সরকার বলছে, অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে দেশের উন্নয়ন যাত্রা। সত্যিই ভালো লাগার মতো এ খবর। তবে এর উল্টো পিঠও আছে। প্রশ্ন করাই যায়, এ “উন্নয়ন যাত্রা” সবার হয়েছে কি না? এখনও কিছু মন খারাপের খবর সংবাদমাধ্যম থেকে জাপ্টে ধরে আমাদের হৃদয়ে ক্ষরণ ঘটায়।
তেমনই এক বার্তা হলো, “রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় গভীর নলকূপে সেচের পানি না পেয়ে দুই সাঁওতাল কৃষক আত্মহত্যা”। এটি গত ২৩ মার্চের খবর।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মার্চ গোদাগাড়ীর নিমঘুটু গ্রামের সাঁওতাল কৃষক অভিনাথ মারান্ডি (৩৭) ও তার চাচাতো ভাই রবি মারান্ডি (২৭) বিষপান করেন। এতে অভিনাথ সেদিনই মারা যান। রবি মারা যান ২৫ মার্চ।
কবি আবুল হাসান তার কবিতায় আমাদের মাতৃভূমিকে আখ্যায়িত করেছিলেন, “উদিত দুঃখের দেশ” হিসেবে। বিপুল জনসংখ্যার এ দেশে সকাল শুরু হয় সড়ক দুর্ঘটনা, লঞ্চডুবি, গণপিটুনির মতো সংবাদ দিয়ে। সেখানে নিঃসন্দেহে বাঙালি আধিক্যের দেশে দুইজন সাঁওতাল কৃষকের অপমৃত্যু তেমন বড় আলোড়ন তৈরি করার মতো কিছু নয়। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক প্রচারিত খাদ্যে স্বয়ংপূর্ণতা, বিশ্বে কৃষিপণ্য রপ্তানির মতো প্রচারণার ভিড়ে এ খবরটি উপেক্ষা করা যায় না।
আমাদের দেশে বহু হত্যাকাণ্ডই বিচারহীন থাকে। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয় ধন্যবাদ পাবেন। কারণ তারা গোড়াগাড়ীর ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। আর তারা নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন জমাও দিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে জানতে পাই,“...গোদাগাড়ী উপজেলায় গভীর নলকূপে সেচের পানি না পেয়ে দুই সাঁওতাল কৃষক আত্মহত্যা করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তার সত্যতা পেয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। গভীর নলকূপের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) আলাদা তদন্তেও সেখানে অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে। ৩ মার্চ বিকেলে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলামের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান মো. আবু জুবাইর হোসেন বাবলু। এই তদন্ত প্রতিবেদনে বিএমডিএ’র ঈশ্বরীপুর-২ গভীর নলকূপের সেচ ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম উঠে এসেছে। পানি দিতে অপারেটরের স্বজনপ্রীতি, দুর্ব্যবহার এবং অতিরিক্ত টাকা আদায়েরও অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তদন্তে।...”
-জাগো নিউজ, ৪ এপ্রিল ২০২২
সারা বাংলা ডটনেট - এর প্রতিবেদনে এ নিয়ে আরও জানা যায়, “...পরিবারের দাবি, নলকূপের অপারেটর ও ওয়ার্ড কৃষক লীগের সভাপতি সাখাওয়াত এ দুই কৃষককে বোরো ধানের জমিতে পানি না দিয়ে বিষ খেতে বলেছিলেন। তাই তারা দু’জনে গভীর নলকূপের সামনেই বিষপান করেন। দুই কৃষক বিষপানের পর রাতে তাদের জমিতে পানি দিয়েছিলেন সাখাওয়াত।”
মৃত্যুর পরদিন বাড়ি থেকে অভিনাথের মরদেহ উদ্ধারের সময় পরিবারের পক্ষ থেকে সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে পানি না দিয়ে হয়রানির অভিযোগ করা হয়। তারপরেও পুলিশ সাদা কাগজে কৃষক অভিনাথের স্ত্রী রোজিনা হেমব্রমের সই নিয়ে অপমৃত্যুর মামলা করে। পরের দিন অভিনাথের স্ত্রী গোদাগাড়ী থানায় গিয়ে সাখাওয়াতকে একমাত্র আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। পরে হাসপাতালে রবি মারা গেলে তার ভাই সুশীল মারান্ডি বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেন। এরপর ২ এপ্রিল দিবাগত রাতে পুলিশ সাখাওয়াতকে গ্রেফতার করে। পরদিন ৩ এপ্রিল বিএমডিএ সাখাওয়াতকে চাকরিচ্যুত করে। এদিন সাখাওয়াতকে আদালতে হাজির করে পুলিশ তিন দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। আদালত সাখাওয়াতকে কারাগারে পাঠালেও সেদিন রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয়নি।”
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, “...মৃত দুই কৃষকের পরিবার ছাড়াও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অন্য কৃষকেরা তদন্ত কমিটির কাছে অভিযোগ করেন যে জমিতে পানি না পাওয়ার কারণে অভিনাথ ও রবি বিষপান করেন। অপারেটর সাখাওয়াত পানি দিতে স্বজনপ্রীতি করতেন। সাঁওতাল কৃষকদের ঘোরাতেন। তবে সাখাওয়াতের অনুসারী কিছু কৃষক বলেছিলেন পানি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।”
এদিকে, ঘটনা তদন্তে বিএমডিএও আলাদা একটি তদন্ত কমিটি করেছিল। সেই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতেই রোববার গভীর নলকূপ অপারেটর সাখাওয়াতকে স্থায়ী বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রশীদ।
তিনি বলেন, “তদন্তে কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে।”
কী অনিয়ম জানতে চাইলে তিনি বলেন, “১২৫ টাকা ঘণ্টার পানিতে ১৩৫ টাকা নিতেন অপারেটর।”
বাংলাদেশে সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমান অধিকার পাবেন। এটি আমাদের একান্ত কামনা। এখানে দেখা যাচ্ছে একে তো সাঁওতাল তার ওপর আবার কৃষক হওয়ার কারণে স্থানীয় ক্ষমতাধর আওয়ামী লীগ নেতার কাছে নির্মম নিপীড়নের শিকার হয়েছেন মৃত দুইজন। ভুগেছেন আরও বহু। যেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বাংলার কবি সাহিত্যিকরা কৃষকের পেশাকে মহিমান্বিত করে থাকেন। এমনও কবিতায় পাই, “সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা/ দেশ মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা”।
কিন্তু বাস্তবে আমরা এই সাধকদের ওপর যে আচরণ দেখি তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেউই ভুলে যাবেন না, বিএনপি সরকারের আমলে সারের দাবিরত কৃষকদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা। যার আদৌ বিচার হয়েছে কি-না জানা নেই।
তাই রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে গোদাগাড়ীর আত্মাহুতি দেয়া দুই কৃষক অভিনাথ ও রবি মারান্ডির অপমৃত্যুর দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি ন্যায্য। সেই সঙ্গে দেশের গর্বের কৃষিখাত নিয়ে এমন মর্মান্তিক বার্তার অবসান চাই। সত্যিকার সবার জন্য উন্নয়নমুখী দেশ নির্মাণের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।