Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

'তলাবিহীন ঝুঁড়ির' বাংলাদেশকে সংস্কারের মাধ্যমে পাল্টে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান

ভারতের পানি আগ্রাসনের কথা মাথায় রেখে জিয়াউর রহমান ‘খাল খনন’ কর্মসূচি শুরু করেছিলেন

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৫, ১১:০০ এএম

“বাংলাদেশ”! ১৯৭১ সালে স্বায়ত্বশাসনের দাবিদার আওয়ামী লীগের অনেকই হানাদার পাকিস্তানিদের আক্রমণের মুখে আত্মসমর্পন করেছিলেন, আর কেউ কেউ তো ভারতে পালিয়েছিলেন। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভের সময় কোরআন শপথ করে পাকিস্তানের প্রতি অনুগত থাকার শপথ ভঙ্গ করে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। নিজের জীবন তো বটেই, স্ত্রী এবং দুই শিশু সন্তানের নিরাপত্তার কোনো চিন্তা না করেই তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন; দেশ স্বাধীন করেছেন; পৃথিবীর বুকে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ।

গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাবার পর থেকে “সংস্কার” শব্দটি বেশ পরিচিতি পেয়েছে। সবাই রাষ্ট্র সংস্কার করতে চান। কিন্তু জানেন কি- বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সবার প্রথম আমুল সংস্কার কে শুরু করেছিলেন? তিনি শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

একদলীয় বাকশাল ও মাত্র চারটি সংবাদপত্রের মডেলের বাংলাদেশ থেকে ভোট ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মুক্ত করে শহিদ জিয়া শুরু করেন বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রকে ফিরিয়ে দেন তার স্বাধীনতা। আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক বিলুপ্ত এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলেরই পূনর্জন্ম হয়েছে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সংস্কারের কারণে।

হাল আমলে শুরু হওয়া “আমেরিকান আইডল” বা “ইন্ডিয়ান আইডল” এর দেখাদেখি বাংলাদেশেও ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। “নতুন কুঁড়ি”র কথা মনে পড়ে? দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টেলিভিশন শিশু সাংস্কৃতিক মেধা অনুসন্ধান প্রতিযোগিতা। সেটা শুরু করেছিলেন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

“সবুজ বিপ্লব” এর কথা মনে পড়ে? ১৯৭৪ সালে যে দেশে ৭ কোটি মানুষের খাবার উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি ১৯৮০ সালে সেই দেশটিই অভ্যন্তরীন চাহিদা মিটিয়ে নেপালে চাল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এখন সেই দেশটিতেই ১৮ কোটি মানুষ দিব্যি খেয়ে পড়ে বেঁচে আছে। ওই সবুজ বিপ্লবেরও শুরু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

“জনশক্তি রপ্তানি” কীভাবে শুরু হয়েছে জানেন? শহিদ জিয়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের কর্মক্ষম বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে তার উদ্যোগে ৬,০৮৭ জন কর্মীকে কুয়েতে প্রেরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি শুরু করে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে যেন দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা যায় তার জন্য গড়ে তুলেছিলেন “যুব উন্নয়ন কেন্দ্র”সহ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

যুবকদের দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষিত জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন যুব মন্ত্রনালয়, যুব উন্নয়ন কেন্দ্র, প্রতিটি মহকুমায় ন্যুনতম একটি করে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট। নারী-শিশুদের উন্নয়নে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নারী ও শিশু মন্ত্রনালয়। শিশু একাডেমিও তারই সৃষ্টি।

ভারতের পানি আগ্রাসনের কথা মাথায় রেখে জিয়াউর রহমান আরও চল্লিশ বছর আগে “খাল খনন” কর্মসূচির মাধ্যমে জোতদারদের হাতে দখল হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনঃখনন করে ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, মাত্র দুই দশক আগে বিশ্বের পানি বিশেষজ্ঞরা ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনা করে তার বদলে জলাধার নির্মাণ করে ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন।

দেশের খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য তিনি পেট্রোবাংলার অধীনে অনুসন্ধান অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা (Exploration Directorate) করেন। সেই প্রতিষ্ঠান সিসমিক সার্ভের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন-শোর এবং অফ-শোর এ বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস এর সন্ধান পায়। বাংলাদেশ তখন সেই সম্পদ উত্তোলনে কারিগরিভাবে সক্ষম ছিল না, তাই তিনি জাপানের কারিগরি সহায়তা নিয়ে সেই তেল-গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা করছিলেন।

জিয়াউর রহমানই সর্বপ্রথম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জীবিত এবং শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেন, মুক্তিযুদ্ধের সকল দলিলপত্র প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। “স্বাধীনতা পদক” এবং “একুশে পদক” প্রবর্তন করেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ হচ্ছে রেডিমেড গার্মেন্টস শিল্প। এই শিল্প প্রতিষ্ঠা এবং উন্নত বিশ্বের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার সৃষ্টিও প্রেসিডেন্ট জিয়ারই অবদান। ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে দেশের শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানী সহজ করাও ছিল জিয়াউর রহমানের অবদান।

