কোভিডের প্রকোপ কমে আসার পর আমরা যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলাম, তখনই আরেক সমস্যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আঘাত হানে। যার অবশ্যম্ভাবী প্রভাব, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি।
আগস্টে হঠাৎ করে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সড়কে ট্রাক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাবে বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ধাক্কা খায়।
এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পর কোনো দায়িত্বশীল সরকার চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। বাংলাদেশেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। তবে দ্রুত অপরাধী খুঁজে বের করার চেষ্টা এবং জনগণের পকেটের ওপর হামলা বন্ধের উদ্যোগ অনেক সময় ভুল সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করতে পারে।
কাজী ফার্মসের নিলামের ঘটনাটি আমার কাছে ঠিক তাই বলে মনে হয়েছে।
নিলাম শুধুমাত্র খামারের পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের আদর্শ পদ্ধতি। নিউজিল্যান্ড গ্লোবাল ডেয়ারি ট্রেড প্ল্যাটফর্মের দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রির নিলামে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতা-বিক্রেতা অংশ নিচ্ছেন। কারণ প্রতিষ্ঠানটির নিলাম পদ্ধতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এমনকি দুর্নীতি রোধে এখন অনেক উন্নত দেশ সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে প্রতিযোগিতামূলক নিলামকে আইনি ভিত্তি দিচ্ছে।
কাজী ফার্মসের ন্যুনতম মূল্য প্রকাশের পদ্ধতি (তারা এটাকে “প্রস্তাবিত মূল্য বা অফার প্রাইস” বলে), দরদাতা আমন্ত্রণ এবং তারপর একটি মূল্য নির্ধারণ, যা প্রত্যেক সফল দরদাতা পরিশোধ করেন, এবং এসব কিছুর রেকর্ড রাখা- সবই আধুনিক মানদণ্ডের। এটি একটি স্বচ্ছ পদ্ধতি, যা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্যই সুবিধা ও লাভজনক।
অন্য যেকোনো কিছুর মতোই, অন্যায্য লাভের জন্য নিলামের অপব্যবহার করা সম্ভব। বিক্রেতারা অবৈধ উপায়ে নিলামে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াতে পারেন।
কাজী ফার্মসের নিলাম পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ এবং এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য প্রতিষ্ঠানটি আমার সঙ্গে চুক্তি করে। এরপর আমি কাজী ফার্মসের নিলাম পদ্ধতি ও রীতিনীতি পর্যবেক্ষণ করে এতে অনিয়মের সুযোগ আছে কি-না তা খতিয়ে দেখি। এছাড়াও কাজী ফার্মসের আশুলিয়া পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্রের ২০২২ সালের জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসের নিলাম রেকর্ড সুচারুভাবে পর্যবেক্ষণ করি।
চুক্তি অনুযায়ী আমার সুযোগ ছিল, পরীক্ষায় কাজী ফার্মসের কোনো ধরনের অন্যায় ধরা পড়লে, কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই আমি চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারব।
নিলামের মজার ব্যাপার হলো- অনেক সন্দেহজনক কার্যকলাপ দরদাম, মূল্য এবং রেকর্ডসে তাদের চিহ্ন রেখে যায়। নিলামের নিয়মগুলো দেখলে বোঝা যায়, নিয়মের কোনো বিষয় ও নিলাম পরিচালনা পদ্ধতি বিক্রেতাকে প্রতারণা করার সুযোগ দেয় কি-না।
উদাহরণস্বরূপ, কাজী ফার্মসের পক্ষে এমন “শিল বিডার” (যার উদ্দেশ্য ডিম কেনার চেয়ে দাম বৃদ্ধি করা) নিযুক্ত করা সম্ভব নয়, যিনি নিজে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি দর দেবেন এবং অন্যদের বেশি দর দিতে প্ররোচিত করবেন।
কারণ কাজী ফার্মসের নিলামে অংশগ্রহণকারী দরদাতারা একজন আরেকজনের প্রস্তাবিত মূল্য সম্পর্কে কিছু জানতে পারেন না।
দাম কম হলে কাজী ফার্মস বিপুল পরিমাণ ডিম অবিক্রিত রেখে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু সেটা করার সুযোগ নেই। কারণ পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে ডিম সংরক্ষণের মত রেফ্রিজারেটর নেই। তাই কাজী ফার্মস সবসময়ই প্রতিদিনের ডিম সেদিনই বিক্রির চেষ্টা করে।
