ভারতের পার্লামেন্টে ইতোমধ্যে মুসলিম সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা আইন সংশোধনের একটি বিতর্কিত বিল পাস হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকারের উত্থাপিত এই বিলের বিরোধিতা করেছে মুসলিম সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো। এর প্রতিবাদে ভারতব্যাপী আন্দোলন চলছে। মুসলিম বিশ্বে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাচ্ছে।
বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, “ওয়াক্ফ” সম্পত্তি পরিচালনা বোর্ডে অমুসলিমদের নামও সংযুক্ত করা যাবে। এছাড়া ওয়াক্ফ করা জমির মালিকানা যাচাইয়ে সরকারের ক্ষমতাও বাড়বে। সরকার অবশ্য বলছে, এতে দুর্নীতি কমবে, ব্যবস্থাপনা হবে সুষ্ঠু আর বৈচিত্র্য বাড়বে। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, এই বিল মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকারে আঘাত হানবে। আর সেই সুযোগে পুরোনো মসজিদসহ বহু ঐতিহাসিক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। ইতোমধ্যে বিজেপি সরকার এ বিষয়ে কাজও শুরু করে দিয়েছেন।
বিলটি নিয়ে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় উত্তপ্ত বিতর্ক শুরু হয়। যা লোকসভা থেকে রাজ্যসভায় বিগত কয়েক দিবস যাবত তীব্র বাগ্বিতণ্ডায় গড়িয়েছে।
বিরোধী দল কংগ্রেস বলেছে, এই বিল অসাংবিধানিক এবং মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক। লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও মোদির বিজেপি মিত্রদলগুলোর সমর্থনে বিলটি পাস করাতে সক্ষম হয়েছে।
লোকসভায় এই বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৮৮ জন সংসদ সদস্য, আর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৩২ জন। রাজ্যসভায় ১২৮ জন বিলের পক্ষে ও ৯৫ জন এর বিরুদ্ধে ভোট দেন। এখন বিলটি আইনে পরিণত করবার জন্য রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
১৯৯৫ সালের একটি আইন পরিবর্তনের জন্য বিলটি পেশ করেন সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। ওই আইনে ওয়াক্ফ সম্পত্তির নিয়মকানুন নির্ধারণ করা হয়েছিল। তা পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছিল রাজ্যভিত্তিক বোর্ড।
অনেক মুসলিম সংগঠন ও বিরোধী দল বলছে, এই বিল বৈষম্যমূলক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
বিলটি প্রথম সংসদে পেশ করা হয় গতবছর। বিরোধী দলগুলো বলছে, এরপর তারা কিছু সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। সরকারের দাবি, বিরোধীরা গুজব ছড়াচ্ছে এবং ওয়াক্ফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত করছে।
ওয়াক্ফ হলো মূলত ইসলামি দানের একটি প্রাচীন ব্যবস্থা। ওয়াক্ফের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি স্থায়ীভাবে সাধারণত জমির মতো কোনো সম্পত্তি ধর্মীয় বা জনহিতকর কাজে ব্যবহারের জন্য দান করেন। এ ধরনের ওয়াক্ফ সম্পত্তি বিক্রি করা বা কারও নামে হস্তান্তর করা যায় না।
ভারতে ওয়াক্ফ বোর্ডগুলোর অধীন প্রায় ৮ লাখ ৭২ হাজারটি সম্পত্তি আছে। এগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১০ লাখ একর। এসবের মোট মূল্য প্রায় ১৪.২২ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। এসব সম্পত্তির অনেকগুলোর ইতিহাস শত শত বছর পুরোনো। অধিকাংশই ব্যবহার করা হয় মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান ও এতিমখানার মতো জনকল্যাণমূলক কাজে।
ভারতে ওয়াক্ফ সম্পত্তি পরিচালনা করে আধা সরকারি বোর্ড। এই বোর্ড প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আলাদাভাবে গঠিত। নতুন আইনে বলা হয়েছে, এসব বোর্ডে অমুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হবে।
এখন পর্যন্ত ওয়াক্ফ বোর্ডে কেবল মুসলিমরাই সদস্য হন। ভারতে অন্য ধর্মীয় দাতব্য সংস্থাগুলোও নিজ নিজ ধর্মাবলম্বীদের দিয়েই পরিচালিত হয়।
সংসদীয় বিতর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, “অমুসলিম সদস্যরা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন এবং সম্পত্তি পরিচালনায় সহায়তা করবেন। ধর্মীয় বিষয়ে তারা হস্তক্ষেপ করবেন না।”
তিনি আরও বলেন, “অমুসলিম সদস্যরা শুধু নজরদারি করবেন যে বোর্ড আইন মেনে চলছে কি না আর দানকৃত সম্পত্তি যথাযথ কাজে লাগছে কি-না।”
তবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের মতো সংগঠনগুলো বলছে, এই বক্তব্য ইসলামি ওয়াক্ফ ব্যবস্থার মূল চেতনার পরিপন্থি। তাদের মতে, ওয়াক্ফ বোর্ডের পরিচালনা মুসলমানদের দ্বারাই হওয়া উচিত। তারা একে মুসলিম নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এই বিলের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছে এই বোর্ড।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, “যখন হিন্দু মন্দির পরিচালনা কমিটিতে অন্য ধর্মাবলম্বীরা স্থান পান না, তখন ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিমদের রাখা হবে কেন?”
