প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার ভূখণ্ড প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। যা আকৃষ্ট করেছে ইউরোপীয় নাবিক, আরবের বণিক সহ নানা বিদেশি পর্যটক ও শাসকদের। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলা ভ্রমণে এসে বাংলার নামকরণ করেছিলেন “দোজখ-ই-পুর-নিয়ামত”, অর্থাৎ ধনসম্পদপূর্ণ দোজখ। বাংলার ধনসম্পদের প্রাচুর্য বরাবরই যেমন বিদেশি শাসকদের আকৃষ্ট করেছে, তেমনি দীর্ঘদিন বিদেশি শাসকদের দ্বারা শোষিতও হয়েছে। ইংরেজদের প্রায় দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন আর পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের অর্থনৈতিক, ও রাজনৈতিক শোষণে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ভঙ্গুর অর্থনীতি দিয়েই।
সদ্যস্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক সংকট থাকাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু ৫৩ বছর পরে এসেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এবং নির্দিষ্ট কিছু শিল্পের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা বাংলাদেশকে যেমন দূর্বল অর্থনীতির দেশে পরিণত করেছে, তেমনি ফেলে দিয়েছে উভয়-সংকটে। প্রথমত, বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের এখনও আধুনিকায়ন বা স্বয়ংক্রিয়করণ করা হয়নি। অধিকাংশ শ্রমিকেরাই হাতে বোনা পোষাক তৈরি করেন, যার ফলে বিশ্ব বাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। পোশাক শিল্পের স্বয়ংক্রিয়করণ (অটোমেশন) হয়েছে ভিয়েতনামে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, এমনকি পাকিস্তানেও। যার ফলে, আগামীতে পোশাকশিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা যথেষ্টই কঠিন হয়ে পড়বে, তা বলাই যায়।
অটোমেশনে গেলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, একইসঙ্গে সময়ও সাশ্রয়ী হবে। কিন্তু, পোশাকশিল্পের স্বয়ংক্রিয়করণে যাওয়ার মত দক্ষ জনশক্তি বা যথেষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান নেই বাংলাদেশের। যার ফলে, স্বয়ংক্রিয়করণ পদ্ধতিতে যাওয়া গার্মেন্টস মালিকদের জন্যে যেমন ঝুকিপূর্ণ, তেমনি প্রায় ত্রিশ লাখেরও অধিক শ্রমিক জনগোষ্ঠী স্বয়ংক্রিয়করণে রাতারাতি কাজ হারাবে। তাই ধরে নেওয়া যায়, গার্মেন্টস শিল্পের ওপর ভিত্তি করে বেশিদিন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব না।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিগত ৫৩ বছরেও কোনো টেকসই ব্যবসাশিল্প গড়ে তুলতে পারেনি। এর একটি বড় দায় যেমন বাংলাদেশের টেকসই ব্যবসা কেন্দ্রিক পরিকল্পনার ঘাটতি; তেমনি সরকারের উদ্যোগ, ব্যবসা-শিল্পে বৈচিত্র্যায়ণে অবহেলা, ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসার পরিবর্তে সল্পমেয়াদী ব্যবসার দিকে ঝুঁকে যাওয়া। এরই মাঝে ৫ আগস্টের পর নয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ব্যাপক অস্থিরতা কাজ করছে। তাই আগামীর ভবিষ্যতকে সামনে রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈচিত্র আনা খুবই প্রয়োজন। বৈচিত্রায়ণের পাশাপাশি টেকসই, দীর্ঘমেয়াদী ও পরিবেশবান্ধব ব্যবসার প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রথমেই নজর দেওয়া উচিত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ ও শত-শত নদ-নদীর মিলনস্থল হলেও, বাংলাদেশের নদী শাসন, দূর্বল পানি ব্যবস্থাপনা, ও মৎস শিল্পের প্রতি অবহেলা বাংলাদেশকে এ শিল্পে বেশিদূর এগোতে দেয়নি। তবে অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা, নদী শাসনে দূর্বল হওয়া সত্ত্বেও সমুদ্র নির্ভর অর্থনীতি হতে পারে বাংলাদেশের জন্য টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও বৃহৎ শিল্প।
সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি বলতে শুধুমাত্র সমুদ্রে মৎস আহরণ বা খনিজ সম্পদ আহরণ বোঝায় না, বরং এর সঙ্গে অসংখ্য ব্যবসাখাত জড়িত। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের প্রায় ৭০%ই আসে সমুদ্র থেকে। একটি গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতিতে মোট ২৬ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসাখাত অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মৎস্য শিল্প, পর্যটন শিল্প, নৌ-পরিবহন ও বৈদেশিক বাণিজ্য, নৌ প্রকৌশলবিদ্যা ও জনশক্তি, খনিজ সম্পদ আহরণ, লবণ শিল্প, ও সামুদ্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্প। বাংলাদেশের ১২০ কিলোমিটার ব্যাপী পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি মোট ৭১০ কিলোমিটার ব্যাপী সমুদ্র উপকূল রয়েছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্থায়ী সালিশি আদালতের মাধ্যমে ভারত ও মায়ানমারের কাছ থেকে সর্বমোট ১,১৮,৮১৩ কিলোমিটার সমুদ্রসীমাও অর্জন করে যা প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমান। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৭০ কিলোমিটার ব্যাপী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের মালিকানাও পেয়েছে বাংলাদেশ।