নিলামে বেশি দাম নির্ধারণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো একজন দরদাতার সঙ্গে যোগসাজশ করতে পারে। মূলত, তাদের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের আগস্ট মাসের ৯ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত নিলামে দাম বাড়ানোর জন্য ফয়সাল এন্টারপ্রাইজের সাথে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।
উল্লিখিত পাঁচ দিনের নিলাম রেকর্ডসে দেখা গেছে, ফয়সাল এন্টারপ্রাইজ অন্য দরদাতার তুলনায় বেশি দাম প্রস্তাব করেছে। কিন্তু এর আগে ও পরে অসংখ্যবার নিলামে প্রতিষ্ঠানটির বেশি মূল্য প্রস্তাব করার রেকর্ড রয়েছে। ফলে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যাতে বলা যায় ওই পাঁচ দিন নিলামে কোন কারসাজি হয়েছে।
াজী ফার্মসের নিলামের যে ধরন তাতে, যোগসাজশের মাধ্যমে লাভ করা খুবই কঠিন। কারণ কাজী ফার্মস ন্যুনতম মূল্য প্রস্তাবের পর, নিলামে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মতো করে তারা সর্বোচ্চ কত দাম ও কতগুলো ডিম নেবেন তা জানান। তাদের এই প্রস্তাবনার ভিত্তিতে একটি বিক্রয়-মূল্য নির্ধারণ করা হয় যাতে সমস্ত ডিম বিক্রি হয়ে যায়। সফল ক্রেতাদের দেওয়া সর্বনিম্ন প্রস্তাব-মূল্যই এই বাজার-মূল্য হিসাবে স্থির হয়ে থাকে। ফলে, যদি নিলামে তিনজন ক্রেতা ১২ টাকা, ১১ টাকা এবং ১০ টাকা দর করে সফল হন, তাহলে ১০ টাকা বিক্রয়-মূল্য হিসাবে নির্ধারিত হয়। যে দরদাতারা ১০ টাকার বেশি দর দিয়েছেন তারাও ওই ১০ টাকা দামে নিলামের ডিম পান।
নিলামের রেকর্ড থেকে দেখা যায়, ৯ থেকে ১৩ আগস্ট ফয়সাল এন্টারপ্রাইজ যে নিলামগুলোতে ডিম কেনায় সফলতা পেয়েছে, তাদের প্রস্তাব সেই নিলামগুলোতে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে কোনো ভূমিকাই রাখেনি। ফয়সাল এন্টারপ্রাইজ যদি সেই নিলামগুলোতে ডিমের-প্রতি এক লাখ টাকা করেও দর দিত তাহলেও সেই নিলামগুলোর বিক্রয়মূল্য এক পয়সাও বেশি হতো না, অথবা তারা একটি বেশি ডিমও পেতেন না।
কারণ কাজী ফার্মসের নিলাম পদ্ধতিতে এইভাবে কোনো দরদাতার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই এবং দরদাতা নিলামের দামে প্রভাব ফেললে তা রেকর্ড থেকে লুকানোরও উপায় নেই। এই ব্যাপারটি বিশেষজ্ঞ না হয়েও বোঝা সম্ভব।
বাংলাদেশে ডিমের দাম দ্রুত বৃদ্ধির সাথে কাজী ফার্মসের নাম এসেছে সম্ভবত একটি ধারণা থেকে। যা হলো, বাংলাদেশে ডিমের বাজারে প্রভাব ফেলার সক্ষমতা কাজী ফার্মসের আছে। বাজারে একটি প্রতিষ্ঠান কতটুকু প্রভাব বিস্তার করছে, তা নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো হারফিন্ডাহল-হার্শম্যান ইনডেক্স বা এইচএইচআই সূচক ব্যবহার করে থাকে।
এই সূচকে কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নম্বর ১০ হাজার হলে ধরে নেওয়া হয়, বাজারে তার একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে। এইচএইচআই নম্বর পনেরোশোর কম হলে তাকে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস প্রতিযোগিতামূলক বাজার মনে করে। এক্ষেত্রে বাজারে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা থাকে খুবই নগণ্য। বাংলাদেশের ডিম বাজারের এইচএইচআই নম্বর মাত্র ৩০। যাকে বলা যায় নিখুঁত প্রতিযোগিতামূলক বাজার।
নিলাম কীভাবে কাজ করছে তা বিস্তারিত জানতে ও বুঝতে অভিজ্ঞতা লাগে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকরাও রেডিও স্পেকট্রাম লাইসেন্সের নিলাম করতে ভয় পেতো। কিন্তু অবশেষে সেই নিলামই দেশটির টেলিকম শিল্পে বড় পরিবর্তন এনেছে।
এটা খুবই প্রশংসনীয় যে, কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রির পদ্ধতি হিসেবে নিলামকে ব্যবহার করছে। কিন্তু এই সব প্রতিষ্ঠানকে ভুলভাবে দোষারোপ করলে অন্য ব্যবসায়ীরা ব্যবসার এই আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণে নিরুৎসাহিত হবেন। ব্যবসায় নিলাম পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতি লাভবান হবে।
ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী, সহযোগী অধ্যাপক, সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



