেখতে চাই, তবে ক্লিকবেট চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। দায়বদ্ধ সাংবাদিকতা এবং গণমানুষের সংবাদমাধ্যম হতে হলে আমাদের সত্য প্রকাশের নির্ভীক মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
গণমাধ্যমগুলোর তথ্যের চেয়ে দ্রুততা বড় নয়, সঠিক তথ্য সঠিকভাবে প্রকাশ- এই নীতি গ্রহণ করা উচিত। তবে পাঠককেও সচেতন হতে হবে, যাতে তারা ক্লিকবেট লিংকে ক্লিক করে এই অপসাংবাদিকতাকে উৎসাহিত না করেন। যখন একটি গণমাধ্যম তার বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখবে, তখন কেবল প্রতিষ্ঠানের নয়, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের সম্মানও পৌঁছাবে উচ্চশিখরে।
তাই সোশ্যাল মিডিয়ার এই তথ্যের ভিড়ে আমরা যেন হারিয়ে না যাই। চটকদার বিজ্ঞাপন বা শিরোনাম দিয়ে হয়তো সাময়িক ভিউ পাওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হলে আমরা কেবল নিজেদেরই নয়, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবো।
ক্লিকবেটমুক্ত সাংবাদিকতা হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার। তবেই আমাদের গণমাধ্যম মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, সঙ্গে সাংবাদিকেরা ফিরে পাবেন তাদের হারানো মর্যাদা।