তবুও বাংলাদেশের সমুদ্র কেন্দ্রিক দক্ষ জনশক্তির অভাব ও শিক্ষাব্যবস্থা না থাকায় এই বিশাল সমুদ্রের মাত্র ১০-১২%ও অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, টেকসই পরিকল্পনা না থাকায় জাহাজ ভাঙা ব্যবসা চট্টগ্রাম অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জাহাজ ভাঙা শিল্পে শীর্ষে থাকা বাংলাদেশের বার্ষিক আয় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু, জাহাজ ভাঙার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য যেমন হুমকির মুখে পড়েছে, তেমনি শ্রমিকদেরও স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। অন্যদিকে, সেন্ট-মার্টিন দ্বীপে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবসা, দ্বীপে যত্রতত্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার তৈরি করায় দ্বীপের অস্তিত্বই হুমকির মুখে, ইতোমধ্যেই দ্বীপটির অধিকাংশ কোরাল ধ্বংসের মুখে। তাই অর্থনীতি কেবল সমুদ্র নির্ভর হলেই চলবে না, সেইসঙ্গে হওয়া চাই টেকসই, দীর্ঘমেয়াদী, ও পরিবেশবান্ধব।
টেকসই ব্যবসা হিসেবে মৎস হচ্ছে সবচেয়ে লাভজনক। কারণ মৎস আহরণের কোনো লিমিট বা সীমাবদ্ধতা নেই। এটি এক অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া ও ৬ প্রজাতির লবস্টার রয়েছে। যদিও, বাংলাদেশের জাহাজ ও নৌযান বঙ্গোপসাগরের মাত্র ৬০-৭০ মাইল গভীর পর্যন্ত মৎস আহরণ করে, যা বঙ্গোপসাগরের মাত্র ১০-১২% অঞ্চল। এই ১০-১২% অঞ্চলেই প্রায় ২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে মৎস শিল্পের আয়ের পরিমাণ ৪৫০ মিলিয়ন। বাংলাদেশের জাহাজ শিল্পের উন্নয়ন, দক্ষ নাবিক ও জনশক্তিই পারে এই বিপুল সম্ভাবনাময় শিল্পে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে। অন্যদিকে, দেশে উন্নত মানের জাহাজের ঘাটতি থাকায় এখনও সমুদ্রসীমার প্রায় ৮০%ই অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা মাত্র ৯৫টি। একদিকে জাহাজের অপ্রতুলতা, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তি, নৌ প্রকৌশলী, ও নাবিকের অভাব এখনও সমুদ্র অর্থনীতিকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারেনি।
এমনকি দেশের একমাত্র মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৩ সালে। যার ফলে বাংলাদেশ বৈদেশিক নৌ বাণিজ্যে দক্ষ জনশক্তির রপ্তানি, নৌ-পরিবহনে, কিংবা নৌ-প্রকৌশলবিদ্যায় যথেষ্ট ও দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়ে গেছে। অন্যদিকে, দেশের পর্যটন খাত বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে। বিগত ২০২৩ সালে পর্যটন শিল্প জিডিপির ৩%, অর্থাৎ প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। কিন্তু এই পর্যটন খাত অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের তুলনায় নিতান্তই ছোট। পর্যটন খাতের ৭০% আসে সমুদ্রকে ঘিরে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার কিংবা সেন্টমার্টিন ঘুরতে দেশীয় পর্যটকের পাশাপাশি ভিড় করেন বিদেশিরাও। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত হোটেল ব্যবসা, পর্যটন খাতে অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তাহীনতা, ও টেকসই পর্যটন পরিকল্পনার অভাবে দেশের পর্যটন খাত প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে মুখ থুবড়ে পড়ছে। একইসঙ্গে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
বাংলাদেশে বার্ষিক গড়ে মাত্র ৬ লাখ বিদেশি পর্যটক আসেন, যেখানে ভারতে এই সংখ্যাটা ১৩ মিলিয়ন, শ্রীলঙ্কায় ২.৩ মিলিয়ন, ও মালদ্বীপে ১.৭ মিলিয়ন। দেশের পর্যটন শিল্পে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে পর্যটন খাতে উন্নতি করতে পারবে।
সবশেষে, সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ৮টি গ্যাস ব্লক ও মায়ানমারের কাছ থেকে ১৩টি গ্যাস ব্লক পেয়েছে। বাংলাদেশের শিল্পকারখানার ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ, টেকনোলজি ও সরঞ্জামাদির অভাবে অধিকাংশ গ্যাস ব্লক থেকে এখনও গ্যাস উত্তোলন শুরুই হয়নি। জাহাজের অপ্রতুলতা ও সরঞ্জামাদির অভাবে অন্যান্য খনিজ সম্পদ আহরণ করাও সম্ভব হয়নি।
বঙ্গোপসাগর নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিকল্প অর্থনীতির সবচেয়ে সহজ, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব খাত। কিন্তু, তা প্রণয়ন করতে দেশের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই অর্থনীতির বৈচিত্রায়ণ করার মানসিকতা, টেকসই পরিকল্পনা, ও দূরদর্শীতার প্রমাণ দিতে হবে।



