Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জেন-জি বিপ্লব

দীর্ঘদিনের দাসত্বের শেকল থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছে এই প্রজন্ম

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৩:৫৯ পিএম

ছাত্র জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে গত ৫ আগস্ট দেশ ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। এই আন্দোলনকে আমরা বিভিন্ন আকর্ষণীয় নামকরণের চেষ্টা করছি; অনেকেই এটিকে “মনসুন বিপ্লব” কিংবা “জুলাই বিপ্লব” নামে অভিহিত করছেন। অন্যদিকে, ৫ আগস্টকে বলা হচ্ছে ৩৬ জুলাই। এছাড়াও আরও বিভিন্ন নামকরণ আমরা দেখেছি। তবে এসবের বাইরে গিয়ে এই বিপ্লবে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে সেটি হলো; জেনারেশন জেডের (জেন-জি) তরুণ-তরুণীরা যেভাবে এই আন্দোলন গড়ে তুললো এবং তাতে নেতৃত্ব দিলো।

তবে তার মানে এই নয় যে, সব বয়সের মানুষ বিপ্লবকে সমর্থন জানিয়ে রাজপথে নামেননি। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে আগস্টের প্রথম দিকে এটি একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। যেখানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব বয়সের এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। তাদের একটাই দাবি- শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে এবং তার অপরাধের জন্য তাকে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

তবে এটি অনিবার্য সত্য এবং আলাদাভাবে স্বীকার করতেই হবে যে, এই আন্দোলনে তরুণরাই প্রাণভোমরা ছিল এবং থাকবে।

সারাবিশ্ব আজ বাংলাদেশকে দেখছে, এখানে কী ঘটছে তা তারা বোঝার চেষ্টা করছে; আমি মনে করি এটিই বিপ্লবের বড় অর্জন।

বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা অনেকটা উদাসীন, কিংবা তারা অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়, উন্নত জীবনের জন্য ত্যাগ বা কঠোর পরিশ্রম করতে আগ্রহী নয়; বিশ্বজুড়ে এমন সমালোচনা রয়েছে। তবে আমি নিশ্চিত নয় যে, এই সমালোচনাটি বিশ্বের কোথায় কতটা কার্যকর। তবে এটি বাংলাদেশে তরুণদের ক্ষেত্রে যে প্রযোজ্য নয়, সেটি এক বাক্যেই বলে দেওয়া যায়। বাংলাদেশের নাগরিকরা আজ যে স্বাধীনতা ভোগ করছে তা তরুণদের হাত ধরেই এসেছে।

খুব সহজ সত্য হলো; জেনারেশন জেড জাতির জন্য যা করেছে আমরা বয়স্করা সেটি করতে পারিনি। তারা আমাদের নিপীড়ন আর দাসত্বের শেকল থেকে মুক্ত করেছে।

তরুণ প্রজন্মের সাফল্য এবং আমাদের প্রজন্মের ব্যর্থতার কারণ শনাক্ত করা কোনো কঠিন কাজ নয়। দিন শেষে আমরা ভাগ্যের হাতেই নিজেদের সমর্পণ করি। আমাদের প্রজন্মের কাছে একটি হতাশাজনক বাক্য প্রচলিত ছিল, “এটাই বাংলাদেশ”, অর্থাৎ বাংলাদেশে আমরা এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করতে পারি না।

গত ১৫ বছর ধরে, প্রকৃতপক্ষে ৫২ বছর ধরেই অনেক উপায়ে- আমরা শান্তির খোঁজ করেছি; কিন্তু তা অর্জন করতে পারিনি। আমরা কেবল আমাদের চারপাশের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছি। যেটা আমাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয় সেটিকেও মেনে নিয়েছি; ছোট-বড় দুর্নীতি, নিরাপরাধ মানুষের কারাবাস, অযোগ্য লোকের নেতৃত্বসহ আমাদের সমস্ত দুর্দশার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল সরকার। ভালো মানুষের পক্ষে ক্ষমতায় আরোহণ অসম্ভব বলেই ভেবে নেওয়া হয়েছিল।

ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং সাধারণ জনতার সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, এই বিপ্লবের নৈতিক ভিত্তি ছিল হাসিনার দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাতে বাংলাদেশের মানুষ তাদের নৈতিক ও মৌলিক অধিকার সঠিকভাবে ভোগ করতে পারে।

জেনারেশন জেড বুঝতে পেরেছিল যে বাংলাদেশ সঠিকপথে এগোচ্ছে না; তবে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশকে সঠিকভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। এই প্রজন্ম বুঝতে পেরেছিল, দেশে যা হচ্ছিল তার সবকিছুই ভুল হচ্ছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল; তারা একটি অন্ধকূপে বাস করছিল, তাদের এখান থেকে বাঁচতে হলে সবকিছুর পরিবর্তন করতে হবে এবং সেই পরিবর্তন এখনই করতে হবে।

জেন-জি বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রশ্নগুলো ছিল- কেন দেশ এমন হবে? কেন আমাদের এমন একটি দেশে বাস করতে হবে যেখানে দুর্নীতি, অসততা, নিষ্ঠুরতা এবং সর্বোচ্চ দৈন্যতার রাজত্ব?

কেন আমরা এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারি না যেটি দেশের নাগরিকদের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে এবং তার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর যা যা করা দরকার তা করবে? কেন এমন একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করা হবে না, যেখানে সব নাগরিকের কল্যাণ নিশ্চিত হয়? বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষ জন্মগতভাবে যেসব নাগরিক সুবিধা পেয়ে থাকে বাংলাদেশের নাগরিকরা কি তাদের মতো তেমন সুবিধা পেতে পারে না? 

আমরা পুরোনো প্রজেন্মের মানুষের কীভাবে জীবনযাপন করেছি, কী ধরনের অত্যাচার সহ্য করেছি; সেটা আমরা প্রকাশে আগ্রহী ছিলাম না। আমরা ভেবেছি; রাষ্ট্র আমাদের যতটুকু দিচ্ছে ততটুকুই যথেষ্ট। আমরা ভেবে নিয়েছি, উন্নত বিশ্বের দেশের মতো ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র- যেখানে মানুষের সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে; সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তেমনভাবে রুপান্তর সম্ভব নয়।

কিন্তু জেন-জি’রা আমাদের সেই ভাবনাকে “না” বলে দিলো। তারা এই গতানুগতিক “মেনে নেওয়ার” অচলায়তন ভেঙে দিলো। তারা মাথা উঁচু করে বললো, এর চেয়েও ভালো বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব।

তবে আমরা এটিও লক্ষ্য করছি যে, বিপ্লবের পর যত দিন যাচ্ছে আমাদের মধ্যে নতুন বাংলাদেশে পদার্পন নিয়ে নতুন নতুন সংশয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও এই পরিস্থিতিতে সংশয়বাদ ও সতর্কতা হচ্ছে সব থেকে বড় হাতিয়ার, তবুও মনে রাখতে হবে; যা অর্জিত হয়েছে এবং যেভাবে অর্জিত হয়েছে তার পুরো কৃতিত্ব এই প্রজন্মকে দিতে হবে।

যেটি কেউ করতে পারেনি, এই প্রজন্ম তথা জেন-জি সেটি করেছে, তাদের মধ্যে সংগ্রাম করার মানসিকতা রয়েছে। তারা যা চায় সেটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী; আর সে কারণেই অতীতের নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে মুক্ত নতুন এক বাংলাদেশে আমরা বাস করছি।

আমরা এখনও জানি না ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী নিয়ে আসবে, তবে আমরা সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছি যেটি এত বছর ধরে আমাদের দাস করে রেখেছিল। তবে এখন পর্যন্ত যেটি আমারা পেয়েছি, সেটি কোনোভাবেই ছোট কোনো অর্জন নয়।

জাফর সোবহান, সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন।
   

About

Popular Links

x