Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

স্বপ্নের পথে সীমারেখার সুর

বাসায় গিয়ে ছাত্র পড়ানো অনেক শিক্ষার্থীর জন্য শুধুমাত্র আয়ে মাধ্যম নয়, বরং স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:৩২ পিএম

"না রে সন্ধ্যায় ব্যস্ত, টিউশন আছে।" 

একটা ছোট্ট বাক্য, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটা জীবনের গল্প। গ্রাম কিংবা মফস্বল থেকে শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা কোনো ছেলে বা মেয়ের স্বপ্ন থাকে খোলা আকাশে ডানা মেলার। নিজের স্বপ্নপূরণের পথে প্রথম ধাক্কা দেয় বাস্তবতা। সেই বাস্তবতায়, অনেকেই বুঝতে পারে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই। মা-বাবার কষ্টের টাকায় সবসময় খরচ চালানো সম্ভব হয় না। আর সেখানেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়—টিউশন। 

টিউশন, অর্থাৎ বাসায় গিয়ে ছাত্র পড়ানো। আজকের দিনের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি শুধুমাত্র আয়-রোজগারের একটি মাধ্যম নয়, বরং স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার। একসময় “লজিং মাস্টার” নামে পরিচিত এই ধারাটি এখন শহুরে সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তখন লজিং মাস্টার মানে ছিল ছাত্রের বাসায় থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে সেই বাসার ছেলেমেয়েদের পড়ানো। সময় বদলেছে, বদলেছে কৌশলও। কিন্তু টিউশন করার পেছনের সেই কষ্ট, সেই দায়িত্ববোধের গল্প আজও বদলায়নি। 

এখন টিউশন মানে শুধু অর্থ উপার্জন নয়, বরং নিজের স্বপ্নপূরণের পথ তৈরি করা। টিউশন করেই কেউ নিজের পকেট খরচ জোগাড় করে, কেউ বা পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নেয়। কেউ আবার এই সামান্য উপার্জন জমিয়ে একদিন বাস্তবায়ন করে তার বড় কোনো শখ। দূর-দূরান্তে ভ্রমণ, নতুন কোনো গ্যাজেট কেনা, কিংবা পড়ালেখার খরচ মেটানো—সবই সম্ভব হয় এই টিউশনের টাকায়। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও আজকাল টিউশন নির্ভর হয়ে পড়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে শহরের ধরণ বদলেছে, মানুষের অভ্যাসও বদলেছে। টিউশন ছাড়াও আজকের শিক্ষার্থীরা খুঁজে নিচ্ছে আয়-রোজগারের নতুন পথ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে মিলে অনলাইন এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে, কেউ হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। কেউ হয়ে উঠছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, আবার কেউ দক্ষ ফ্রিল্যান্সার। 

তবু, সব আধুনিকতার ছোঁয়া ছাপিয়ে, আজও অনেকে বেছে নেয় সেই পুরনো পথ—টিউশন। কারণ, এখানে আছে দায়িত্ব নেওয়ার অভিজ্ঞতা, আছে আত্মনির্ভরতার প্রথম পাঠ। ক্লাস, পরীক্ষা, পড়াশোনার পাশাপাশি আরেকজনের দায়িত্ব নেওয়ার যে অভ্যাস, তা একটা ছেলের বা মেয়ের জীবনের বড় শিক্ষা হয়ে ওঠে। যানজটের শহরে রোদ-বৃষ্টি পেরিয়ে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় গিয়ে পড়ানো, সময় ম্যানেজ করা—সবটাই যেন একেকটি জীবনের গল্প। 

এই শহর অনেক কষ্ট দেয়, অনেক ভার চাপিয়ে দেয়। কিন্তু এই শহরই শিখিয়ে দেয় কিভাবে দায়িত্ব নিতে হয়। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, স্বপ্নের জন্য। রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে ছুটে চলার মধ্যে লুকিয়ে থাকে নিজেকে চিনে নেওয়ার গল্প। দায়িত্ব নিতে নিতে শিক্ষার্থীরা টের পায় নিজের ভেতরের শক্তি, লুকিয়ে থাকা ক্ষমতাগুলো।  নিজের প্রয়োজন আর সাধের মাঝে ভারসাম্য রাখা, ঠিক কোনটুকু জরুরি আর কোনটুকু সাময়িক আনন্দের জন্য, তা বুঝে চলার শিক্ষা এখান থেকেই শুরু হয়। এই সময়েই জীবনের সামনে ভেসে ওঠে সাধ আর সাধ্যের মাঝের সেই সূক্ষ্ম সীমারেখা। সীমারেখাটা প্রথমে কষ্টের মনে হয়, কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝতে শেখা যায়, এটিই তো দায়িত্বশীলতার আসল শিক্ষা। এভাবে ধীরে ধীরে এই কষ্টার্জিত উপার্জন শুধু অর্থ নয়, জীবনের শিক্ষা হয়ে ওঠে। সে শিক্ষা বলে, "জীবন অনেক কিছু চায়, কিন্তু সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া যায় না।" এখানে শুরু হয় প্রাপ্তি আর ত্যাগের সমীকরণ। আর এই সমীকরণের অঙ্কটাই তো একদিন বড় কোনো স্বপ্নের ভিত্তি গড়ে দেয়। এই ঢাকায় লড়াই আছে, সংগ্রাম আছে, কষ্ট আছে। কিন্তু আছে শিখতে পারার এক অসীম সুযোগ। এই শহর কখনও কারও জন্য থেমে থাকে না। নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়, লড়াই করতে হয় নিজের সঙ্গে, বাস্তবতার সঙ্গে, আর কখনও কখনও ভাগ্যের সঙ্গে। কিন্তু দিনশেষে, যখন কোনো এক সন্ধ্যায় টিউশন শেষ করে ফিরে আসে ক্লান্ত ছাত্রটি, তার মুখে ফুটে ওঠা ছোট্ট এক তৃপ্তির হাসি বলে দেয়, "কষ্ট সার্থক।" 

ঢাকা শুধু স্বপ্নের শহর নয়, এটি দায়িত্ব নিতে শেখার শহর। এখানে প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি পাঠশালা। প্রতিটি গল্প, প্রতিটি অভিজ্ঞতা যেন জীবনের এক একটি অধ্যায় হয়ে যায়। এখানে স্বপ্নরা মেলে ডানা, কিন্তু সেই ডানার ভার বহনের যোগ্যতাও শেখায় এই শহর। সাধ্যের সীমা ছাড়িয়ে, সাধের আকাশে উড়তে শেখার জন্য যে লড়াই করতে হয়, তার প্রতিটি ধাপেই ঢাকা জাগিয়ে তোলে আত্মবিশ্বাস।

সাধারণের ভিড় থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার জন্য যে অধ্যবসায় দরকার, তা ঢাকার রোদ-জল, কোলাহল আর চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়। এই শহর শুধু স্বপ্ন দেখায় না, স্বপ্ন পূরণের পথ দেখায়—সেই পথে লড়াই করার সাহস জোগায়। প্রতিটি বাঁধা পেরিয়ে একদিন যে গল্প তৈরি হয়, তা কেবল একজন ব্যক্তির নয়, পুরো জীবনের জয়গাথা হয়ে ওঠে।

এ এস এম রাফাদ আজগর, গবেষণা সহযোগী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x