Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: শিক্ষকদের চৈতন্য ও রাষ্ট্রের দায়

আমাদের চারপাশে যখন কেউ আত্মহত্যা করে তখন আমরা তার সম্পর্কে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করি

আপডেট : ২৬ মে ২০২৩, ০৮:৪৫ এএম

আমরা খুব ছোটবেলা থেকে একটা কথা  অসংখ্যবার শুনেছি। কথাটা হলো, আজকের শিশুরাই আগামীদিনের ভবিষ্যৎ। পাঠ্যবইয়ে স্কুল পর্যায়ে তো আমাদের একটা ভাবসম্প্রসারণই ছিল, “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।“ আমার মনে হয়, যারা এই কথা প্রতিনিয়ত বলেন এবং আমরা যারা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি তারা কেউই এই কথার মর্ম উপলব্ধি করতে পারিনি আজও।

কারণ, যদি আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে শিশুদেরকে জাতির ভবিষ্যৎ মনে করতাম, তাহলে তো তাদের প্রতি, তাদের সামগ্রিক মনো-দৈহিক বিকাশের প্রতি আমরা আরও যত্নবান হতাম। 

এই দেশের রাজধানী শহরে শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষালাভের জন্য একটা স্কুল নেই, উপযুক্ত খেলার মাঠ নেই, বিনোদন কেন্দ্র নেই, সংস্কৃতি চর্চার জন্য একটা সার্বজনীন প্রতিষ্ঠান নেই। ভাবা যায়? পরিবার এবং নিজ প্রচেষ্টায় শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে এসে সেই কথিত ভবিষ্যত অকালে ঝরে পড়ছে চিরতরে।সেটা নিয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রের কোনো মাথাব্যথা নেই। চলমান মে মাসেই তিন দিনের ব্যবধানে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

শিক্ষার্থী ছাড়াও দেশে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিদিন আত্মহত্যা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন সহযোদ্ধা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন, দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ হত্যাকাণ্ড ঘটে, আত্মহত্যার পরিমাণ তার চার গুণ। আমি এই লেখাতে কোনো পরিসংখ্যান উল্লেখ করতে চাই না। কারণ, একটা প্রচলিত কথা আছে; একটি প্রাণের মৃত্যু দুঃখের, একাধিক বা অসংখ্য মৃত্যু শুধুই পরিসংখ্যান। কথাটা দারুণভাবে সত্য আমাদের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। তাদের একের পর এক মৃত্যু সমাজ এবং রাষ্ট্র তো বটেই সংবেদনশীল মানুষের কাছেও আজ পরিসংখ্যান হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

শুধু শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা নয়, অন্যদের আত্মহত্যার ঘটনাও পরিসংখ্যানের বাইরে কিছু নয়। কিন্তু আমি আজকের লেখায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই, কারণ তারা একটা কাঠামোর মধ্যে থাকেন। শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র চাইলেই এটা রোধ করা সম্ভব। বলা হয়ে থাকে, মানুষের চরিত্রের মৌলিক গঠন তার শিক্ষাজীবনেই সম্পন্ন হয়ে যায়। তাহলে এই সময়ে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের মনো-সামাজিক চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখতে পারতেন, তাহলে ভবিষ্যৎ জীবনেও তারা আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে তো যেতেনই না, বরং অন্যদেরকে সেটা থেকে বিরত থাকতে সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারতেন। কিন্ত সেই জায়গাতে আমরা দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছি। 

আত্মহত্যা প্রকৃত অর্থে যেকোনো দেশের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের মনোসামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। আত্মহত্যা সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি কেন্দ্রীক দায় যতটুকু তার চাইতে অনেক গুণ বেশি দায় সমাজ-রাষ্ট্রের।

আমাদের চারপাশে যখন কেউ আত্মহত্যা করে তখন আমরা তার সম্পর্কে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করি। সেটা গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র। আমাদের নানারকম শব্দ এবং বাক্যবানেই সেটি সীমাবদ্ধ থাকে না, আমার ধর্মের প্রসঙ্গ টেনে এনে তাদের পরলৌকিক জীবন নিয়েও কথা বলি। কিন্ত দার্শনিক ডেভিড হিউম তার আত্মহত্যা বিষয়ক প্রবন্ধে বলেন,“আমি বিশ্বাস করি কোনো মানুষ কখনোই তার জীবনকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই জীবনটা তার কাছে মূল্যবান থাকে।”

