যেকোনো সভ্য দেশের আইনি কাঠামোর মূল দর্শন অনুসৃত হয় সেই দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে। এই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রকৃত অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার তাগিদ। তবে আমাদের দেশের বাস্তবতায় সাধারণ মানুষকে বিচার পেতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানাবিধ ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় আইনের ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যায় বড় বড় অপরাধী, কিংবা থমকে থাকে তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা বারবার অপরাধ করার দুঃসাহস দেখায়। এমনকি খুন বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে বছরের পর বছর, এমনকি দশক পার হয়ে যায়।
২০২৬ সালে আধুনিক বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে যখন পুলিশ বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করে, তখন তারা যে ক্ষমতার বলে তা করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা সেটি প্রণীত হয়েছিল ১৮৯৮ সালে। যে আদালত সেই নাগরিকের বিচার করে, তার প্রতিটি ধাপ ঠিক করে দেয় এই একই কোড। আর যে অপরাধের অভিযোগ তোলা হবে, তার সংজ্ঞা দেয় ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি যার খসড়া লিখেছিলেন টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে, একজন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক। তিনি এ অঞ্চলের মানুষকে দেখতেন শাসিত প্রজা হিসেবে, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে নয়। এই দর্শনের একটি আইনি কাঠামো কীভাবে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের আইনি কাঠামো হতে পারে? কিভাবে ১৮৬০ সালের সামাজিক আবহে তৈরি আইন কাঠামো ২০২৬ সালের বাংলাদেশের অপরাধ দমনে কাজ করবে? কবে এই কাঠামোর বি-উপনিবেশায়ন হবে, কবে আমরা পাব সর্বজনগ্রাহ্য দেশজ বা 'indigenous' বিচার ব্যবস্থা?
বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে, তার মূল স্তম্ভগুলো প্রায় সবই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। আমাদের ফৌজদারি অপরাধের সংজ্ঞা দেয় দণ্ডবিধি, ১৮৬০। মামলার তদন্ত, গ্রেপ্তার, জামিন, বিচার ও আপিল পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮। সাক্ষ্য কী গ্রহণযোগ্য আর কী নয়, তা ঠিক করে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২। দেওয়ানি বিরোধ মীমাংসিত হয় দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ অনুযায়ী। আর পুলিশ বাহিনীর গঠন ও চরিত্র নির্ধারণ করে পুলিশ আইন, ১৮৬১। একজন নাগরিক আদালতে গেলে প্রতিদিন এই পাঁচটি আইনেরই মুখোমুখি হন অথচ এর একটিও স্বাধীন বাংলাদেশের তৈরি নয়।
রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানও একই কথা বলে। ২০১৯ সালে সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে প্রণীত প্রায় ৩৭৮টি আইন তখনও বাংলাদেশে বহাল ছিল; এর মধ্যে বহাল থাকা প্রাচীনতম আইনটি ১৭৯৯ সালের। আইন মন্ত্রণালয়ের সরকারি সংকলন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের কার্যকর আইনি কাঠামোর একটি বড় অংশ সরাসরি ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার।
প্রচলিত আইনের উৎস: একটি আনুমানিক চিত্র
সময়কাল | আনুমানিক হার | প্রধান আইনসমূহ |
ব্রিটিশ আমল (১৮৩৬–১৯৪৭) | ৪০%–৪৫% | দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন, দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি, চুক্তি আইন |
পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭১) | ১৫%–২০% | আর্মি অ্যাক্ট, বার কাউন্সিল অর্ডার, কাস্টমস অ্যাক্ট, বিভিন্ন জরুরি অধ্যাদেশ |
বাংলাদেশ আমল (১৯৭১–বর্তমান) | ৪০%–৪৫% | সংবিধান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পরিবেশ আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন |
সূত্র: আইন মন্ত্রণালয়ের “Laws of Bangladesh” সংকলনের ভিত্তিতে আনুমানিক হিসাব।
