Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সংস্কৃতিবান সমাজ এবং জুলাইয়ের সংকল্প

রাজনীতি যদি নীতিহীন হয়; সমাজ হবে নিষ্ঠুর

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৫, ০৩:৩৪ পিএম

জুলাই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন জাগরণের নাম। একটি প্রজন্ম যখন ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের কাঠামো ভেঙে ফেলে, তখন প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার নয়—প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় মূল্যবোধ, সহনশীলতা, এবং সংস্কৃতির। আমরা আজকের বাংলাদেশকে কোন পথে নিয়ে যেতে চাই?  শুধু “বিপ্লব” নয়; বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই চিত্রটিও আমাদের স্পষ্টভাবে কল্পনায় আঁকতে হবে। আর সেই কল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ হলো—সংস্কৃতিবান সমাজ।

সংস্কৃতিবান সমাজ (কালচারড সোসাইটি) মানে শুধু শিল্প-সাহিত্যে সমৃদ্ধ হওয়া নয়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো- আচরণে শালীনতা, ভাষায় সংযম, চিন্তায় সহমর্মিতা, আর সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক দৃঢ়তা। একটি সংস্কৃতিবান সমাজ গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা, ঐতিহ্য, এবং সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের সম্মিলিত চর্চার মধ্য দিয়ে। এখানে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, মূল্যবোধের পাঠশালা। শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সাররাও এই পাঠশালার শিক্ষক।

জুলাই আন্দোলনের হাত ধরে যে প্রজন্ম রাজপথে নেমেছে, তাদের মধ্যে আগুন আছে, প্রতিবাদের ভাষা আছে; কিন্তু সেই ভাষায় কোথাও কোথাও শালীনতা আর সহনশীলতার ঘাটতি চোখে পড়ে। আমরা যখন বলি, “এ কেমন ভাষা?” তখন আমাদের উচিত একবার আয়নায় নিজেদের দেখা। আমরা কি এমন কোনো সমাজ উপহার দিয়েছি, যেখানে ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা শেখানো হয়? আমরা কি এমন কোনো রাজনৈতিক চর্চা দেখিয়েছি, যা এই প্রজন্ম শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করতে পারে?

রাজনীতি যদি নীতিহীন হয়; সমাজ হবে নিষ্ঠুর। কিন্তু যদি রাজনীতি সংস্কৃতিবানদের হাতে থাকে, তবে রাষ্ট্র হবে মানবিক। একজন সংস্কৃতিবান রাজনীতিক কখনোই বিভাজনের ভাষা ব্যবহার করবেন না; তিনি জানবেন কীভাবে শ্রদ্ধা রেখে দ্বিমত প্রকাশ করতে হয়। জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনায় এই বিশ্বাস নিহিত আছে—রাজনীতি মানে দায়িত্ব, সহানুভূতি ও সৌন্দর্যের অনুশীলন।

আমাদের প্রথম রাজনীতি শেখার জায়গা হলো পরিবার। ভাষা, মূল্যবোধ ও সহনশীলতা পরিবার থেকেই আসে। প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমে মানবিকতা থাকতে হবে।  স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচিতে নৈতিক শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা, বিতর্ক ও নাট্যচর্চাকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, শৃঙ্খলা ও সৌজন্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সাংবাদিকতা ও মিডিয়া যদি অশালীনতা, হিংসা ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তবে সংস্কৃতিবান সমাজের স্বপ্ন অসম্ভব। আজকের ইনফ্লুয়েন্সাররা কেবল পণ্যের প্রচারক নন, তারা চিন্তার কারিগর। তাদের ভাষা, রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

জুলাই আমাদের শিখিয়েছে সোজা হয়ে দাঁড়াতে, প্রশ্ন তুলতে, প্রতিরোধ গড়তে। এখন সময় সেই প্রতিরোধকে মূল্যবোধের আলোয় আলোকিত করার। আমাদের সংস্কৃতিবান হয়ে উঠতে হবে শুধু কথায় নয়, কাজে, দৃষ্টিভঙ্গিতে ও প্রতিদিনের ব্যবহারে। আমরা যদি সত্যিই একটি প্রগতিশীল, মানবিক, সহনশীল রাষ্ট্র চাই—তবে সেই রাষ্ট্রের ভিতর থেকেই গড়ে তুলতে হবে একটি সংস্কৃতিবান সমাজ। আর সে কাজ শুরু হতে পারে আজ, এই মুহূর্ত থেকেই।

ইমামুল হক, জাতিসংঘের প্রাক্তন কর্মকর্তা ও নির্বাহী পরিচালক, পেস, কানাডা।  [email protected]
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x