Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

উপেক্ষিত বাংলা টাইপোগ্রাফি

পাণ্ডুলিপি প্রকাশের জন্য দরকার সুন্দর লিপি। আর ছাপাখানার জন্য চাই কাঠ বা ধাতব অক্ষর। নতুন মাধ্যমের জন্যই এ নতুন চাওয়া। কাঠ বা ধাতু খোদাইয়ের আদলে ছাঁচে ঢালা বর্ণমালা। এ নান্দনিকতার নামই টাইপোগ্রাফি। ছাপার অক্ষরে নান্দনিক শৈলীর অন্য নাম টাইপোগ্রাফি

আপডেট : ২৬ মে ২০২২, ১২:২১ পিএম

ইতিহাসকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন তিনি। এক অংশে যার রাখা যায় মুদ্রিত পর্ব। আরেক দিকে অমুদ্রিত সব। গুটেনবার্গের কীর্তি এমনই অবিনশ্বর। ছাপাখানা আবিষ্কার করে তিনি সভ্যতার বাঁক বদলে দিয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী গুটেনবার্গের সংকল্প ছিল বাইবেল পৌঁছে দেবেন সবার ঘরে। তাতে অনেক দূর সফলও হয়েছিলেন। তার ছাপাখানায় মুদ্রিত বাইবেল অনেকের হাতে পৌঁছে।

ধর্মীয় গণ্ডির বাইরেও সভ্যতার বাতিঘর হিসেবে বিবেচিত হয় তাই গুটেনবার্গ ও তার ছাপাখানা। কারণ ইতিহাসের একটি পর্বে শুধু ক্ষমতাবানরাই অক্ষরপাঠের অধিকারপ্রাপ্ত ছিলেন। ছাপাখানা আবিষ্কার তছনছ করে দেয় সে ধারণাকে। জ্ঞান-কাঠামো উন্মুক্ত হয়। গুটেনবার্গের নিজের দেশ জার্মানি ছেড়ে তা বিস্তৃত হয়। সীমানা পাড়ি দেয় ছোট্ট ওয়ার্কশপ ছেড়ে। অবোধ্য বর্ণমালার মধ্যে লুকিয়ে থাকা জ্ঞান পৌঁছে যায় মগজ থেকে মগজে। চতুর্দশ শতকের এ আবিষ্কার তাই সময় পেরিয়ে কালজয়ী। পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের কাছে আধুনিক সভ্যতা নির্মাণের কারিগর হিসেবে বিবেচিত হন গুটেনবার্গ।

আবিষ্কারমাত্রই ছাপাখানার প্রসার ঘটেছিল ব্যাপক বেগে। ১৪৫৪ সালের গুটেনবার্গের জার্মানির ছাপাখানা ইতালিতে আসে ১৪৬৫ সালে। এরপর সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে ১৪৬৮, ফ্রান্সে ১৪৭০, হল্যান্ডে ১৪৭৩ ও স্পেনে ১৪৭৪ সালে। বিস্ময়করভাবে ইংল্যান্ডে আরও পরে ১৪৭৬ সালে।

ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসনের অধীনে আসার পর নানা যন্ত্রে সয়লাব হয়। স্থানীয় মানুষের ভাষায় এ যন্ত্র “কল”। পাটের কল, ময়দার কল, কাপড়ের কল, পানি তোলার কল। সঙ্গে ছিল যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো রেল। এ সুতায় ভারতবর্ষ গ্রন্থিত যে পথের সূচনায়।

কিন্তু এত যন্ত্রের উপস্থিতিতেও দৈন্যতা ছিল। যদি না থাকে সবচেয়ে কাজের যন্ত্রটি। তাই এমন কথা ভারতবর্ষজুড়ে অনেকে বলতেন। তা হলো, “যে দেশে ছাপার কর্ম চলিত না হয়েছে, সে দেশকে প্রকৃত সভ্য রূপে যায় না।”

১২৮৪ বঙ্গাব্দে “নববার্ষিকী” নামে একটি বাংলা সাময়িকপত্রে লেখা হয়েছিল, “বহুকাল পূর্বে ভারতবর্ষে যে মুদ্রণযন্ত্র ছিল, তাহার একটি প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। ওয়ারেন হেস্টিংস শাসনকালীন তিনি দেখিতে পান যে, বারানসী জেলার এক স্থলে মৃত্তিকার কিছু নিচে পশমের ন্যায় আশাল একরূপ পদার্থের একটি স্তর রহিয়াছে। . . .”

