Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ভারত-পাকিস্তান নতুন সংঘাতের আশঙ্কা

আবারও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৫, ০৩:৪৯ পিএম

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নয়নাভিরাম পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র পেহেলগামে গত ২২ এপ্রিল সন্দেহভাজন বিদ্রোহীরা অন্তত ২৬ জন পর্যটককে হত্যা করেছেন।

গত ২৫ বছরে এটি কাশ্মীরে ঘটা সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা, যা কি-না ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও খারাপ দিকে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। হামলাটি ঘটেছে কাশ্মীরের দক্ষিণ অনন্তনাগ জেলায়। হামলার সময় পুরো অঞ্চলটি পর্যটকে ভরপুর ছিল।

কাশ্মীরে হামলার ঘটনার পর ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ওয়াঘা সীমান্তের প্রবেশদ্বারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পাহারা বাড়ানো হয়েছে। বরাবরের ন্যায় ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান “ক্রস-বর্ডার টেরোরিজমে” মদদ দিচ্ছে। যদিও তা প্রমাণ করা এখনো সম্ভব হয়নি।

কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এলাকায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় শান্ত অঞ্চলটির পরিস্থিতি চরম অশান্ত হয়ে উঠেছে।

এই পর্যটন এলাকাটি মুহূর্তেই রক্তাক্ত বিভীষিকার স্থলে পরিণত হয়েছে। এতে করে পরমাণু অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হামলার সময় বন্দুকধারীরা ঘন পাইন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

হামলার শিকার হওয়া লোকজন তখন পিকনিকের মেজাজে ছিলেন। কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরছিলেন। হামলার পরপরই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, এর “কড়া ও স্পষ্ট জবাব” দেওয়া হবে।

দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ) নামের স্বল্প পরিচিত একটি গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।

তবে ভারত মনে করছে, এই গোষ্ঠী আসলে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা বা এমনই অন্য কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের ছদ্মনাম। তবে বিষয়টি এখনো সুস্পষ্ট না।

পাকিস্তান অবশ্য জঙ্গিদের কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে। তবে তারা বলছে, কাশ্মীরিদের “স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে” তারা নৈতিকভাবে সমর্থন করে। তবে কাশ্মীদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করার কোনো সুযোগ নেই।

এই নির্বিচার হত্যার প্রেক্ষিতে আবারও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড কাশ্মীর নিয়ে তিনটি যুদ্ধ করেছে।

এর বাইরে বেশ কয়েকবার তারা যুদ্ধের কাছাকাছি অবস্থানে গিয়েছে।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পর ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানি নাগরিকেরা নিজের দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেছেন, হামলাটি এমন এক সময় হলো যখন মাত্র এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির কাশ্মীরকে পাকিস্তানের জাগুলার (গলার শিরা বা ভেইন) বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের কাশ্মীরি ভাইদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে একা ফেলে দেব না।”

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক লেখক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “এটি অঞ্চলটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। আমরা দেখছি, দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী এখন একে অপরের দিকে আক্রমণাত্মক চোখে তাকিয়ে আছে। এখন কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।”

হামলার পর ভারত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তানের হাই কমিশনের প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমানবাহিনীর উপদেষ্টাদের বহিষ্কার করেছে; গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্য পথ বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং প্রথমবারের মতো সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।

সিন্ধু পানিচুক্তির মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় নদীব্যবস্থার পানিবণ্টন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই নদ ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে এবং দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনধারণে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

এতদিন কখনোই ভারত এই চুক্তিকে স্থগিত করেনি; এমনকি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ চলার সময়ও তা করেনি।

নিহতদের প্রতি শোক জানাতে হামলার পর কাশ্মীরের ১২টির বেশি সংগঠন তাদের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। সমবেদনা জানাতে তারা অবহেলা করেনি। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ মিছিল করেছে এবং “পর্যটকরাই আমাদের জীবন” বলে স্লোগান দিয়েছে।

শিব নাডার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সিদ্দিক ওয়াহিদ বলেন, “কাশ্মীরিরা সত্যিই এই ঘটনায় খুব ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।”

