Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জুলাই বিপ্লব এবং আমাদের দায়

আমরা কি শিখেছি কীভাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ভালোবাসতে হয়?

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৫, ০২:৫৪ পিএম

জুলাই, ২০২৪। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি কেবল একটি মাস নয়, এক বিপ্লবের নাম। হাজারো তরুণ দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে, জীবন উৎসর্গ করে জুলাই মাসের ইতিহাস রচনা করেছে। অসীম সাহস আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা জাতিকে আরেকবার স্বপ্ন দেখালো, দেশকে নতুন করে কীভাবে ভালোবাসতে হয় আমাদের শেখালো। কিন্তু আমরা কি শিখেছি কীভাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ভালোবাসতে হয়?

দুঃখজনক হলেও এই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখছি দেশের এক শ্রেণির কথিত সংস্কৃতিকর্মী, রুচিশীল চিন্তাবিদ ও প্রগতিশীলতার দাবিদাররা—যারা সামাজিকমাধ্যমে নিজেদের আধুনিকতা ও বিবেকের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন—তাদের অবস্থান মূলত একটি কর্তৃত্ববাদী অপসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বই করে। তারা কখনো সরাসরি, কখনো ইঙ্গিতে, আবার কখনো নীরব থেকে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগকে অবজ্ঞা করে চলেছেন।

একটি বড় অংশ, যারা নিজেদের "প্রগতিশীল" বলে দাবি করে, তাদের সাম্প্রতিক অবস্থান যেন একটি ছদ্মবেশ মাত্র। তারা ফ্যাসিবাদী শক্তির ছায়ায় এতদিন বসবাস করতে করতে নিজেরাই ছায়া হয়ে উঠেছেন। দীর্ঘ দিনের প্রভুকে হারিয়ে আবারো তারা নতুন কোনো অপশক্তিকে খুঁজছেন যেখানে তারা আবার ছায়া পাবেন।  রাজনৈতিক দল বা শক্তির প্রতি আনুগত্য আর আত্মসমর্পণকে প্রগতিশীলতা বলে চালানো এক বিপজ্জনক প্রবণতা। এই তথাকথিত প্রগতিশীলগোষ্ঠী জুলাই বিপ্লবকে “আবেগপ্রবণতা” বলে নস্যাৎ করতে চায়, শহিদদের আত্মত্যাগকে ছোট করে কর্তৃত্ববাদী শক্তিরই পূজা করতে চায় । কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বিভ্রান্তি ছড়ান—জুলাই বিপ্লব এবং ছাত্রজনতার আত্মত্যাগকে দেশের বিরুধ্যে কেবলি একটি গভীর ষড়যন্ত্র বলার মতো নির্লজ্জ বয়ান দেন।

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। যে নিজের সন্তানের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করে, যে নিজের মুক্তির সংগ্রামকে ভ্রান্ত বলে মনে করে, ইতিহাস তাকে অস্বীকার করবে। আমাদের সন্তানরা যারা বাংলাদেশের পতাকা বুকে নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, যারা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতিকে ফ্যাসিবাদীশক্তির কালো থাবা থেকে মুক্ত করলো, তারা কি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না? তাদের অপমান করা মানে নিজের সন্তানকে অস্বীকার করা, নিজ জাতিকে অস্বীকার করা।

জুলাইয়ের পর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অনেককে হতাশ করেছে। কেউ সরাসরি বিপ্লবের চেতনাবিরোধী কাজে, কিংবা কিছু মৌলিক বিষয়ে নীরবতা, অথবা অতিকথনের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে—তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। ছাত্র জনতার আত্মত্যাগ ও বিপ্লবের চেতনা কি তাহলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে একটুও নাড়া দিতে পারেনি? ফ্যাসিবাদবিরোধী একটি নতুন রাজনৈতিক ও নৈতিক সংলাপ কি তারা তৈরি করতে পেরেছে? উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। 

সংস্কৃতিকর্মীদের প্রগতিশীল চেতনায় বিশ্বাসী মনে করা হয়।  কিন্তু আজ সেই সংস্কৃতির অনেক ধারক-বাহককেই কর্তৃত্ববাদী ভাষায় ফ্যাসিবাদের পক্ষ্যে কথা বলতে দেখা যায়। কবি, শিল্পী, নাট্যকার, গায়ক—এদের মধ্যে কতজন জুলাই বিপ্লব নিয়ে একটি শব্দ বলেছেন? বরং দেখা যাচ্ছে, তারা নিরব থেকে নিজের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করছেন অথবা বিপ্লবের ইতিহাসকে তুচ্ছ করে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে অংশ নিচ্ছেন। এই আত্মপ্রবঞ্চনা কেবল অপসংস্কৃতির উত্থানকেই ত্বরান্বিত করছে

জুলাই আমাদের সামনে একটি দ্বিধাবিভক্ত রাষ্ট্রের বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে। যেখানে একদিকে তরুণদের রক্ত আর দেশপ্রেম, অন্যদিকে ক্ষমতার ছায়ায় বেড়ে ওঠা এক নৈতিক পতনের সংস্কৃতি। এখন দরকার—একটি নৈতিক জাগরণ। প্রগতিশীলতার নামে যারা চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের সংশোধন প্রয়োজন।   সাংস্কৃতিক কর্মীদের নতুন করে ভাবতে হবে—তাদের কলম, কণ্ঠ, ক্যানভাস, ক্যামেরা কাদের জন্য? রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবতে হবে—তাদের সংগঠন কাদের প্রতিনিধিত্ব করছে?

জুলাই বিপ্লব একটি সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ যদি বড় দল, প্রতিষ্ঠান, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসমাজ কাজে লাগাতে না পারে, তাহলে ইতিহাস একদিন তাদেরকেও  কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে নিশ্চয়ই ।

ইমামুল হক, জাতিসংঘের প্রাক্তন কর্মকর্তা ও নির্বাহী পরিচালক, পেস, কানাডা।  [email protected]
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x