সর্বজনীন মাস্ক প্রহর

কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। মানুষ চলে যাচ্ছে অকাতরে। এ কোভিড মহামারি এমনই। ভ্যাকসিন এলো, আমরা একটু হাফ ছাড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসটিও দিলো পাল্টি। নতুন মিউটিশনে ওমিক্রন ক'দিন আগে পর্যন্ত ত্রাস ছড়িয়েছে। দম আটকানো এ ক্ষণকে বলতে পারি “সর্বজনীন মাস্ক প্রহর”।

আগে হাসপাতালে গেলে মাস্কধারী মানুষ দেখতাম। আর এখন সর্বত্র। করোনাভাইরাস কি পুরো পৃথিবীকেই হাসপাতাল বানাতে চায়? সোশ্যাল ডিসটেন্স বজায় রেখে ছুড়ে দিলাম এ প্রশ্ন উত্তর পাবো না জেনেও।

কিছু শহরবাসী অবশ্য আগে থেকেই মাস্ক পরতেন। হতভাগা এ নগরে উন্নয়ন থামে না কর্তাদের ইচ্ছায়। মেরামতের নামে রাস্তা খনন চলে সারা বছর। সঙ্গে আছে এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলের মতো মেগাপ্রকল্প। বায়ু দূষণেও ঢাকা চ্যাম্পিয়ন বিশ্বে। শহরবাসীর তখন মাস্ক ছাড়া গতি কী? তাই মহামারীর আগেও এ শহরের অনেকে মাস্ক পরতেন।

কোভিডকালে মাস্ক সর্বজনীন হলো। জানা গেল এর অনেক ধরণ-ধারণ। এন নাইনটি ফাইভ, থ্রি লেয়ার . . . আরো কত কী! দুই নম্বরি মাস্ক নিয়েও ব্যবসা করল দুর্বৃত্তরা। ব্যবসা হয়েছে নকল কোভিড সার্টিফিকেট নিয়ে। সেই কাণ্ডের হোতা টক শো'তে ভালো ভালো কথা বলা শাহেদ-সাবরিনা গংদের দৃষ্টান্তমূলক দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়নি আজও।

এখন মানুষ মাত্রই মাস্কধারী। সরকারি আইন বলে কথা। কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘‘ মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে . . .” আর এখন বলা যায় মুখ ঢেকে যায় মাস্ক পরণে। আপনা আপনি সব মুখ মাস্ক ঢাকা। করোনা ছুঁতে পারবে না। বাড়তি সুবিধা হলো, পাওনাদার এড়ানো যাচ্ছে। চুটিয়ে গার্জিয়ানদের সামনে প্রেম করা যাচ্ছে। কেউ কাউকে চিনছেন না। আশ্চর্য অচিন বাস্তবতা!

পোশাকের মতো মাস্কেও ফ্যাশন লাগলো। দেশের নান্দনিক ফ্যাশন ডিজাইনার আর হাউজগুলো রাঙিয়ে তুললো এ নিত্য অনুষঙ্গ। নানা রঙের, নানা ডিজাইনের মাস্কে এখন চারপাশ বর্ণিল। বিশেষত তরুণ-তরুণীরা বেশি রঙিন। অন্যের চেয়ে আলাদা থাকা মানুষের স্বভাব। নিজের মাস্কটি অন্যের চেয়ে আলাদা করার দরকার পড়ল তখন। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য ব্যাপারটি ইতিবাচক। সৃষ্টিশীল ডিজাইনারদের জন্য তো আরো। নতুন পণ্যে ভাবনার বিস্তার।  

এখন পবিত্র ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি লেখা মাস্ক আছে। জাতীয় পতাকার আদলে মাস্ক আছে। কোম্পানির লোগোর মাস্ক আছে। প্রিয় কবিতার লাইন লেখা মাস্ক আছে। আমৃত্যু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়ে শহীদ হওয়া বিপ্লবের প্রতিশব্দ আর্নেস্তা চে গুয়েভারা ছবি আঁকা মাস্কও বিক্রি হয়। অনন্তলোকে থাকা এই গেরিলাযোদ্ধার তখন কেমন লাগে কে জানে?

সব মিলিয়ে মাস্ক এখন সময়ের বিজ্ঞাপন। ফ্যাশনে, ভূষণে, রঙে, ঢঙে সবার চাই ভিন্নতাবাহী মাস্ক। কোভিড এড়াতে মাস্ক লাগবেই। আর তা বর্ণিল হলে মন্দ কী?

মাস্কের একটা নেতিবাচক দিক বলে লেখা শেষ করছি। মাস্কের জন্য আমরা মানুষের হাসি মুখ দেখি না বহুদিন। এখন সব কিছুর মতো হাহা-হিহিও চলে মুখ ঢেকে। মানুষের উৎফুল্ল হাসি মুখ আবার কবে দেখা যাবে? - এ প্রশ্নের উত্তর কোথা পাই?


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালে ১৩ নভেম্বর প্রকাশিত হয় হাসান শাওনের প্রথম বই ''হুমায়ূনকে নিয়ে''।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।