রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বে আবারও দ্বি-মেরুকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়ে ইসরায়েলের নতুন নতুন জায়গা দখলের লালসা আরও বেড়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ইহুদি ইসরায়েলে আশ্রয় পাবে, তার পূর্বপুরুষ ইসরায়েলী না হলেও।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি অন্তত ১০০ জন ইহুদি আশ্রয়ের জন্য ইউক্রেন থেকে ইসরায়েলে গিয়েছে। এটা খুব সাধারণভাবে অনুমেয়, এই আশ্রিতদের নতুন আবাসন সৃষ্টিতে ফিলিস্তিনের ওপর খড়গহস্ত নেমে আসবে। অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপের অন্যতম খাত হল তেল ও গ্যাস রপ্তানি। ইউরোপের গ্যাসের চাহিদার ৪০% এবং তেলের ৩০% পূরণ হয় রাশিয়া থেকে।
অন্যদিকে, রাশিয়া ঘোষণা করেছে, তেল না নিলে ইউরোপে গ্যাসও দেওয়া হবে না। বন্ধ করে দেওয়া হবে রাশিয়া থেকে জার্মানির গ্যাস পাইপলাইন। প্রশ্ন হলো, এসব তেল কিংবা গ্যাসের চাহিদা কোথা থেকে পূরণ করবে ইউরোপ? বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরান কি হতে যাচ্ছে ইউরোপের তেলের উৎস ?
পশ্চিমা বিশ্ব ইরান থেকে তেল গ্যাস আমদানির জন্য সামনে এগোতে চাচ্ছে। আর এজন্য প্রয়োজন ইরানের ওথেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া। যার অন্যতম মাধ্যম হলো ২০১৫ সালে পিফাইভ প্লাস ওয়ান চুক্তি আবারও সচল করা। এক্ষেত্রে রাশিয়া এবং ইরান শর্তারোপ করার ঈঙ্গিত দিয়েছে যে, উভয় দেশের সঙ্গে পারস্পারিক বানিজ্যের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারবে না।
অন্যদিকে, নেদারল্যান্ড ও হাঙ্গেরি পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপে তাদের সমর্থন নেই। কারণ অন্য দেশ থেকে তেল-গ্যাস আমদানি করতে হলে হাঙ্গেরিতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। ফলে জনরোষ থেকে সরকার মুক্তি পাবে না।
পশ্চিমা দেশগুলো আবার তেল কিনতে প্রতিনিধি পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে । ভেনেজুয়েলা তাদের কাছে বন্দি থাকা কিছু মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দিয়েছে। দীর্ঘদিনের বন্ধু সৌদি বাদশা বাইডেনের সঙ্গে ফোনালাপে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। একই পথে হেটেছে সংযুক্ত আরব-আমিরাত। অর্থাৎ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রতি মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে চমক। কতিপয় দেশের জন্য এই যুদ্ধ শাপে বর গিসেবে দেখা দিয়েছে।
জিও পলিটিশিয়ান আলফ্রেড থায়ার মাহানের মতে, যার নিয়ন্ত্রণে সমুদ্র থাকবে আগামী বিশ্ব তারাই নেতৃত্ব দেবে। গত শতাব্দীর পুরো সময়টিইতে দেখেছি বিশ্বের সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবহর নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত, আটলান্টিক মহাসাগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তালে তাল মিলিয়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকেও দাপিয়ে বেড়াতে দেখা গেছে তাদের নৌশক্তি নিয়ে। সুপার পাওয়ার হতে গিয়ে ১৯৬২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতালি ও তুরস্কে মিসাইল ব্যবস্থা স্থাপনের বিপরীতে সোভিয়েত রাশিয়া কিউবাতে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল স্থাপন করতে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয়ে বিশ্ব এক পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল।
দুই পরাশক্তির মধ্যে চুক্তি হলো। শর্ত- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিসাইল ইতালি ও তুরস্ক থেকে প্রত্যাহার করবে, অন্যদিকে রাশিয়া কিউবাতে মিসাইল মোতায়েন করবে না। দুই পরাশক্তির সেই ঠাণ্ডাযুদ্ধ ৯১-এ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার মাধ্যমে শেষ হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আজ অব্দি বিদ্যমান।
