অম্লান ১৯ মে’র যে ভাষা আন্দোলন ‌‘আমার বোনের রক্তে রাঙানো’

আমাদের একুশ সারা বিশ্বের একুশ হয়ে ৭০ বছর অতিক্রান্ত করলো এবার। ভাষার নামেই আমাদের দেশ। আমরা রক্ত দিয়ে ভাষা পেয়েছি। তার ধারাবাহিকতায় রক্ত দিয়ে দেশ পেয়েছি। এর কোনোটিই কারও দানে পাওয়া নয়।

একেক মানুষের উপলব্ধি, প্রাপ্তি ভিন্ন। আমি পেয়েছিলাম পিংক ফ্লয়েডের “কিপ টকিং” গানে। যেখানে শুরুতে প্রয়াত কিংবদন্তি বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের একটি অডিও ক্লিপ ব্যবহৃত হয়। হকিং সেখানে বলেছিলেন,

“For millions of years mankind lived just like the animals

Then something happened which unleashed the power of our imagination. We learned to talk”

তাই “আম্মা” ডাকতে ভালো লাগে। বন্ধুদের আড্ডায় ছুটন্ত বাক্যমালা ভালো লাগে। কিছু লিখতে বসে শব্দের পর শব্দ সাজাতে ভালো লাগে। বেশি সময়ের জন্য নৈঃশব্দ আমরা নিতে পারি না। “কুন” বলি আর “ওম” বলি ধ্বনি বিস্ফোরণই মহাবিশ্বের আদিমতম ঘটনা। আমরা তাই শব্দের গভীরে ঢুকে নিজের ভাষাকে খুঁজে নিতে ভালোবাসি।

ভালোবাসার এই ভাষা এখন বিস্তৃত বিশ্বময়। ভাষাভিত্তিক গবেষণা ওয়েবসাইট এথনোলগ থেকে জানতে পাই, পৃথিবীজুড়ে মোট বাংলাভাষীদের সংখ্যা এখন প্রায় ৩০ কোটির কাছাকাছি। ক্রমিক সংখ্যায় সারা বিশ্বের ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা এখন পঞ্চম। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩% মানুষ এ ভাষায় কথা বলে।

সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, শুধু বাংলাদেশেই বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খন্ড, ওডিশা, আন্দামান-নিকোবর, ধানবাদ, মানভূম, সাঁওতাল পরগনা প্রভৃতি এলাকায়ও বাংলার প্রচলন আছে। এর বাইরে নেপাল, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইতালি ইত্যাদি দেশে অসংখ্য বাংলাভাষী অভিবাসী ও প্রবাসী আছেন।

আমাদের বাংলা এখন শুধু ঢাকা বা কলকাতায় আবদ্ধ নয়।

তবে আজকের দিন ১৯ মে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। ১৯৬১ সালে এ দিনে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন সীমান্ত পাড়ের আসামের ভাষা সংগ্রামীরা। ২১ ফেব্রুয়ারির মতোই দ্যুতিময় এই বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন।

মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে সেদিন ফুঁসে উঠেছিল আসাম সংগৃহীত

বরাকের বাঙালিরা প্রথম থেকেই অসমিয়াদের নিপীড়নের শিকার। ১৯৬০ সালে অসম প্রদেশ কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয় সে রাজ্যে শুধু অসমিয়া ভাষাই সরকারি স্বীকৃতি পাবে। বরাকের বাঙালিরা এর প্রতিবাদ করেন। আমাদের দেখানো পথে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে পুরো বরাকজুড়ে শুরু হয় আন্দোলন। 

পাকিস্তানি কায়দায় এ আন্দোলনকে গুরুত্ব না দিয়ে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী বিমল প্রসাদ চালিহা ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর বিধানসভায় বিল আনেন, “একমাত্র অসমিয়া ভাষাই পাবে সরকারি স্বীকৃতি।”

যেন এক ঝড় শুরু হয় বরাক উপত্যকায়। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় কাছাড় গণসংগ্রাম কমিটি। বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন পায় অন্য মাত্রা। 

