Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সংরক্ষিত আসন তুলে নারী প্রার্থী বাড়ানো অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে

বর্তমানে রাজনীতির অঙ্গনে নারীর সক্রিয়তা অনেক বেশি

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৪৩ পিএম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ৭০ নির্বাচন হয়েছিল যখন বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। এখন স্বাধীন বাংলাদেশ। সুতরাং জাতীয় নির্বাচন আবার হতে হবে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশ পরিচালনা করবে। সেই মোতাবেক বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগ ২৯৩ জাসদ এক, জাতীয় লীগ এক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পাঁচটি আসন লাভ করে। এ সময় বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ১৫ আসন সংরক্ষিত করা হয়। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল; নারীদের রাজনীতিতে উৎসাহ বৃদ্ধি করা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের কারণে সংসদে সংরক্ষিত আসনের ১৫ আওয়ামী লীগের পক্ষে আসে।

১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনের সময় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৩০ করা হয়। এ সময় জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে দুইজন নারী প্রার্থী সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন। ফলে সংসদে এই দুজন বিজয়ী সংসদ সদস্য নিয়ে জাতীয় সংসদে মহিলা সদস্যদের সংখ্যা হয় ৩২। ১৯৮৬ সালে দেশের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এরশাদের জাতীয় পার্টির চার জন, আওয়ামী লীগের একজন মহিলা সংসদ সদস্য জয়লাভ করেন। তবে রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে এই সংসদ পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে হুসেন মহাম্মাদ এরশাদের আমলে কিছু কিছু বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের মুখে এই নির্বাচনে সরাসরি ভোটে চারজন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে ৩ ও বিএনপি থেকে একজন নারী সরাসরি ভোটে জয়লাভ করেন। এই চারটি আসন নিয়ে পঞ্চম জাতীয় সংসদে নারী সদস্য সংখ্যা হয় ৩৪। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনজন নারী জয়লাভ করেন। কিন্তু আন্দলনের মুখে এই সংসদ দ্রুত ভেঙে যায়। পরবর্তীতে একই বছরের জুনে হয় আবার নির্বাচন। সে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে তিনজন করে এবং জাতীয় পার্টি থেকে দুইজন নারী সরাসরি ভোটে জয়ী হন।

২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সাথে জোট বেঁধে জামায়াত নির্বাচন করে। বিএনপি ১৯৩, আওয়ামী লীগ ৬২, জামায়াত ১৬, জাতীয় পার্টি ১৪, জাতীয় পার্টি নাজিউর ৪, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ২, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দল ৯ আসন লাভ করে। এই সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় “সংবিধান বিল ২০০৪” (চতুর্দশ সংশোধনী) পাস করা হয়। সংসদে পাস হওয়া এই প্রস্তাবে সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩০ থেকে বৃদ্ধি করে ৪৫ করা হলে সংসদে মোট সদস্য সংখ্যা ৩৪৫-এ উন্নীত হয়।

২০০৭ সালে নবম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধ সৃষ্টি হলে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদ একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। একটানা দুই বছর ক্ষমতায় থেকে ২০০৮ দেশে নবম জাতীয় নির্বাচন দেওয়া হয়। এই সময় বিগত ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদী দল ও জামায়াতের সময়ের সরকারের আমলে ভুয়া ভোটার করা হয়েছে বলে আওয়ামী লীগ থেকে অভিযোগ আনা হয়। এই কারনে বাংলাদেশে এই প্রথম ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা করা হয়। বাদ পড়ে এক কোটি ২১ লাখ ভুয়া ভোটার।

২০০৮ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল -জামায়াতের ভরাডুবি হলে আওয়ামী লীগ এককসংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০, বিএনপি ২৯, জাতীয় পার্টি ২৭, জামায়াত দুই, স্বতন্ত্র চার এবং অন্যান্য দল সাত আসন লাভ করে। ২০০৮ নির্বাচনে এই ১৯ জন নারী মহিলা প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে। এই সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৪৫টি থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। এর আগে অষ্টম সংসদে সংখ্যাটি ৩০ থেকে ৪৫ করা হয়।

