Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ইটভাটা

বাংলাদেশে ইট প্রস্তুতে এখনও পুরনো অদক্ষ পদ্ধতি ও জ্বালানি হিসেবে অধিক সালফারযুক্ত নিম্নমানের কয়লা এবং জ্বালানি কাঠ ব্যবহৃত হয়। তাই এসব ভাটা থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ নানা ধরনের বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হচ্ছে

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২২, ০৫:০৭ পিএম

নির্মাণশিল্পের অন্যতম উপাদান ইট। দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে ইটের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশেও বর্তমানে ইটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, দেশে ইটভাটার বর্তমান সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৯৩০। বার্ষিক উৎপাদিত ইটের পরিমাণ প্রায় ১৭.২ বিলিয়ন। এই ইট তৈরিতে প্রায় ১২৭ কোটি ঘনফুট মাটির দরকার হয়।

বাংলাদেশে ইট প্রস্তুতে এখনও পুরনো অদক্ষ পদ্ধতি ও জ্বালানি হিসেবে অধিক সালফারযুক্ত নিম্নমানের কয়লা এবং জ্বালানি কাঠ ব্যবহৃত হয়। তাই এসব ভাটা থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ নানা ধরনের বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হচ্ছে। ইটভাটা সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে পরিচালিত হয়, যখন বৃষ্টিপাত এবং বাতাসের গতিবেগ কম থাকে, যা বায়ুদূষণের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নগর অঞ্চলে শীতকালে অধিক বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হলো ইটভাটার ধোঁয়া।

বাংলাদেশে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন’’ এবং এ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন রহিত হয়।

কৃষিজমি, পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে ইট তৈরির জন্য মজা পুকুর, খাল, বিল, খাঁড়ি, দীঘি, নদ-নদী, হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চল বা পতিত জায়গা হতে মাটি সংগ্রহ করা যাবে।

মাটির ব্যবহার কমানোর জন্য কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ফাঁপা ইট (Hollow Brick) তৈরি করতে হবে।

জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা যাবে না এবং নির্ধারিত মাণমাত্রার কয়লা ব্যবহার করতে হবে।

জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতীত কেউ ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করতে পারবে না, তবে কংক্রিট কমপ্রেসড ব্লক (কংক্রিট, বালি ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি) ইট প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে লাইসেন্সের প্রয়োজন হবে না।

এ আইনে আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষিজমি, ডিগ্রেডেড এয়ার শেড এবং প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয় এবং নিষিদ্ধ এলাকার সীমারেখা থেকে নূন্যতম এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেও ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া, সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোনো পাহাড় বা টিলার উপরিভাগে বা ঢালে বা তার আশপাশে কোনো ইটভাটা বসানো যাবে না। এক্ষেত্রে পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে আধা কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না।

২০১৪ সালের ১ জুলাই থেকে আইনটি কার্যকর হয়। আইনের কার্যকারিতার পর আরও দুই বছর সময় দেয়া হয়েছে বিদ্যমান ইটভাটাগুলোকে যথাস্থানে স্থানান্তর করে আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তরের জন্য। ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের এক যুগান্তকারী রায়ের ভিত্তিতে পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার চারপাশে অবস্থিত চারটি নদীকে (বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা) প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। এদিকে ঢাকার আশপাশের প্রায় সব ইটভাটাই এ চার নদীর তীরে অবস্থিত। এগুলো সরিয়ে নেবে কোথায়? আবার এ আইনে কৃষিজমি এবং এর প্রান্তসীমা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে আর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের (আবাসন, শিল্পায়ন, বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক চাষাবাদ) নামে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কৃষিজমি। দেশে কৃষিজমি অকৃষি খাতে ব্যবহারের ফলে প্রতি বছর তা প্রায় ১% হারে হ্রাস পাচ্ছে। বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে প্রায় সব কৃষিজমিতেই বছরে দু-তিনবার বিভিন্ন শস্য উত্পাদন করা হয়। আমাদের ‘‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০’’ অনুযায়ী কোনো কৃষিজমি তিন বছর অনাবাদি থাকলে তা রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে যায়। তাই দেশের আবাদযোগ্য কোনো ভূমি কৃষির আওতার বাইরে থাকা অচিন্তনীয়। এদিক থেকে চিন্তা করলেও এ ধারার বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।

এ আইনে বলা হয়েছে, এলজিইডি নির্মিত সড়ক থেকে আধা কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। সাধারণত এলজিইডি নির্মিত রাস্তার দুপাশে সামাজিক বনায়ন (স্ট্রিপ বৃক্ষরোপণ) করা হয়। আর আইনানুযায়ী সামাজিক বন (ব্যক্তিমালিকানাধীন বনের অন্তর্ভুক্ত) থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা করা যাবে না। বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা অনুরূপ কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোনো ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না।

সব নিষেধাজ্ঞা একসঙ্গে চিন্তা করলে মনে হয়, জনমানবশূন্য কোনো স্থানে ইটভাটা স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ ও ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশে এরূপ স্থান পাওয়া দুষ্কর। তাই থামছে না ইটের ভাটার দূষণ। একে সহ্য করে নেওয়া ছাড়া যেন সামনে আর কোনো পথও খোলা নেই।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links