একের পর এক মৃত্যুর প্রহর তখন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি তীব্রতম। চলছিল হোম অফিস। সকালে ঘুম ভাঙলে কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়াতাম। আম্মাকে জাগাতাম না।
দেখতাম একটার পর একটা রিকশা ভ্যান যাচ্ছে। গন্তব্য মিরপুর ১। সেখানে পাইকারি বাজার। তরকারি নিয়ে ভ্যানগুলো ফিরতো ৮টা/৯টার দিকে। পুরো পথেই বিক্রি করতে করতে চলতো এই সবজির ভ্যানগুলো।
তখনও সবজি হাতের নাগালে। কাগজি লেবুর হালি ১০ টাকা ছিল। এখন তা ৩০-৪০ টাকা। ১০টার দিক থেকে আসতো ডিমওয়ালারা। তারাও ভ্যানে। ডিমের ডজন ছিল ১০০ টাকা। এখন তা বেড়ে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। করোনার সময় মনে হতো, কৃষক আর খামারিদের কারণে খেয়ে পড়ে বাঁচা যাচ্ছে। যদিও পত্রিকায় খবর ছিল, করোনাভাইরাসে গার্মেন্টস খাতের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি। করোনাভাইরাসের মধ্যেই আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় আমপান। আজন্ম লড়াকু কৃষকরা আবার ঘুরে দাঁড়ান। সরকারের পরোয়া করেন না তারা। প্রণোদনা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায় না। শস্যের শিল্পীরা এ নিয়ে ভাবেনও না। বর্ষা, রোদ নির্বিশেষে তারা ফসল ফলান। যুগের পর যুগ এই তাদের জীবন।
১১টার দিকে আসতো মুরগিওয়ালারা। মহল্লার কুকুরগুলো তখন ঘিরে মুরগির ভ্যান। সেখানে থেকে তাদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় মুরগির উচ্ছিষ্ট। এতে কুকুররা একটু আমিষ পায়। মন্দ কী? সাধারণত পাড়ার কুকুরদের খাবার চায়ের টঙ দোকান থেকে আসে। কেউ বিস্কুট ছুঁড়ে দেয়। কেউ একটা টোস্ট। এরকমই। করোনাভাইরাসের আর্বিভাবের পর থেকে টঙ দোকানগুলো বন্ধ ছিল। কুকুরদের অনেক কষ্ট গেছে সে সময়টায়। কিন্তু আবার নিজের চোখে দেখেছি অনেক স্বেচ্ছাসেবী রাস্তার কুকুরদের খাওয়াচ্ছেন। দুঃসময়ে প্রাণের জন্য তাদের এই ঋণ অশোধ্য।
আমাদের এলাকায় বেশ কয়েকটা স্কুল। করোনাভাইরাসের আগে সকালে রাস্তায় জ্যাম লেগে যেত। যত না বাচ্চা, তার চেয়ে বেশি গার্ডিয়ান। তাদের অধিকাংশেরই গাড়ি আছে। বিশেষ করে মায়েরা স্কুলের সামনে বেশি বসে থাকতেন। তখন রাস্তায় বাজার বসে যেত। করোনার প্রকোপ বাড়ার পর স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। গাড়িওয়ালা পরিবারগুলো তাতে বোধহয় তেমন কিছু আসে যায়নি। কিন্তু সেই বাজার বসানো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন কোথায় আছেন জানি না।
কন্সট্রাকশনের কাজ চলছিলো সামনের একটা প্লটে। ওখানের মেশিনে তীব্র শব্দ। দোতলা বাড়ি ভেঙে বিপুল উদ্যোমে দশতলা অ্যাপার্টমেন্ট উঠছে। এভাবেই পুরো মহল্লাটা বদলেছে। বাড়ি, রাস্তা কিছুই আগের মতো নেই। অপরূপ বিল, ঝিল, নদীর মিরপুরকে এখন চেনা যায় না। এর পরতে পরতে এখন কংক্রিট।
করোনাভাইরাসের সময় অনেক দিন বোটানিক্যাল গার্ডেন বন্ধ ছিল। এখন খুলেছে। সকালে অনেক মানুষ হাঁটতে যান সেখানে। একটা বিষয় দেখেছি, শহরের সকালটা যেন শুধু বৃদ্ধদের। ঢাকার সকাল এক কথায় ডায়াবেটিক রোগীময়। তরুণরা সারারাত ফেসবুক, নেটফ্লিক্স দেখেন। তাদের ঘুম ভাঙে অনেক দেরিতে। ব্যতিক্রম নেই তা নয়। কেউ সাইক্লিং করেন। তবে তাদের সংখ্যা কম।
মেট্রোরেলের কাজ শুরু পর মিরপুরের ভেতরের রাস্তাগুলো ঠিক করা হয়। সেই সঙ্গে ফুটপাত। যাতে প্রধান সড়কের ওপর চাপ কমে। কিন্তু জোড়াতালির কাজে যা হয়...। রাস্তাগুলোতে নিম্নমানের কার্পেটিং আর ফুটপাত রাস্তার চেয়ে বেশ উঁচুতে। জানি না এই শহরের নগর পরিকল্পনা কারা করেন! এমন ফুটপাত শিশু ও বয়স্কদের ব্যবহার উপযোগী নয়। আর অনেক গাছও কাঁটা পড়েছে এই ফুটপাতের কারণে। এখন গাছ লাগানোর জায়গা রাখা হয়েছে ফুটপাতে। কিন্তু গাছ লাগাবে কে? বাড়ির মালিক? না সিটি করপোরেশন? এ নিয়ে নির্দেশনা কী জানি না। গাছের জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে।
একটা বাসযোগ্য শহরের জন্য অনেক লড়াই করতে হবে আমাদের। মহল্লার কমিউনিটিকে শক্তিশালী হতে হবে। টেন্ডার লোভী সিটি করপোরেশন কেন্দ্রিক "উন্নয়ন" এর ভরসায় থাকলে কিছু হবে না। সামাজিক শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। যেমন ছিল আমাদের ছোটবেলায়। ছিল সংগঠন ও ক্লাব কালচার। পুরনো শহরে পঞ্চায়েত। দিনে দিনে যা আমরা হারিয়েছি। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে। শীর্ণ হয়েছে সামাজিক শক্তি। এর রূপান্তর চাই।
আমরা তো মনেহয় কেউই লাস ভেগাস টাইপ কিছু চাই না। একটা দম নেবার শহর চাই। যেখানে বাতাসে তির তির কাঁপবে গাছের পাতা এমন শহর চাই। খুব কি বেশি এই চাওয়া?
লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।