২০১৪ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ৩০০ জন সংসদ সদস্য নিয়ে গঠিত হয়। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে ৩০০টি আসনের ১৪৭টিতে একযোগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, বাকি ১৫৩ আসনে প্রার্থীগণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন। তবে এই নির্বাচনে বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আনা হয়। পর্যবেক্ষক মহলের মতে সরকার বিরোধী জোটের এই দাবি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। কারণ, ১৫৩ আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া একটি নির্বাচন কখনই গ্রহণযোগ্য ছিল না। সাধারণ জনগন এই নির্বাচন বয়কট করেছে বলে বিরোধী দলীয় জোট থেকে দাবি জানানো সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ২০১৪ সরকার গঠন করে।

২০১৪ নির্বাচন পরবর্তীতে বিরোধী দলীয় জোটের বাঁধার মুখে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাপকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা এবং স্পিকারের মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে থাকা তিনজনই ছিলেন নারী। কয়েকজন নারীকে মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন সরকারী প্রশাসন ও আনসার, পুলিশ, এমনকি সামরিক বাহিনীতে মহিলাদের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ পদের মধ্য দিয়ে সামনে নিয়ে আসা হয়। তবে সরকার বিরোধী জোট হয়ে যাওয়া এই নির্বাচন ও শেখ হাসিনার সরকারকে কখনই গ্রহণ করেনি। তারা এই সরকারকে সম্পূর্ণ অবৈধ সরকার বলে দাবি করে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে সারাদেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০,৪৮০ জন। যার মধ্যে ৫ কোটি ২৫ লাখ ৪৭,৩২৯ জন পুরুষ ও ৫ কোটি ১৬ লাখ ৪৩,১৫১ জন নারী ভোটার। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৬৯ নারী প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এদের মধ্যে ২২ জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটাই ছিল সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড। তবে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে দেশ ও বিদেশে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ১৯ জন নারী। এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি নারী প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন। এদের মধ্যে চার জন স্বতন্ত্র ও বাকি ১৫ জন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। নারী প্রার্থীর সংখ্যা এই নির্বাচনে ছিল সব চেয়ে বেশি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন ৯৪ জন। এই নির্বাচন পরবর্তীতে পুনরায় দেশ ও বিদেশে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপি জামায়াতসহ বিরোধী জোট ও দেশের জনগণ এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে।

এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থানে সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রাখার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি? বিষয়টি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক মহল নুতন করে ভেবে দেখতে পারে। কারণ, বর্তমানে রাজনীতির অঙ্গনে নারীর সক্রিয়তা অনেক বেশি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো পুরুষতন্ত্রের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। আগামীতে বাংলাদেশের বড় দুইটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশের নারী ভোটার মোট জন্যসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। সুতরাং সংসদে নারী আসন সংরক্ষণ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে নুতন করে আলোচনা হতে পারে। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিবেচনা করলে নারী পুরুষ সকলেরই সমান অধিকার থাকা উচিত। আগামী নির্বাচনগুলোতে নারীদের সরাসরি কমপক্ষে ৩৫% প্রার্থিতা সৃষ্টি করলে তখন আর সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন হবে না। নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করে বরং তাদের যোগ্যতাকে আরো ছোট করা হচ্ছে। নারীদের প্রতি বৈষম্য দূর ও অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে এই পথে বাংলাদেশ আর কতদিন চলবে?

আশা করি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা আসছে নির্বাচনে বিষয়টা নিয়ে নিজ দলের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে আসবেন। দেশের নারী ভোটার মোট জন্যসংখ্যা প্রায় ৫০% হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ নারী প্রার্থীকে সরাসরি নমিনেশন দেওয়াটা কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। আশা করি আগামীতে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিকদলগুলো এই গুরুত্ব পূর্ণ দিকটা পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণে কার্পণ্যতা করবেন না।

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, ইলেক্টেড মেম্বার, লেফট পার্টি স্টকহল্ম ডিসট্রিক্ট ব্রাঞ্চ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x