আমাদের কাছে নিজের জীবন এবং অন্যের জীবনের মূল্য নির্ধারিত হয় আমাদের পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং সমাজ দ্বারা। তাই আমরা যারা আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বাক্যবাণ করি; একটু ভাবলে আমরা অনুধাবন করতে পারব এর জন্য আমি, আমরাও কোনো না কোনোভাবে দায়ী। এ প্রসঙ্গে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড ইমেইল ডুর্খেইম তার “স্যুসাইড: এ স্টাডি ইন স্যোশিওলজি”  বইয়ে স্পষ্টতই বলেছেন, “আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিক কর্ম নয়; মনোসামাজিক কারণের চেয়ে সামাজিক কারণই আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে থাকে। আত্মহাত্যা হলো, সামাজিক অস্থিরতা, সামাজিক সংহতি এবং সৌহার্দের ফলাফল।” 



পুঁজিবাদী সমাজ দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং আমাদের মতো দেশে সমাজ সবসময় এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনা। শিক্ষকরা সমাজের অগ্রসর অংশ। তাই এক্ষেত্রে তাদের দায় অনেক বেশি। ডুর্খেইম তার লেখায় চার ধরনের আত্মহত্যার কথা বলেছেন। প্রথমটি “ইগোয়িস্টিক সুইসাই “। এ ধরনের আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “সমাজে অন্তর্ভূক্ত হতে না পারার ব্যর্থতা থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ তাকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রবল আকার ধারন করেছে।”

দ্বিতীয় ধরনটি হলো “অল্ট্রয়িস্টিক সুইসাইড”। এটি সমন্বিত সমাজে ঘটে থাকে। যেখানে ব্যক্তির চাহিদা সামগ্রিকভাবে সমাজের চাহিদার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

ডুর্খেইম তৃতীয় ধরনের আত্মহত্যাকে অভিহিত করেছেন “অ্যানোমি সুইসাইড” বলে। ব্যক্তি যখন সমাজের সার্বিক অস্থিরতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না ,তখন সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। মূলত সমাজে যখন বিভিন্ন কারণে ভারসাম্য নষ্ট হয় তখনই এ ধরনের আত্মহত্যার হার বাড়তে থাকে।

সর্বশেষ ধরনটি হলো “ফেটালিস্টিক সুইসাইড”। যখন ব্যক্তিকে অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন তার ভবিষ্যৎ ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত হয় এবং দমনমূলক শৃঙ্খলা সমস্ত ধরনের আবেগকে জোর করে অবদমন করে, তাকে বলতে বাধা দেওয়া হয়, তখন এ ধরনের আত্মহত্যা ঘটে। যা একটি নিপীড়ক সমাজব্যবস্থায় ঘটে, যেখানে এর বাসিন্দারা বাঁচার চেয়ে মরতে চায় বেশি।

