Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশে কি বৈষম্যের শিকার হতে যাচ্ছেন ৪০তম বিসিএসের এএসপিরা?

কোটা বাতিল করে দেওয়ার পর ৪০তম ছিল বিসিএসের প্রথম পরীক্ষা 

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৩৭ পিএম

২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনের জেরে সরকার কোটা বাতিল করে দেওয়ার পর সরকারি চাকরির সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম বিসিএসের প্রথম পরীক্ষা ছিল ৪০তম বিসিএস।

কোনো ধরনের কোটা প্রথার পরিবর্তে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া প্রথম বিসিএস ব্যাচ হিসেবে পরিচিত ৪০তম বিসিএস ব্যাচ। 

অথচ বৈষম্যের শিকার হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন ৪০তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ২৫ জন সহকারী পুলিশ সুপার বা এএসপি। প্রায় তিন মাস পার হয়ে গেলেও তাদের স্থগিত রাখা সমাপনী কুচকাওয়াজের নতুন কোনো তারিখ এখন পর্যন্ত নির্ধারিত হয়নি। 

২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর ৪০তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ৬৬ জন এএসপি একবছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ নিতে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীতে যোগদান করেন।  

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের সময় এই ৬৬ জন প্রশিক্ষণরত অবস্থায় রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে ছিলেন।

প্রশিক্ষণ কোর্স শেষ করার পর ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর তাদের সমাপনী কুচকাওয়াজ হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত হয়। 

সমাপনী সেই কুচকাওয়াজে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার দাওয়াত পান। 

 

তিনি ১৯ অক্টোবর রাতে ফেসবুকে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে একটি পোস্ট দেন যা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়।

ফেসবুক পোস্টে সালাহউদ্দিন আম্মার লিখেছিলেন, “এই ৬২জন এএসপি হাসিনার আমলে নির্বাচিত হইছে। আর কত চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বিসিএস (পুলিশ)-এ নিয়োগ হতো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যক্তি আমার জায়গা থেকে তাই উক্ত প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার পক্ষপাতী নই। তাদের ব্যাপারে তদন্ত হয়েছে কিনা!!

আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিয়োগপ্রাপ্ত (৪০ তম বিসিএসে) ৬২ জন ছাত্রলীগের ক্যাডার এএসপি হিসাবে রোববার প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করতে যাচ্ছেন।”

ফেসবুক পোস্টে তিনি ৬২ জন উল্লেখ করলেও ৪০তম বিসিএসে প্রশিক্ষণরত ছিলেন ৬৬ জন।

১৯ অক্টোবর রাতেই ৪০তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। সমাপনী কুচকাওয়াজের অংশ নিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইজিপিসহ সংশ্লিষ্টরা ১৯ অক্টোবর রাতে রাজশাহীতে পৌঁছেও গিয়েছিলেন।  

তবে নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না করেই সেই রাতে হঠাৎ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৈশভোজসহ ৪০তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া এএসপিদের সমাপনী কুচকাওয়াজের সব কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।

সালাউদ্দিন আম্মারের ফেসবুক পোস্টের জেরে কর্মসূচি স্থগিত হয়েছে কি-না আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৪০তম বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া এক কর্মকর্তার ধারণা, সালাউদ্দিন আম্মারের ফেসবুক পোস্টের জেরেই তাদের সমাপনী কুচকাওয়াজ স্থগিত রাখা হয়।

এরপর ২৪ নভেম্বর পাসিং আউট বা সমাপনী কুচকাওয়াজের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও অনিবার্য কারণে সেটিও বাতিল করা হয়।

এদিকে, দুইবার পাসিং আউটের তারিখ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয় বিতর্ক; শঙ্কা দেখা দেয় ৪০তম বিসিএসের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে।

তবে এসব বিতর্ক ছাপিয়ে নতুন বিতর্ক জন্ম দেয় ১৫ ডিসেম্বরে ওই ব্যাচের ৬৬ জনের মধ্যে ২৫ জনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হলে। 

