Saturday, September 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পুরুষরা যেখান ব্যর্থ, সেখানে পরিসংখ্যান নারীদের পক্ষেই কথা বলে

তবে আমরা কেন এখনও নারীদের তাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে যাচ্ছি?

আপডেট : ১০ মে ২০২৫, ০৮:৪২ পিএম

এই দৃশ্যপটটা অনেকটাই পরিচিত— যেমনটা আমরা দেখেছিলাম জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ ঘোষণার পর। ঠিক একই ধরনের ঘটনা আবার দেখেছি গত মাসে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর।

উভয়ক্ষেত্রেই প্রতিবাদ এসেছে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছ থেকে, যারা মনে করে সমান উত্তরাধিকারে যেকোনো প্রস্তাব ইসলামি শিক্ষা ও রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশের বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের  ব্যবহৃত কটূ ও অবমাননাকর ভাষায় প্রতিবাদের বিবরণে আমি যাচ্ছি না। নারীদের নিয়ে যেসব অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো উল্লেখ করাও আমার জন্য অস্বস্তিকর।

তবে তাদের এটা মনে রাখা উচিত যে, সমাজের সম্মানিত নারীদের “বেশ্যা” বলে গালি দেওয়া ইসলাম ধর্মের শিক্ষা ও নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ধর্মীয় বক্তৃতার মাধ্যমে যারা ইসলামি শিক্ষার ব্যাখ্যা করেন, সেইসব ব্যক্তিরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে কী বলেন তা জানার জন্য আমি অনলাইনে থাকা বিভিন্ন  ভিডিও দেখেছি। এদের সবার বক্তব্যে একটিই “শক্ত যুক্তি" দেখা যায়; যে যুক্তি দিয়ে তারা পুরুষের তুলনায় নারীদের কম সম্পত্তি পাওয়াকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে চান।

তাদের সেই যুক্তিটা সংক্ষেপে এরকম; “পুরুষরাই পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব বহন করে। বিয়ের আগে একজন নারীর সব খরচ তার বাবা ও ভাইয়েরা চালায়; বিয়ের পরে স্বামী ও সন্তানরা তার ভরণপোষণ থেকে শুরু করে সমস্ত আর্থিক বিষয় সামলায়। কাজেই, উত্তরাধিকার সম্পত্তি নারীদের কম পাওয়াই যৌক্তিক।”

কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।

২০১৩ সালে যখন নারীর অধিকারের বিষয় নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া চলছিল, পরিসংখ্যান বলছে তখন প্রায় ১১% বাংলাদেশি পরিবার পরিচালিত হতো নারীদের দ্বারা — অর্থাৎ প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে ১টিরও বেশি পরিবারে নারীরা প্রধান, এবং তারাই মূলত পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব কাঁধে রেখেছিলেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৮% পরিবার নারীপ্রধান।

যখন নারীরা পরিবার ও সমাজের ক্ষেত্রে সমান দায়িত্ব পালন করছেন, তখন ধর্মগ্রন্থের অপব্যাখার মাধ্যমে তাদের সম্পদের মালিকানা ও সমৃদ্ধির সুযোগ কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পরিসংখ্যান থেকে এটা স্পষ্ট যে, শুধুমাত্র পুরুষরাই পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব বহন করেন — এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইসলামের শুরুর দিককার অন্যতম বিশ্বাসী খাদিজা নিজেই ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। গবেষকরা বলেন, তিনি গরিবদের খাওয়াতেন, পোশাক দিতেন, আত্মীয়দের আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন, এমনকি স্বজনদের বিয়ের জন্যও সহায়তা করতেন।

আধুনিক বাংলাদেশেও বিপুল সংখ্যক নারী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত, প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা পুরুষদের পাশাপাশি কাজ করছেন।
 
যদিও গৃহস্থালি কাজ এবং আমাদের সেবাযত্নের জন্য নারীদের স্বীকৃতি দিতে আমাদের আপত্তি রয়েছে, তবুও প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ নারী জাতীয় কর্মশক্তিতে অবদান রাখছেন। পাশাপাশি তারা তাদের পরিবারের আয় এবং সম্পদ বৃদ্ধিতে পুরোপুরি বা আংশিক অবদান রেখে চলেছেন।

যদি আমরা নারীদের তাদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে থাকি, তবে তারা কেন সেই সম্পদ গঠন করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করবেন?

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৬% এরও বেশি আসে তৈরিপোশাক শিল্প থেকে, আর এই খাতটি অনেকটাই নারী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকের সঠিক নীতিগত দিকনির্দেশনার কারণে আমাদের দেশের নারীরা অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কৃষিখাতে উৎপাদন থেকে শুরু করে বিদেশী শ্রমবাজার থেকে রেমিট্যান্স উপার্জন, এমনকি কর্পোরেট নেতৃত্ব পর্যন্ত দিচ্ছেন আমাদের নারীরা।

উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনগুলো বহু পুরোনো ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, এক্ষেত্রে নারীদের ন্যূনতম অধিকারের কথা বলা হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে এসে যখন নারীরা পারিবারিক এবং সামাজিক উভয়ক্ষেত্রেই সমান দায়িত্ব পালন করছেন, তখন ধর্মের নামে তাদের সম্পদ এবং সমৃদ্ধির সম্ভাবনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা অগ্রহণযোগ্য।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, অনেক ধর্মেই উত্তরাধিকারী সম্পত্তির অসম বণ্টন রয়েছে, তবে কোনো ধর্মই কিন্তু সম্পদ সমানভাবে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করতে নিষেধ করেনি।

তাহলে, এটি কীভাবে দাবি করা যায় যে; উত্তরাধিকারী সম্পত্তি নারী-পুরুষের মাঝে সমান বন্টনের সুযোগ রাখাটা ধর্মীয় মূলনীবোধের বিপরীত? 

মুখে আমরা যতই বিরোধীতা করি না কেন, এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে; যেসব নারীর সম্পত্তি নেই তাদের গ্রহণযোগ্যতা সমাজে খাটো করেই দেখা হয়। এসব নারীদের আরও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়, যেগুলো কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত বা অসম বন্টনের ফলে নারীর তাদের সম্পদের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন না, বাধাগ্রস্ত হয় তাদের নতুন সম্পদ গড়ার প্রক্রিয়াও। তারা আটকে পড়েন দারিদ্র্যের এক দুষ্টচক্রে।

এটি শুধু ওই নারীদের জন্যই ক্ষতিকর নয় — এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ক্ষতি।

রিয়াজ আহমেদ, সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন
   

About

Popular Links

x