Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রুপি-টাকা লেনদেন ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মুদ্রাদোষ

দু'দেশের ওতপ্রোত এবং নিবিড় সম্পর্ককে এক নতুন দিশা দেবে এই রুপি-টাকা বাণিজ্যের পদক্ষেপ। আঞ্চলিকভাবে টাকার মান এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৩, ০৩:২২ পিএম

মার্কিন ডলার সংকট যখন বিশ্বের একের পর আরেক অর্থনীতিতে হুল ফোটাচ্ছে, ডিডলারাইজেশন বা ডলারের আধিপত্য সংকোচন, আর্থিক সংকটে থাকা অনেক দেশের কাছেই তাদের অর্থনীতির  প্রবাহ ফেরাতে একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ডলার সংকট প্রদাহে ভুক্তভোগী বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী ভারত তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা রুপি ও টাকায় নিষ্পত্তি করার চুক্তি করলো গত ১১ জুলাই। 

অতীতে দক্ষিণ এশিয়ার সংগঠন সার্কের নিজস্ব মুদ্রা নিয়ে আলাপ শুরু হলেও তা আর এগোয়নি। সম্প্রতি ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সংগঠন ব্রিকস তাদের  মুদ্রা ব্যবস্থা প্রণয়নের কথা উত্থাপন করে। সেটিও এখন পর্যন্ত কার্যকরী হয়নি। ডলার সংকটের এই দুঃসময়ে টাকা ও রুপিতে ভারত বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মূল্য পরিশোধের প্রচেষ্টা  এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

ডলারের সঞ্চয় কমে আসায় জ্বালানির দাম মেটাতে বেশ হিমশিম খেতে হয় বাংলাদেশকে। জ্বালানির অভাবে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরাবরাহ বন্ধ করায় এক অনিশ্চিত এবং অন্ধকারে দীর্ঘ নিশিযাপন, ঢাকাসহ বাংলাদেশের নানা জনপদের প্রত্যহের অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। এই ডলার সংকট এক বিভিষীকা রূপ নিয়েছিল প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কায় এবং ভয়াবহ পরিস্থিতি এনেছে পাকিস্তানে।

মূলত ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পর থেকেই ডলার তলানিতে এসে ঠেকেছে অনেক দেশেরই। এই রুপি এবং টাকায় বাণিজ্য চালু হওয়ায় বাংলাদেশ নানা দিক দিয়ে লাভবান হবে। রুপিতে পণ্য ভারত থেকে আমদানি করলে টাকা থেকে ডলার এবং পরবর্তীতে ডলার থেকে রুপিতে তা বিনিময় করতে হবে না । যার জন্য দুই দেশের ডলারের দামের তারতম্যের জন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ হবে না। এই রুপি-টাকা বাণিজ্য ফলপ্রসূ হলে সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় ৬% পর্যন্ত হতে পারে বলে আশা করা যায়। এতে আমদানি এবং রপ্তানি দুই ক্ষেত্রেই ডলারের খরচ কমবে।

ডলার সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা আমদানির জন্য এলসি বা ঋণপত্র খুলতে গিয়ে নানাবিধ সমস্যার মুখে পড়েছেন। এই নতুন প্রচেষ্টার অগ্রগতি হলে চুক্তি অনুযায়ী, ব্যবসার জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা খুব সুবিধাজনক হয়ে উঠবে। ডলারের প্রয়োজন না থাকায়, প্রক্রিয়াটি আরও সহজ এবং দ্রুত সময়ে সম্পন্ন হবে। দুটি দেশের একটি সরকারি এবং একটি করে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে এই বাণিজ্য চলবে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে। 

প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রতত্ত্ব সোনালী ব্যাংক এবং বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড এবং ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং আইসিআইসিআই-এ খোলা “নস্ত্র খাতার” মাধ্যমে এই লেনদেন চলবে।

কোভিডের সময় এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে বেশ ধাক্কা খেয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। ফরেক্স রিজার্ভ কমে গেলে বাংলাদেশ তার ডলার সংকট মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তবুও সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য প্রায় ২৫% হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত পাশ্চাত্যে। তাই রপ্তানি থেকে আয়ের বেশিরভাগই আসে ডলার অথবা ইউরোতে। সাধারণত বছরে বাংলাদেশ ভারতে  প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। তাই দুই দেশ এই মুদ্রা চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ভারতীয় মুদ্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য রুপিতে আমদানি করতে পারবে। এই ২ বিলিয়নের  অতিরিক্ত বাণিজ্যের পণ্যসামগ্রীর নিষ্পত্তি হবে ডলারে ।

গত আর্থিক বছরে  ভারত থেকে প্রায় ১৩.৬৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। ভারতে রপ্তানি করে ২ বিলিয়ন ডলারের মতো। নিজস্ব মুদ্রায় ব্যবসা ও বিনিময়ের ফলে দুই দেশেই ডলারের আধিপত্য, বলা ভালো ঔদ্ধত্য বেশ খানিকটা কমবে। বাড়বে টাকার মান ও গুরুত্ব। তবে বাংলাদেশের হাতে অতিরিক্ত রুপি বা ভারতের হাতে অতিরিক্ত টাকা জমে গেলে, তা উদ্বেগের হয়ে উঠবে। কারণ দুটি মুদ্রার কোনোটিই গ্লোবাল কারেন্সি নয়। ডলার বা ইউরো খুব সহজেই বিক্রয় বা বিনিময় করা গেলেও টাকার ক্ষেত্রে এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তাই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি মিটিয়ে, দিল্লি ও ঢাকার অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ দু দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের দিকে। 

দু'দেশের ওতপ্রোত এবং নিবিড় সম্পর্ককে এক নতুন দিশা দেবে এই রুপি-টাকা বাণিজ্যের পদক্ষেপ। আঞ্চলিকভাবে টাকার মান এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।


অয়নাংশ মৈত্র, ভারতীয় সাংবাদিক ও পররাষ্ট্রনীতি গবেষক।


প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো দায় নেবে না

   

About

Popular Links

x