এর মধ্যে ২১ জনের বিরুদ্ধে ২৬ নভেম্বর প্রশিক্ষণ মাঠে “দৌড়ানোর নির্দেশ সত্ত্বেও এলোমেলোভাবে হাঁটা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির” অভিযোগ আনা হয়। বাকী চারজনের বিরুদ্ধে ২৪ নভেম্বর মুভি নাইটের সময় (প্রশিক্ষণার্থী পুলিশ কর্মকর্তাদের তাদের পেশার সাথে সম্পর্কিত শিক্ষামূলক সিনেমা দেখানো হয়) পাসিং আউট নিয়ে হৈ চৈ করা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়।

এই ২৫ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তবে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রাপ্তদের মধ্যে বেশ কয়েকজন দাবি করেছেন, “নোটিশে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে; তেমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।”   

যদিও পুলিশ আইন ও রীতি অনুযায়ী একবছরের একদিনেরও বেশি কোনো প্রশিক্ষনার্থীকে সারদায় রাখার সুযোগ নেই। তাই ২০ অক্টোবর যেখানে তাদের পাসিং প্যারেড হওয়া কথা সেখানে ২৬ নভেম্বরে প্রশিক্ষণে এলেমেলো হাঁটার অভিযোগের বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, অভিযুক্ত ২৫ জনের মধ্যে সনাতন ধর্মালম্বী ৯ জন। সনাতন ধর্মালম্বী হওয়ার কারণেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে কি-না, এমন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

আবার ৪০তম বিসিএসের ৬৬ জনের মধ্যে যাদের বাড়ি বৃহত্তর ফরিদপুর তারা সবাই ২৫ জনের তালিকায় অভিযুক্ত হয়েছেন। এমনকি দুজনের শ্বশুরবাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়ার জন্যেও ২৫ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে অঞ্চলগত কোনো বৈষম্য করা হচ্ছে কি-না, সেই প্রশ্নও উঠেছে সমালোচক মহলে।

এসব পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ৪০তম বিসিএসে ২৪৪ জন প্রশাসন ক্যাডারের সহকারী কমিশনারসহ বিভিন্ন ক্যাডারে ১,৯২৯ জনকে নিয়োগের গেজেট হয়েছিল।

অন্য সব ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তরা ইতোমধ্যে নির্ধারিত পদে যোগদান করে চাকরি করছেন। এমনকি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাসহ অনেক ক্যাডারে নিয়োগ প্রাপ্তদের অনেকেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করেছেন।

একই ব্যাচের বাকিরা যেখানে চাকরিতে কর্মরত, সেখানে ৪০তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারেরা নির্বাচনের সময় সারদায় প্রশিক্ষণরত ছিলেন। এমনকি জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময়ও তারা প্রশিক্ষণেই ছিলেন।

জুলাই বিপ্লবে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ থাকলেও, যারা আন্দোলনের পুরোটা সময়েই পুলিশ একাডেমীতে প্রশিক্ষণরত ছিলেন তাদের যদি সেই কারণে অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও একটি বড় প্রশ্ন সৃষ্টি করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ শেষে অভিযোগ এনে তাকে সাস্পেন্ড করা হয়েছিল। ২০০২-২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি সাস্পেন্ডেড ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তার চাকরি ফেরত তো পেয়েছিলেনই, বহাল তবিয়তে ফ্যাসিজমের চর্চাও করেছিলেন। 

৪০তম ব্যাচের এইসব কর্মকর্তাদের যদি সাস্পেন্ড করা হয়, (যাদের এখন কোনো চাকরি পরীক্ষা দেওয়ার তেমন বয়সও নেই) তবে তারা কোনো একদিন ক্ষমতা পেলে ক্ষমতার অবৈধ চর্চা যে করবে না; সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

সবমিলে অনিশ্চিত এক গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এসব কর্মকর্তারা। অথচ তাদের এতদিনে প্রশিক্ষণ শেষে বাস্তব প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ৬ মাস সংযুক্ত থেকে কাজ শেখার কথা ছিল।

মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া ৪০তম বিসিএসের পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ বিনির্মাণের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে বলে মত অনেকের। যথাযথ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যদি এই ঘটনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা যায়; তাহলে বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।

এমনকি এই ২৫ জনকে যদি চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, তাহলে তারা হবে বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশের প্রথম বড় কোনো বৈষম্যের শিকার।

সাহাদ আমিন, সাংবাদিক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x