গত ৫৫ বছরে সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ আমলের আইনের সংখ্যা, পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরের থেকে অবশ্যই বেড়েছে। কিন্তু বিচারব্যবস্থার যে কাঠামোগত মেরুদণ্ড দণ্ডবিধি, কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন তা প্রায় শতভাগ ঔপনিবেশিক রয়ে গেছে। নতুন যে আইনগুলো হয়েছে, তা এই পুরোনো মেরুদণ্ডের ওপর সংযোজন মাত্র। লক্ষণীয়, প্রতিবেশী ভারত ২০২৩ সালে তাদের ঔপনিবেশিক দণ্ডবিধি ও কার্যবিধি বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সে পথে এক পা ও এগোয়নি।
প্রশ্নটা শুধু আইনের বয়স নিয়ে নয়। পুরোনো হলেই কোনো আইন খারাপ হয়ে যায় না। আসল সমস্যা এর অন্তর্নিহিত দর্শনে।ঔপনিবেশিক ফৌজদারি আইন তৈরি হয়েছিল একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে উপনিবেশের জনগণকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণে রাখা; এটাই ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসকের রাজনৈতিক আদর্শ। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ পুলিশ আইন, ১৮৬১। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঠিক পরে প্রণীত এই আইনের পরিকল্পিত লক্ষ্যই ছিল এমন একটি পুলিশ বাহিনী গড়া, যা শাসকের প্রতি অনুগত থাকবে জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে না। দেড়শ বছর পরও সেই আইনই বাংলাদেশের পুলিশের চরিত্র নির্ধারণ করছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারার বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ক্ষমতা, কিংবা ১৪৪ ধারার জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার এগুলো বছরের পর বছর ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পেছনে এই ঔপনিবেশিক জন্মসূত্রই দায়ী।
দ্বিতীয় সমস্যা এই আইন একুশ শতকের অপরাধ চেনে না। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন এমন এক যুগে লেখা, যখন ডিজিটাল তথ্য, ইলেকট্রনিক লেনদেন বা সাইবার অপরাধের অস্তিত্বই ছিল না। সুসংগঠিত আর্থিক জালিয়াতি, পরিবেশ অপরাধ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা আধুনিক অপরাধের এই বিশাল পরিসর মোকাবিলায় উনিশ শতকের কাঠামো বারবার অসহায় প্রমাণিত হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার সিকিউরিটি আইনের মতো নতুন নতুন আইন আলাদাভাবে যোগ করা হলেও মূল কাঠামোর সঙ্গে তা শুধু জোড়াতালিই দিয়েছে, স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে নাই।
তৃতীয় সমস্যা বিলম্ব। ঔপনিবেশিক কার্যবিধির নকশায় দ্রুত বিচার কখনো অগ্রাধিকার পায়নি; শাসিত জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত ন্যায়বিচার, কখনই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিবেচ্য বিষয়ই ছিল না। এই দর্শনের ফল আজ আমাদের সামনে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন বর্তমান মামলার সংখ্যা চল্লিশ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। “বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকৃত হওয়া” এই প্রবচন বাংলাদেশে আজ এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
এমনকি সর্বোচ্চ শাস্তির ধারণাতেও ঔপনিবেশিক ছাপ স্পষ্ট। দণ্ডবিধিতে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের ব্যাপ্তি এবং তা কার্যকরের পদ্ধতি সবই সেই পুরোনো দণ্ডকেন্দ্রিক, ভীতিনির্ভর শাসনদর্শনের উত্তরাধিকার। আধুনিক বিচারচিন্তা যেখানে সংশোধন, প্রতিকার ও প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইন প্রণয়ন করে, সেখানে আমাদের কোড এখনো মূলত শাস্তিদানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।
আর ভাষা? এই আইনগুলোর মূল পাঠ উনিশ শতকের জটিল আইনি ইংরেজিতে রচিত যা দেশের অধিকাংশ নাগরিকের কাছে দুর্বোধ্য। খোলামেলাভাবে বললে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজি ভাষা, খোদ যুক্তরাজ্য থেকে চলে গেলেও আমাদের এখানে আইনের ভাষা হিসেবে সেই ইংরেজি আজও রয়ে গেছে। যে আইন সাধারণ মানুষ পড়তেও পারে না বা বুঝতেও পারে না, সেই আইনকে মানুষ কীভাবে নিজের বলে অনুভব করবে?