পত্র-পত্রিকাতে নানা রকম ফিচার, আর্টিকেল, মতামত পাওয়া যাবে যেখানে আত্মহত্যার অন্তত ডজনখানেক কারণ পাওয়া যাবে। সেই কারণগুলোকে নিয়ে ডুর্খেইম'র এই চারটি কারণের অন্তর্ভুক্ত করা যায় অনায়াসে। বলা হয়ে থাকে, কারণ চিহ্নিত হলে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে তো কারণগুলো চিহ্নিত হয়েই আছে, তাহলে এই ধরনের সমস্যা; যেটির সঙ্গে অসংখ্য মানুষের জীবনের প্রশ্ন জড়িত, সেই সমস্যার সমাধান কেন হচ্ছে না? একজন গ্রামপ্রধান কিংবা সমাজপতি তিনি হয়ত দার্শনিক ডেভিড হিউম কিংবা সমাজবিজ্ঞানী ডুর্খেইম এর নাম শোনেননি। কিন্তু, আমাদের সমাজের কথিত অগ্রসর অংশ শিক্ষকেরা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকেরা এখানে কী ভূমিকা রাখছেন?  বিষয়টাকে ন্যূনতম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আলাপটা তুলবার মত কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা তারা এখন পর্যন্ত রাখতে পারেননি। দেশে খুব কম পেশা আছে যেখানে পেশাজীবীদের ন্যূনতম কর্মঘণ্টা এবং কর্মঘণ্টা হিসেবে উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় রেখে কাজ করতে হয় না। শিক্ষকরা এমন একটা পেশায় কাজ করেন, যেখানে তাদের কর্মঘণ্টা হিসেব করে কাজ করতে হয় না। তাদের সুযোগ আছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশবার, ক্লাসের বাইরে কথা বলার, তাদেরকে নানারকম সামাজিক, সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত করার। কিন্তু তারা হয়তো সেই প্রয়োজনীয়তা বোধই করেন না। করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমান শিক্ষার্থীদের এই অকালমৃত্যু রোধ করা যেত। আমি জানি, এই বক্তব্যের পাল্টা একাধিক যুক্তি আছে। কিন্তু আপনাদের কাছে যে এখনও মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে। আপনাদের প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করার পরদিন আপনারা ক্লাসে যান কীভাবে, স্বাভাবিক কাজকর্ম করেন কীভাবে? এই দেশেই আমরা শিক্ষক দীনেশ্চন্দ্র সেনের কথা জানি, আমরা গোবিন্দ চন্দ্র দেবের কথা জানি, আমরা শামসুজ্জোহার কথা জানি, আমরা প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের কথা জানি, আমরা সরদার ফজলুল করিমের কথা জানি। তারা প্রত্যেকেই শিক্ষকের পাশাপাশি ছিলেন আলোর দিশারী। ছাত্রদের সঙ্গে ছিল প্রাণের সম্পর্ক। প্রফেসর জোহা তো ছাত্রদেরকে রক্ষা করতে নিজেই গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বন্দুকের সামনে। আজ কেনো শিক্ষকেরা পারেন না মমতার সঙ্গে এটুকু বলতে যে, তোমরা কমপক্ষে তোমাদের নিজেদেরকে রক্ষা কর।

আবারও সেই আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। শিক্ষার্থীরা যেহেতু একটা কাঠামোর মধ্যে আছেন, তাদের জন্য যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন দরকার, তেমনি তাদের মনোভুভনের জন্য আলাদা যত্ন দরকার, সেটার জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা দরকার। একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন হলো উপর কাঠামো; শিক্ষক, শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্নশীলতা, তাদের মনের যত্নের যে ব্যবস্থাপনা সেগুলো হলো ভেতর কাঠামো। এই ভেতর কাঠামো আনন্দময় না হলে এ মৃত্যুর মিছিল রোধ করা যাবে না। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আলাদা চেম্বার আছে। সেখানে তারা চাইলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাদা কথা বলতে পারেন। তাদের মনোলোকের খবর নিতে পারেন। কিন্তু তাদের সময় কোথায়? একদল আছেন রাজনীতি নিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা পদ-পদবী নিয়ে, একদল আছেন প্রজেক্ট নিয়ে; কে কোনটার প্রকল্প পরিচালক হবেন, একদল আছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের প্রস্তুতি নিয়ে। আর মোটের ওপর সবারই স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য বিশেষ আবাসিক এলাকায় জমি এবং বাড়ি নিয়ে। 

এই লেখায় মনে হতে পারে, আমি শিক্ষক সমাজকে দোষারোপ করতেই কথাগুলো বলছি। বিষয়টি তেমন নয়, চারটি স্বায়তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের মধ্যেই ছিল, রাষ্ট্র যদি ভুল পথে হাঁটে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সঠিক পথে চলতে সহায়তা করবে। কিন্তু নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং যে বাধ্যতামূলক করা দরকার সেই কথাটায় বলার মত প্রজ্ঞা তারা দেখাতে পারছেন না। ফল যা হবার তাই হচ্ছে। 

শিশুকে যদি আপনি চারাগাছ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তো ফলবান বৃক্ষ হবে দুদিন পর। সেই চারা গাছ ঝরছে, ফলবান বৃক্ষ ঝরছে। বাগানের মালিকের কোনো বিকার নেই। এ দায় সমাজের, শিক্ষকদের। যদিও তাদের  চৈতন্য কবে পুনঃজাগরিত হবে আমরা জানিনা। সমাজ, প্রতিষ্ঠান,  রাষ্ট্র কেউই কি  দায় এড়াবে পারবে?


মানবাধিকার কর্মী অপূর্ব দাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমি অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links