কাশ্মীরে সহিংসতা নতুন কোনো বিষয় না। হিন্দুপ্রধান ভারত ও মুসলিমপ্রধান পাকিস্তান—দু’দেশই এই অঞ্চলকে নিজেদের দাবি করে আসছে। ১৯৮৯ সালে ভারতের বিরুদ্ধে এখানে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহিত হয়েছেন এবং চরম অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন।

২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদির সরকার একটি চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে দেয় এবং রাজ্যকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।

হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী মোদি সরকার বাইরের লোকদের কাশ্মীরে জমি কেনার অনুমতিও দেয়, যাতে কাশ্মীরকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও বেশি সংযুক্ত করা যায়।

এই পদক্ষেপের ফলে নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর হয় এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের তৎপরতা অনেক কমে যায়। ফলে পর্যটক সংখ্যা বেড়ে যায়। ২০২৪ সালে রেকর্ড ৩৫ লাখ মানুষ কাশ্মীর ভ্রমণ করেন।

মোদি সরকার এই পরিস্থিতিকে “সাধারণীকরণ” হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করেন।

দিনদুপুরে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা একটি এলাকায় এমন হামলার পর সরকারকে কড়া প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।

কাশ্মীরে হামলার ঘটনার পর নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাই কমিশনের গেটের বাইরে পুলিশের সতর্ক প্রহরা বৃদ্ধি করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর যেমন ভারত সীমান্ত পেরিয়ে পাল্টা হামলা করেছিল, এবারও তেমন কিছু করতে পারে।

পুলওয়ামায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪০ জন ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু এবার যেহেতু নিহত ব্যক্তিরা সাধারণ পর্যটক, তাই রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

এই হামলার সময়টা রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়টাতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতে সফর করছিলেন।

ভ্যান্স তার প্রথম সরকারি সফরে ভারতে এসে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করার কথা বলেন এবং ভারতকে একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রশংসা করেন।

২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের পার্লামেন্টে এক সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

ভারত অভিযোগ করেছিল, হামলাটি পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীরা করেছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিকভাবে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

এ প্রসঙ্গে মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “আমরা যেসব বার্তা পাচ্ছি, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ভারতের পাশে রয়েছে এবং ভারত কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালে যুক্তরাষ্ট্র তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করবে না।”

ভারতের পদক্ষেপের বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে ২৪ এপ্রিল, ২০২৫ বৃহস্পতিবার  দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক হয়।

কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার জেরে গতকাল সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতসহ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি পদক্ষেপ নিয়েছিল ভারত। পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) বৈঠকে তার পাল্টায় বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো বিবৃতিতে সিদ্ধান্তগুলো মিডিয়াকে জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান কঠোরভাবে ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা নাকচ করেছে। পাকিস্তান বলেছে, এই চুক্তি বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি, এককভাবে এই চুক্তি স্থগিতের কোনো বিধান নেই। পানি পাকিস্তানের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু, তা দেশের ২৪ কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করে এবং যেকোনো মূল্যে এই পানি পাওয়ার বিষয়টি রক্ষা করা হবে। সিন্ধু চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান যে পানি পাবে, তার প্রবাহ বন্ধ বা অন্যদিকে নেওয়ার যেকোনো চেষ্টা এবং ভাটি অঞ্চলের অধিকার ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা যুদ্ধের শামিল বলে বিবেচনা করা হবে এবং জাতীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করে এর জবাব দেওয়া হবে।

পাকিস্তানের কঠোর পদক্ষেপ প্রমাণ করছে ভারতের হুমকিতে তারা ভীতু না। যেকোনো মূল্যে বা উপায়ে ভারতের জবাব দিতে পাকিস্তান বদ্ধপরিকর। উভয়পক্ষের পাল্টা-পাল্টি সিদ্ধান্তে কাশ্মীর উপত্যকায় আবারও যুদ্ধের সংঘাত উঁকি দিচ্ছে।

মো. মোস্তফা মিয়া, অধ্যক্ষ ও এনজিও ব্যক্তিত্ব
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x