নববার্ষিকী পত্রিকার এ হঠকারিতার জবাব আবার দেয় আরেকটি সাময়িকপত্র “বঙ্গদর্শন”। তারা লিখেছিল, “সংগ্রহকার এ খবর কোথায় পাইয়াছেন তাহা বিশেষ করিয়া লিখিলে ভালো হইত। না লেখায় এই পরিচয় অনেকের কাছে গ্রাহ্য হইবে না।”

অর্থাৎ সত্যিকার অর্থেই ছাপাখানাহীনতা এক বড় ধরনের দুর্বলতা। আর তা ঢেকে জাতির গৌরবগাথার মিথ্যা ঐতিহ্য তুলে ধরতে উদগ্রীব অনেকে।

স্বীকৃত ইতিহাসমাফিক এ দেশে ছাপাখানার প্রবর্তক পর্তুগিজরা। গোয়ায় তাদের প্রথম ছাপার যন্ত্র জাহাজ থেকে নামে ১৫৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর।

১৭৭৮ সালে হুগলির ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয় ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হলহেডের “গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ”। বইটি ইংরেজি ভাষায় মুদ্রিত। কিন্তু এর পাতায় পাতায় ছিল কৃত্তিবাস রামায়ণ, কাশীবাসী মহাভারত আর ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরের উদ্ধৃতি। ছাপার অক্ষরে নিজ ভূমিকে সেই প্রথম বাংলার জন্ম। যদিও এর আগে বাংলা হরফের হয়েছিল ভিন দেশে জন্মের অভিজ্ঞতা। পর্তুগালের লিসবনে একসঙ্গে তিনটি বই মুদ্রিত হয় ১৭৪৩ সালে।

বর্ণমালা আবিষ্কারের পর নানাভাবে লিখনচর্চা শুরু করে মানুষ। কাগজ আবিষ্কারের আগে অনেক কিছু হয়েছিল মানুষের লেখার অবলম্বন। গাছের পাতা, চামড়া খণ্ড, পাথরসহ নানা কিছুতে লিখত মানুষ। খ্রিস্টপূর্ব সময়ে কাগজ আবিষ্কার বদলে দেয় পুরনো প্রথা। এর অনেক পর ছাপাখানা বদলে দেয় সব কিছু।

াণ্ডুলিপি প্রকাশের জন্য দরকার সুন্দর লিপি। আর ছাপাখানার জন্য চাই কাঠ বা ধাতব অক্ষর। নতুন মাধ্যমের জন্যই এ নতুন চাওয়া। কাঠ বা ধাতু খোদাইয়ের আদলে ছাঁচে ঢালা বর্ণমালা। এ নান্দনিকতার নামই টাইপোগ্রাফি। ছাপার অক্ষরে নান্দনিক শৈলীর অন্য নাম টাইপোগ্রাফি। 

যেখানেই অক্ষরের ব্যবহার আছে, সেখানেই টাইপোগ্রাফি এক শিল্প। সেটি যেমন মুদ্রণের বেলায়, তেমনি অন্য ভিজুয়ালের বেলাও তাই। অনলাইন, প্রিন্ট, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন সবখানেই আছে টাইপোগ্রাফির গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ।

ইংরেজি বা অন্য ভাষায় নানা ধরনের টাইপোগ্রাফি থাকলেও ইদানিং বাংলা মুদ্রণ মানেই একঘেঁয়ে টাইপোগ্রাফি। যদিও বাংলা ভাষায় মুদ্রণ শুরু হয়েছিল অসাধারণ টাইপোগ্রাফি দিয়ে।