১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ এই চার বছরে তিনি পররাষ্ট্র নীতি সংষ্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত করেন। তার সময়েই জাপানকে হারিয়ে বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হয়। আন্তর্জাতিক কুটনীতিতে সেটাই ছিল বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ অর্জন।

শহিদ জিয়াকে হত্যার পর ১৯৮১ সালে জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তৎকালীন এমপি এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন, “জিয়াউর রহমানের জানাজায় অংশ নিয়ে লাখ লাখ জনতার স্রোত তাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। তার প্রতি গোটা বাংলাদেশের মানুষ তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছে। তাতে প্রমাণিত হয়েছে, তিনি বাংলাদেশের মানুষের কত কাছাকাছি এবং প্রাণপ্রিয় ছিলেন। এটা বলতে কেউ কুণ্ঠাবোধ করলে মনে করব, তার মানসিক দৈন্য ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব রয়েছে।”

জিয়াউর রহমান কেন জনপ্রিয় ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় বৃটিশ রাজ, পাকিস্তানি জান্তা এবং নিজের গড়া দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর বক্তব্য থেকে। অসুস্থ মওলানা ভাসানীকে হাসপাতালে দেখতে যান তমদ্দুন মজলিশের অধ্যাপক আবদুল গফুরসহ কেউ কেউ। তখন জিয়াউর রহমানকে প্রকাশ্যেই সমর্থন দিচ্ছিলেন ভাসানী।

সেদিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে অধ্যাপক গফুর বলেন, “আপনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা। সেই আওয়ামী লীগ ছিল ক্ষমতায়। প্রকাশ্য জনসভায় আপনি আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের বলেছেন, দুর্নীতি করলে, জনগণের জন্য কাজ না করলে তোমাদের পিঠে চাবুক মারা হবে। আপনার নিজের দলের নেতাদেরও এমন কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন, আর আজ আপনি জিয়ার প্রতি কেন সমর্থন দিচ্ছেন? জিয়ার প্রতি কেন আপনার এই দূর্বলতা?”

মওলানা ভাসানী বললেন, “আবদুল গফুর, আমি তোমার বাবার বয়সী। আমি আমার জীবনে তোমার চেয়ে বেশি সরকার ও বেশি নেতাদের দেখেছি। ব্রিটিশ আমলে দেখেছি, পাকিস্তান আমলে দেখেছি, বাংলাদেশ আমলেও দেখেছি। তুমি আমাকে একটা এক্সাম্পল দেখাও, কোন রাজনৈতিক নেতা কম-বেশি দুর্নীতি করে নাই বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় নাই এবং কোন নেতা স্বজনপ্রীতি করে নাই।” অধ্যাপক গফুর চুপ করে রইলেন।

মওলানা বললেন, “এখন পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। কোনোরকম স্বজনপ্রীতিও তার মধ্যে নাই। তার আত্মীয়-স্বজনকে কেউ চেনে না। তাদের সে কোনো সুযোগ-সুবিধা দেয় না। ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টে এ ধরণের শাসককে মানুষ পছন্দ করে। একজন সৎ শাসকের তো প্রশংসাই প্রাপ্য।” - সৈয়দ আবুল মকসুদ / ভাসানী কাহিনী ॥ [আগামী প্রকাশনী - নভেম্বর, ২০১২ । পৃ: ৪৭-৪৮]

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটা জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তার প্রমাণ ওপরের ছবিটি। ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে তিনি যখন রাষ্ট্রীয় সফরে নেদারল্যান্ড গিয়েছিলেন, তখন নেদারল্যান্ডের রানী জুলিয়ানা তার স্বামীকে নিয়ে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন জিয়াউর রহমানকে অভ্যর্থনা জানাতে।

বাংলাদেশের বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতের দিকে তাকালে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃঢ় ও শক্ত মনের ছোটখাটো মানুষটি, যার ছায়া আজও বিরাজমান এই দেশের মাটি ও মানুষের ওপর, যে দেশ পরিচালনার জন্য তিনি মাত্র চার বছরের কিছু বেশি সময় পেয়েছিলেন এবং এই অল্প সময়েই তিনি দেশটির ইতিহাসের গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন। তার ব্যক্তিগত সততা এবং নৈতিকতা নিয়ে শত্রুরাও কখনও প্রশ্ন তোলেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের জন্য তিনি যে ব্যক্তিগত ও পেশাগত মানদণ্ড স্থাপন করে গেছেন করেছেন, তা এতই উঁচু যে, এখন পর্যন্ত কেউই সেই মানদণ্ডের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।

এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান, তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়
   

About

Popular Links

x