যার পরিণতি দেখি ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানে বাধা কিংবা রাশিয়া তার শত্রু (বন্ধু নয়) রাষ্ট্রের তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে।
১৯৪৯ সালে ন্যাটো জোট গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার (ইউএসএসআর) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের মিত্ররা বৃহত্তর রাজনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে যেকোনো ধরনের সংঘর্ষ এড়াতে ন্যাটোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
রাশিয়ার দাবি, স্নায়ুযুদ্ধের শেষের দিকে মৌখিকভাবে রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর চুক্তি হয়েছিল যে ন্যাটো পূর্ব ইউরোপে সদস্য সম্প্রসারণ করবে না। অন্যদিকে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র এমন প্রতিশ্রুতির কথা অস্বীকার করছে। ন্যাটোতে যোগদানের প্রবল ইচ্ছাকে “ওপেন ডোর পলিসি” বলে আখ্যা দিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনকে যেকোনো মূল্যে ন্যাটোতে যোগদান থেকে বিরত রাখবে।
রাশিয়ার এ যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কিয়েভ দখল করে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী সরকারের পতন ঘটিয়ে ন্যাটো থেকে এই নিশ্চয়তা চাওয়া যেন ইউক্রেন কখনো ন্যাটোর সদস্য হতে না পারে। ইতোমধ্যে দুইবার রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তৃতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যস্থতায়।
উল্লেখ্য, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এ যুদ্ধের ইতি ঘটতে যাচ্ছে এবং তিনি এও জানিয়েছেন ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হওয়ার জন্য আর আগ্রহী নয়। কারণ এ যুদ্ধে উত্তেজনা ছড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো ইউক্রেনকে যুদ্ধের মাঠে একা ছেড়ে দিয়েছে।
ইউক্রেন সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার অন্যতম সদস্য ছিল এবং ইউক্রেনের অধিকাংশ মানুষ রুশভাষী। তাই রাশিয়া চাইছে প্রচুর ধ্বংসযজ্ঞ এড়িয়ে কৌশলে কিয়েভ দখল করে জনগণকে না ক্ষেপিয়ে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী সরকারকে হটিয়ে রুশপন্থী সরকারকে বসাতে। রাশিয়া তাদের শর্তে মিনস্ক চুক্তি অনুসারে দোদেনস্ক ও লুহানস্ক প্রজাতন্ত্রকে ইউক্রেনের স্বীকৃতিদানের বিষয়টি যুক্ত করতে যাচ্ছে।
এসবের ফলে বিশ্ব নতুন করে দুই মেরুকরণ দেখতে যাচ্ছে। জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে ৩৫টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং রাশিয়ার পক্ষে ৫টি দেশ ভোট দেয়। এসব দেশকে রাশিয়া নিজের বলয়ের মনে করে। এশিয়ার শক্তিশালী ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইরান রুশপন্থী হিসেবে দিনদিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একই অবস্থায় ছিল গোটা বিশ্ব। ১৯৪৫ সালের পর দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকা বিশ্ব আজ রাশিয়া-চীন বলয়ে ভাগ হতে চলেছে। মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমাদের ফিলিস্তিন এবং ইউক্রেন ইস্যুতে দ্বিমুখী নীতির প্রচণ্ড সমালোচনা করছে।
আপাতদৃষ্টিতে রাশিয়া চাপে থাকলেও পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘকালীন সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে। ইউরোপ তার নিজের পথ দেখবে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ভুল আর করবে না বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে না। তবুও আশা করা যাচ্ছে, রুশঘেঁষা দেশ তুরস্ক মধ্যস্থতার দায়িত্ব নেওয়ায় ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের দ্রুত সমাধান হবে। সাধারণ মানুষ যুদ্ধের দুর্যোগ থেকে মুক্তি পাবে।
মো. হাফিজুর রহমান শিকদার,
প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরগুনা সরকারি মহিলা কলেজ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের দায় নেবে না।