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলেজিয়াস ফ্রিডম বার্ষিক প্রতিবেদনে জানায়, গত নির্বাচনের সময় মোদি ও তার দল মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে “ঘৃণা ছাড়ানো বক্তব্য” ও “ভুল তথ্য” ছড়িয়েছে।
সবচেয়ে বিতর্কিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো মালিকানাসংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তন। এর ফলে বহু পুরোনো মসজিদ, দরগাহ বা কবরস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, বহু সম্পত্তিই একসময় মৌখিকভাবে বা কাগজপত্র ছাড়াই ওয়াক্ফ হিসেবে দান করা হয়েছিল। এসবের অনেকেরই কোনো আইনি নথি নেই, যেগুলো কয়েক দশক বা এমনকি শত শত বছর আগের।
নতুন আইনের অন্য পরিবর্তনগুলো শত শত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ওয়াক্ফ জমির ওপর গড়া মসজিদগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। চরমপন্থি হিন্দু সংগঠনগুলো ভারতের নানা প্রান্তে বেশ কিছু মসজিদের ওপর তাদের মন্দির আছে বলে দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, এসব মসজিদ পুরোনো হিন্দু মন্দির ভেঙে তৈরি। এ ধরনের অনেক মামলা আদালতে বিচারাধীন।
নতুন আইন অনুযায়ী, এখন থেকে ওয়াক্ফ বোর্ডকে তাদের জমির মালিকানা প্রমাণ করতে জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার অনুমোদন নিতে হবে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে বোর্ডের ক্ষমতা খর্ব হবে। আর তা মুসলমানদের জমি কেড়ে নেওয়ার পথ তৈরি করবে। বোর্ডগুলোকে কতবার এই রকম জমির দাবির বৈধতা প্রমাণ করতে বলা হবে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী এক্সে লিখেছেন, “ওয়াক্ফ (সংশোধনী) বিল মুসলিমদের কোণঠাসা করার এবং তাদের ব্যক্তিগত আইন ও সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার।”
তিনি এটিকে সংবিধানের ওপর “আক্রমণ” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “বিজেপি এবং তাদের মিত্ররা এখন মুসলিমদের নিশানা করছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এটি অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে।”
অনেক মুসলমানই স্বীকার করেন যে ওয়াক্ফ সম্পত্তিতে দুর্নীতি, দখলদারি আর অব্যবস্থাপনা রয়েছে। তবে তারা আশঙ্কা করছেন, নতুন আইনের ফলে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার মুসলিমদের সম্পত্তির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। আর এখন তো ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে।
নরেন্দ্র মোদির শাসনে মুসলমানরা প্রায়ই টার্গেট হচ্ছেন। তাদের খাবার, পোশাক, এমনকি হিন্দু-মুসলিম বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়েও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন তারা।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলেজিয়াস ফ্রিডম) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানায়, ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নির্বাচনের সময় মোদি ও তার দল মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে “ঘৃণা ছাড়ানো বক্তব্য” ও “ভুল তথ্য” ছড়িয়েছে।
তবে ভারতের সরকার বলছে, দেশটি গণতান্ত্রিক নীতিতে পরিচালিত হয় এবং সেখানে কারও সঙ্গে কোনো বৈষম্য নেই।
ভারতের মোট ১৪০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১৪ শতাংশ মুসলমান। তারা ভারতের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হলেও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। ২০১৩ সালের এক সরকারি জরিপে দেখা গেছে, মুসলমানরা দেশটির সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি।
এই দরিদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর সন্তানদের লেখা-পড়ার ব্যয়ভার এই মুসলিম ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে বহন করা হয়। বৈষম্যমূলক মুসলিমবিদ্বেষী এই বিল পাস করার ফলে দরিদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠী পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো বেশি চরম অমানবিক বৈষম্যের স্বীকার হতে বাধ্য হবে। মুসলমানদের বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিজেপি সরকার রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আত্মসাৎ করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে বিজেপি সরকারের আমলে মুসলমান সমাজের ওপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জ্যামিতিক হারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। এই বিলের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বেশি করে মুসলমানদের সঙ্গে চরম অমানবিক বৈষম্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটার সমূহ সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। ভারতের মুসলমান সমাজের উচিত ঐক্যবদ্ধভাবে তা মোকাবিলা করা।