বলতে হবে একজন পঞ্চানন সরকারের কথা। তিনি নেপথ্যে কাজ করতেন। নেপথ্যেই তিনি ইতিহাসখ্যাত। বাংলা টাইপোগ্রাফির অনিন্দ্য কারিগর হিসেবে বিবেচিত এই পঞ্চানন সরকার। হ্যালহেডের বইয়ে ছাপার হরফের ছাঁচ তৈরিতে সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন পঞ্চানন। হুগলির পর বাংলা বই ছাপার কেন্দ্র সরে এলো শ্রীরামপুরে। সেখানেই বাংলা মুদ্রণে পঞ্চানন হয়ে ওঠেন উজ্জ্বল নক্ষত্র।

প্রথম বাংলায় মুদ্রণের জন্য নন্দিত উইলিয়াম কেরির বাইবেলের হরফের নকশা করেছিলেন এ পঞ্চানন সরকার। তার হস্তশৈলীর ওপর ভর করে শ্রীরামপুরে গড়ে ওঠে ব্যবসা সফল ছাপাখানা শিল্প। শুধু বই নয়, তিনি সক্রিয় ছিলেন প্রথম যুগের বাংলা বিজ্ঞাপন তৈরিতেও। পঞ্চাননের হাত ধরে এ পেশায় আসেন তার জামাতা মনোহর। পঞ্চানন সরকারের মৃত্যুর পর এই মনোহর দায়িত্ব নেন শ্রীরামপুর ছাপাখানার। ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি তৈরি করেন বাংলা হরফের নানা শৈলী। মনোহরের ছেলে কৃষ্ণচন্দ্র আসেন এরপর বাবার পেশায়। বাংলা মুদ্রণশিল্পে নেপথ্যে থেকে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এই পুরো পঞ্চানন পরিবার।

নানা বর্ণাঢ্য কায়দায় বাংলা অক্ষর লেখার প্রচলন ছিল চলে যাওয়া খুব নিকট সময়েও। সত্যজিৎ রায় ছিলেন প্রাণবন্ত। নিজের বই, নিজের চলচ্চিত্রে একাই বাংলা টাইপোগ্রাফিকে তিনি নিয়ে গেছেন এক অন্য উচ্চতায়।

গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগে এ নিয়ে কাজের সুযোগ থাকলেও অজ্ঞাত কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টাইপোগ্রাফিচর্চা অবহেলিত হয়েছে এ দেশে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত শিল্পীদের হাতে বাংলা চলচ্চিত্রের ব্যানার অঙ্কন বিবেচিত হয়েছে অনবদ্য এক শিল্প হিসেবে। একই ধরনের শিল্পীদের আঁকা ট্রাক পেইন্টিং, রিকশা পেইন্টিংও বিবেচিত হয় শিল্পকর্ম হিসেবে, যাতে মাত্র কয়েক বছর আগেও বাংলা টাইপোগ্রাফিতে নতুন স্রোত সৃষ্টি হতো। 

এখন এ চিত্র বদলে গেছে। ডিজিটাল ব্যানার আজকের দিনে সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। হাতের কাজ এখন বলতে গেলে অদৃশ্য।

অ্যাপল সম্পর্কে একটি ধারণা অ্যাপলের লোগোতেই পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রচলিত ব্র্যান্ডের এমন হওয়া স্বপ্নের মতো। ব্র্যান্ড লোগোর উদ্দেশ্য প্রথম দর্শনেই পণ্য বা সেবা সম্পর্কে একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। দেশি ব্র্যান্ডগুলো এ বিষয়ে উদাসীন।

নতুন সময়ে বাংলা অক্ষরের প্রকৃতি আসলে কী ধরনের হবে, তার জন্য এখনই গবেষণা ও উদ্যোগ জরুরি। রক্তে পাওয়া ভাষার এমন দীনতার অবসান ঘটানো এখনের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।

তথ্যসূত্র :

] যখন ছাপাখানা এলো, শ্রীপান্থ

] আমার বর্ণমালা ও সমসাময়িক বাংলা টাইপোগ্রাফি, মোহাম্মদ নাজিম-উদ-দৌলা


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x