৫৫ বছর ধরে আমরা যাদেরকে নির্বাচিত বা 'অনির্বাচিত' করে সংসদে পাঠিয়েছি, তাদের নতুন আইন প্রণয়ন করে ব্রিটিশযুগীয় আইন থেকে মুক্ত করার যে কাজগুলো করা উচিত ছিল, তা তারা না করে অন্য অনেক কাজ করেছেন। অথচ সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ হওয়ার কথা ছিল আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করা।
আমরা যদি সত্যিই একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনের ওপর চলা সভ্য সমাজ গড়তে চাই, তাহলে যে বিষয়টিকে অতিসত্বর বর্তমান সংসদকে করতে হবে, তা হচ্ছে আইনি কাঠামোর বি-উপনিবেশায়ন (decolonization)। তবে শব্দটি যেন ভুল ব্যাখ্যা করা না হয়। বি-উপনিবেশায়ন মানে নিছক আইনের নাম বাংলায় অনুবাদ করা নয়, কিংবা ম্যাকলের নাম মুছে ফেলা নয়। এর অর্থ একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য নতুন করে আইন রচনা করা; যে আইন বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা থেকে উঠে আসবে, ঔপনিবেশিক প্রভুর আদর্শ থেকে নয়।
বি-উপনিবেশায়ন আইন কাঠামোর কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন আনবে। প্রথমত, একটি নতুন, দেশজ পুনঃসংকলন দণ্ডবিধি ও কার্যবিধি নতুন করে লেখা হবে, যা স্বাধীন নাগরিকের অধিকারকে কেন্দ্রে রাখবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ আইনকে শাসক-রক্ষার মডেল থেকে সরিয়ে নাগরিক-সেবার মডেলে রূপান্তর করবে। তৃতীয়ত, সাইবার, আর্থিক ও পরিবেশগত অপরাধ মোকাবিলায় দেশজ ও সুসংহত কাঠামো গড়া উঠবে বিচ্ছিন্ন তালি দিয়ে এই অত্যাধুনিক অপরাধগুলিকে আর বিচার করতে হবে না। চতুর্থত, সহজ বাংলায় আইনের খসড়া, যেন নাগরিক তার নিজের অধিকার ও দায় বুঝতে পারেন, সেই আইনি ভাষা তৈরি হবে। জনগণ আইনের মর্মার্থ বুঝতে পারবে, তাদের অপরাধস্পৃহা কমবে।
ভারতের ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, কাজটি অসম্ভব নয়। তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটি সতর্কবার্তাও নেওয়া জরুরি। ভারতের প্রক্রিয়াটি তাড়াহুড়ো ও পর্যাপ্ত আলোচনার অভাবে সমালোচিত হয়েছে। বাংলাদেশকে দ্রুততা নয়, বরং ব্যাপক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, বিচারক-আইনজীবী-নাগরিকের অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার ভেতর দিয়ে কাজটি করতে হবে। বি-উপনিবেশায়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার প্রক্রিয়াটি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
১৯৭১ সালে আমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। কিন্তু যে রাষ্ট্রের আইন, পুলিশ ও আদালত এখনো ঔপনিবেশিক যুক্তিতে চলে, সে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিচারব্যবস্থার বি-উপনিবেশায়ন তাই কোনো প্রতীকী চাওয়া নয় এটি স্বাধীনতার অসমাপ্ত কাজ। ১৮৬০ সালের প্রজাদের শাসন করতে লেখা আইন দিয়ে ২০২৬ সালের নাগরিকের অপরাধ নিবারণ কিংবা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাবে না। আদালতকক্ষের স্বাধীনতাই জাতীয় স্বাধীনতার শেষ ধাপ। প্রশ্ন একটাই: সেই ধাপটি আর কত দিন অপেক্ষা করবে?
....................................................................................
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি



