Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ছবি কথা বলে, ছবি কথা বলবে…

নিষিদ্ধ ঘোষিত একটা রাজনৈতিক দল কীভাবে দেশের সংকটকালীন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:৪৫ পিএম

গত জুলাই- আগস্ট মাসের  গণ অভ্যূত্থানের মুখে ৫ আগস্ট ক্ষমতাসীন আওয়ালীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের পর সেদিনই বিকেলে সেনাবাহিনী প্রধান সাংবাদিকদের সামনে এসে পরিবর্তিত পরিস্থিতে রাজনৈতিক দলগুলির সাথে সেনাবাহিনী প্রধানের যে মত বিনিময় বা পরামর্শ সভা হয় সে বিষয়ে কথা বলেন। সভায় কোন কোন রাজনৈতিক দল উপস্থিত ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথম যে রাজনৈতিক দলটির কথা বলেন, সেটি হল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তিনি বলেন, সেখানে ছিলেন জামায়াতের আমির। বাংলাদেশের রাজনীতি এবং ক্ষমতার পালা বদলের প্রেক্ষিত বিবেচনায় এই দেশকে  বলা হয়ে থাকে দ্বি-দলীয় রাজনীতির দেশ। অর্থাৎ রাষ্ট্র ক্ষমতায় হয় আওয়ামলীগ নয় বিএনপি। যদিও আওয়ামলীগ সরকার লম্বা সময়ের জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে সেই ধারাতে ছেদ ঘটিয়েছে। জাতীয় পার্টি কথিত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু দেশের মানুষ দল হিসাবে বিএনপিকেই বিরোধী দল মনে করেন। আওয়ামলীগ-বিএনপি  দু’টি দলই নানা সময় জোট করে নির্বাচনী লড়াই করেছে। কিন্তু জোটের হাল সব সময় এই দুইটি দলের হাতেই ছিল। আওয়ামলীগ-বিএনপি’র বাইরে দেশের মানুষের কাছে তৃতীয় রাজনৈতিক দল হল জাতীয় পার্টি। পরিচিতি এবং ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতের অবস্থান চতুর্থ এবং সেটা শুধু রাজনীতি নয়; বরং একাত্তর এবং ততপরবর্তী বিভিন্ন সময়ে তাদের অপরাজনৈতিক ভুমিকার কারণেও বটে। সেই রাজনৈতিক দলটি কিভাবে দেশের এরকম সংকট্ময় মুহুর্তে এত গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠল? অনেকেই বিষয়টাকে নিয়ে আলোচনার কিছু নাই কিংবা সেনাবাহিনী প্রধান কোনো  উদ্দেশ্য ছাড়াই জামায়াতের নাম শুরুতে বলেছেন বলে মনে করেন। কিন্তু ৫ আগস্ট পরবর্তী ঘটনা পরম্পরা বলে, যে সেদিন দল হিসাবে জামায়াতের নাম প্রথম উচ্চারিত হওয়া কোনো উদ্দেশ্যহীন কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কেন বলছি বিচ্ছিন্ন নয়, তার একাধিক কারণ রয়েছে। দু-একটি আলোচনা করা যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ এবং ততপরবর্তী সময়ে শিবিরের সাথে তার সংযোগ নিয়ে নানান আলাপ দেশবাসী জানেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বাম ছাত্র সংগঠন এবং প্রশাসন সব সময় শিবির বিরোধী অবস্থানে ছিলেন অনেক বছর ধরে, সেখানেও শিবির আত্মপ্রকাশ করে। শিবিরের দাবী অনুযায়ী  বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দলোনের সমন্বয়কদের সিংগভাগই  শিবিরের, এমনকি তারা সংখ্যা উল্লেখ করেই এই দাবী করেন। অন্যরা কিন্ত এর জোরালো প্রতিবাদ করেনি। তার মানে এই কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তো জামায়াতের নাম শুরুতে উচ্চারিত হওয়ায় সমীচীন। কিন্তু দেশের মানুষের তো বটেই রাজনীতিবিদদেরও দোলাচাল কাটে না। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের কৃতিত্ব তাহলে কার? অভ্যত্থানকারী ছাত্র-জনতার নাকি জামায়াত-শিবিরের? মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্র্যাইব্যূনালের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চীফ প্রসিকিউটর হিসাবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটা কি দেশের সচেতন মানুষেরা জানেন না? জামায়াত এখানে খুব ঠাণ্ডা মাথায় খেলেছে এবং খেলে যাচ্ছে। শোনা যাচ্চে,  জামায়াত খুব পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হচ্ছে। জামায়াত নির্বাচনী পদ্ধতিতেই আগামী তিন মেয়াদের মধ্যে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে চায়। আগামী নির্বাচনে জামায়াত তিনশো আসনেই নিজেদের প্রার্থী দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে তিনশো আসনের অভিজ্ঞতা নিতে চায় এবং যতগুলি আসনই তারা জয়লাভ করুক না কেন, জামায়াতের ব্যানারে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা তাদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ধরে রাখবেন, জনমনে আস্থা অর্জন করে পরবর্তী নির্বাচনে তাদের লক্ষ্য  অর্ধেক আসনে জয়লাভ এবং তৃতীয় মেয়াদে গিয়ে তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে চায়। যে কারণেই নাকি নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের কোনো তাড়াহুড়া নাই।

এখন কথা হলো, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটা রাজনৈতিক দল কীভাবে দেশের সংকটকালীন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা যদি নাই থাকে, তাহলে তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দখলের যে পরিকল্পনা আঁটছেন তাতে তো দোষের কিছু নাই। বরং তাদের দূরদর্শিতার প্রশংসাই করতে হয়। কিন্ত সেখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায়, কথিত স্বৈরাচারের আমলে, তাৎক্ষনিক হলেও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় জামায়াতে ইসলা্মী নিষিদ্ধ হয়েছিল, অন্য সরকার দায়িত্ব নেবার আগেই কে তাদে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করল? নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় আসার যে পরিকল্পনা জামায়াতের সেটা কি জামায়াত ৫ আগস্ট পরামর্শ সভায় গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হবার পর থেকে করছেন নাকি, এই পরিকল্পনা জামায়াতের আগে থেকেই ছিল, যেটাকে মাথায় রেখেই জামায়াত তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের মাধ্যমেই নেপথ্যে থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলনে পরিচালিত করেছেন? এখন আমরা বলতে পারি একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে, সেটাই বড় কথা। এখানে কার কি ভূমিকা সে হিসাব মেলাতে না যাওয়ায় ভাল। কিন্ত হিসাব তো মেলাতেই হচ্ছে, বিজয়ের মাস ডিসেমবরের ৪ তারিখ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, প্রিন্ট মিডিয়ার অনলাইন ভার্সনে এবং ৫ ডিসেম্বর বাংলা, ইংরেজি সকল দৈনিক পত্রিকার একটা ছবি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠনের উদ্যোগ হিসাবে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সভা শেষে ছবিটি তোলা হয়েছে। ছবিতে আমরা দেখলাম প্রধান উপদেষ্টার ঠিক পাশের মানুষটিই জামায়াতে ইসলামির  আমির ডা. শফিকুর রহমান। এখন বলতে পারেন, এখানে দোষের কি আছে? দোষের কিছু নাই, তবে ভাবনার বিষয় আছে, বিশ্লেষণের বিষয় আছে। দেশের সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সকল রাজনৈতিক দল মিলে একটা সভা হচ্ছে, সেই সভায় কোন দল কতটা গুরুত্ব পেয়েছেন, সেইটা জানার সুযোগ আপামর জনসাধারণের থাকে না। অনেকেই একটা ধারণালাভ করেন শিরোনাম দেখে, ছবি দেখে, ছবির নিচের ক্যাপশন দেখে। ছবিতে আমরা দেখলাম বিএনপি’র শীর্সস্থানীয় রাজনীতিবিদ যাঁদের মাঠের রাজনীতির অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন প্রথম সারির একেবারে কোণায়। সভায় উপস্থিত ছিলেন সিপিবি’র  একজন সাবেক সভাপতি এদেশের স্বাধীনতা পুর্ব এবং স্বাধীনতা উত্তর তো বটেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে যার দারুণ অভিজ্ঞতা, তাকেও ছবিতে খুঁজে বের করতে হচ্ছে। তাহলে এই সংকট, বিশেষ করে ভারতীয় মিডিয়ার মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে, তাঁদের কূটনৈতিকভাবে অসৌজন্যমূলক বক্তব্যের কূটনৈতিক জবাব দিয়ে নিজেদের স্বাধীন সত্ত্বা, সার্বভোমত্ত্ব জানান দেবার জন্য কি জামায়াতে  ইসলামীই সবচেয়ে উপযুক্ত দল, ডাঃ শফিকুর রহমানই কি সবচেয়ে উপযুক্ত রাজনীতিবিদ কিংবা প্রভাবক ব্যক্তি? যে দলটি মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধের সাথে যুক্ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা এবং উস্কানিমূলক প্রপাগন্ডা ছড়ানোই যে দলের ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক  ভিত শক্ত করার কৌশল, তারা কিভাবে ভারতের মত শক্তিশালী একটা দেশের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে, অপপ্রচার, অপসংবাদ, উস্কানি রুখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি এতই আকাল চলছে, যে সেখানে জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্রে রেখে আমাদের আগামীদিনের বাংলাদেশ গড়ার কথা ভাবতে হচ্ছে?

অনেকেই বলতে পারেন, এখানে ভাবনার কিছু নাই। কারণ ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত পেরে উঠবে না। প্রশ্নটা কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভ কিংবা হারার নয়। এদেশের মানুষের কাছে জামায়াতকে গ্রহণীয় করার একটা প্রক্রিয়া চলছে কি’না সেটা নিয়ে কেউ সেভাবে প্রশ্ন তুলছেন না। বর্তমান কথিত অন্তবর্তীকালীন সরকার এবং আমাদের গণমাধ্যম যেই সেই প্রক্রিয়ায় দারুণ ভূমিকা রাখছেন, সে ব্যাপারে বোধহয় সন্দেহের অবকাশ রাখার সুযোগ নাই। সেটা কিভাবে সম্ভব হল, সেটা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু বিজয়ের মাসে আমাদের দেখতে হল, দেশের স্বাধীনতা, স্বার্বভোউমত্ব রক্ষার সবচেয়ে বড় এজেন্ট হল, যারা এই স্বাধীনতা শুধু চায় নাই, তাই-ই নয়; সর্বোতভাবে বিরোধিতা করেছিল। দেশ কোনদিকে যাচ্ছে, সেটা নাকি বিদ্যতজনেরাই বুঝতে অক্ষম। তাই জামায়াতের ভবিষ্যৎ এই দেশে কি সেটা মন্তব্য না করে শুধু এটুকু বলেই সমাপ্তি টানতে চাই। ছবি কথা বলে…এই ছবি এবং ছবির মানুষেরা একদিন ইতিহাসে মূল্যায়িত হবেন, সেটা কীভাবে সময়ই বলে দেবে।  

মানবাধিকার কর্মী অপূর্ব দাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমি অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়
   

About

Popular Links

x