১৪ এপ্রিল বরাকের কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে পালিত হয় “সংকল্প দিবস”। ১৩ এপ্রিল গণসংগ্রাম কমিটির নেতা রবীন্দ্রনাথ সেন ১৯ মে ১২ ঘণ্টার হরতালের ডাক দেন।

বাঙালিদের এ আন্দোলন দমনে কোনো চেষ্টাই বাদ রাখে না সরকার। পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী দিয়ে আন্দোলন দমানোর তৎপরতা চলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রাজ্যের অভ্যন্তরীন বিষয়-এমন বলে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। 

১৯ মে’র আগে নিরাপত্তা বাহিনীতে ছেয়ে যায় বরাক উপত্যকা। ১২ মে থেকেই সেনা কমান্ডে পরিচালিত আসাম রাইফেলসের জওয়ানেরা শুরু করে ফ্ল্যাগ মার্চ। ১৮ মে গ্রেপ্তার হন রবীন্দ্রনাথ সেন, নলিনীকান্ত দাশ, বিধুভূষণ চৌধুরীসহ ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা।

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের শহীদরা সংগৃহীত

অবশেষে আসে আমাদের ৮ ফাল্গুনের মতো সূর্যপ্রভা দিন ১৯ মে। এদিন অহিংস হরতালে চলে আক্রমণ। পিকেটারদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্যান্য জায়গার মতো শিলচরের তারাপুর রেলস্টেশনেও শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছিল কর্মসূচি। 

সেদিন স্থানীয় সময় বেলা ২টা ৩৫ মিনিট নাগাদ বিনা প্ররোচনায় নিরাপত্তারক্ষীরা ১৭ রাউন্ড গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন নয়জন ভাষাসৈনিক। পরে আরও দুজন শহীদ হন। আহত হন আরও একজন। ৫২'র পর আবার মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দেয় বাঙালি। 

আমাদের শহীদ সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারের মতোই মহাকাল মনে রাখবে শহীদ কমলা ভট্টাচার্য, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হীতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকমল পুরকায়স্থ। এই আত্মদান ও আন্দোলনের পর বাংলা ভাষা বরাকে সরকারি ভাষা হিসেবে মর্যাদা পায়।

নিপীড়ক গোষ্ঠী কোনো কাঁটাতার ঘেরা সীমান্ত মানে না। আবার মজলুমও তাই সব সময় হয় দেশহীন। বরাকের ভাষা আন্দোলন আমাদের সে শিক্ষাই দেয়।  

এর আরেক তাৎপর্য হচ্ছে, সেখানে ভাষার দাবিতে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন একজন নারী। কমলা ভট্টাচার্য আখ্যায়িত হয়ে থাকেন মাতৃভাষার লড়াইয়ে বিশ্বের প্রথম নারী শহীদ হিসেবে। অল্প বয়সী কিশোরীই বলা যায় তাকে। গুলিতে প্রাণ হারানোর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৬। সবে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েই ভাষা আন্দোলনে কমলার ঝাঁপিয়ে পড়া। বাবা হারা এই কিশোরী বড় ভাই রামরমণ ভট্টাচার্যের সাথে শিলচর শহরে থাকতেন। তার পরিবার ১৯৫০ সালে সিলেট ছেড়ে কাছাড়ে চলে আসে। তিন বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে কমলা ছিলেন তৃতীয়।

মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় মায়ের জাত কখনো পিছিয়ে থাকেনি। লড়াইয়ের ইতিহাসও তাই শুধু পৌরুষত্বময় নয়। ভাষা আন্দোলনে নারীর গৌরব গাঁথার এক অনন্য দৃষ্টান্ত শহীদ কমলা ভট্টাচার্য। জবানের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” . . .ই শেষ গান নয়। এ ভাষা সিক্ত হয়েছে আমার বোনের রাঙানো রক্তেও। ১৯ মে এক নক্ষত্রপ্রভা দিন হয়ে এ সত্যকে মনে করায়।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।