Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ধুলা বিড়ম্বনা

নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ, মেট্রোরেলের কাজ, রাস্তা সংস্কার, তিতাস ও ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িসহ নানা কারণে বাড়ছে ধুলার রাজত্ব। বাড়ছে জটিল ও কঠিন রোগের আশঙ্কা

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ০৫:৫৪ পিএম

হয়তো এমন শহর মেনে নিতে পারেননি কবি আবুল হাসান। তাই লিখেছিলেন,

“ধূলো কি দগ্ধ কয়লা? ধূলো কি বারুদ?

রাস্তায় বেরুলে শুধু ধূলোর কাহিনি ওড়ে

ধূলোর কাহিনি ওড়ে!

ধূলো যেন দগ্ধ কয়লা যতদূর যায় কেবলি পোড়ায়

ধূলো যেন একটি সুড়ঙ্গ পথ

ধূলো যেনো হৃদয়ের গোপন সম্পদ

যতদূরে যাই ঠিক ততদূর সেও যায়

মানুষের সকল শাখায়

সাথী হয়ে জ্বালায় পোড়ায় - ধূলো কি বারুদ?”

বসন্তের এ সময়টায় বৃষ্টি নেই। সময়টা উপভোগ্য হলেও এ সময়ের প্রধান বিড়ম্বনা ধুলা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলা নির্মাণকাজ এই ধুলার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। তাই রাজধানী ঢাকা এখন ধুলার নগরীতে পরিণত হয়েছে।

নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ, মেট্রোরেলের কাজ, রাস্তা সংস্কার, তিতাস ও ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িসহ নানা কারণে বাড়ছে ধুলার রাজত্ব। এতে পথচারীসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে জটিল ও কঠিন রোগের আশঙ্কা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধুলার মাধ্যমে বাতাসে নানা রোগের জীবাণু ছড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে যাদের অ্যালার্জি রয়েছে তাদের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। এছাড়া শিশু ও বৃদ্ধরা সর্দি-কাশিসহ ফুসফুসের নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

মাত্রাতিরিক্ত ধুলায় পথচারী এবং যানবাহনের যাত্রীদের অনেকেই নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। মাসের পর মাস নগরীর কেন্দ্রস্থলে এই ধুলার মহোৎসব হলেও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। ধূলা নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনও এ বিষয়ে ন্যূনতম কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের স্থানে রাস্তায় ব্যাপক ধূলাবালি উড়ছে। ধূলা নিয়ন্ত্রণে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ম-কানুন মেনে চলার নির্দেশ থাকলেও তারা এ বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন ধরণের দূষণের মধ্যে ধূলা দূষণের অবস্থান শীর্ষে। এর কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতির প্রভাব বাড়ছে। জীবাণুমিশ্রিত ধুলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ধূলার কারণে রাজধানী ঢাকাবাসীর মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের প্রতিমাসে কমপক্ষে ৪ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এর কারণে পরিধেয় কাপড়-চোপড়সহ ঘরের আসবাবপত্র ধুলায় ভরে যায়। এগুলো পরিষ্কার করতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় ও অর্থ নষ্ট হয়। এতে পানি ও বিদ্যুতেরও অপচয় বাড়ে।

বায়ু দূষণ ফাইল ছবি/মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

এজন্য পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় একটি কাযর্কর আইন প্রণয়নের দাবিও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

চিকিৎসকরা বলছেন, ধূলা দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ক্যান্সার, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি ও যক্ষ্মাসহ নানা জটিল ও কঠিন রোগ দেখা দিচ্ছে। এটির প্রভাব ধূমপানের চেয়েও ভয়াবহ। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ধুলা দূষণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা।

চিকিৎসকদের মতে, ধূলা দূষণের কারণে দিনদিন স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মূলত শহরাঞ্চলের অধিকাংশ রোগীই ধুলা দূষণের রোগী। চিকিৎসার সাহায্যে এসব রোগ সেরে উঠলেও এ থেকে খুব সহজে মুক্তি পাওয়া কঠিন। আর এসব রোগের রোগের ফলে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ে।

রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি, ভবন নির্মাণ, ভবন ভাঙা, রাস্তা নির্মাণ, মেরামত, পাইপ লাইন বসানোসহ বিভিন্ন কাজ নিয়ম-কানুন অমান্য করে সম্পন্ন করায় ধুলা দূষণ ঘটছে। তাছাড়া নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন এবং সিটি করপোরেশনের আবর্জনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময়েও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় বাড়ছে এ দূষণ।

এ অবস্থায় ধুলা দূষণ বন্ধে কিছু পরামর্শও দিয়েছে পবা। এগুলো হলো- নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার করা, পরিসেবার সংযোগ মেরামত, বৃদ্ধি ও নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় রাস্তা খননে সৃষ্ট মাটি সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলা, দালানকোঠা বা অন্যকোনো অবকাঠামো তৈরির সময় নির্মাণ সামগ্রী রাস্তার ওপর বা রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় না রাখা।

ধূলা সৃষ্টি হয় এমন কোনো সামগ্রী বহনের সময় সঠিক আচ্ছাদন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া। ড্রেনের আবর্জনা রাস্তার পাশে জমিয়ে না রাখা। আবর্জনা যথাযথ স্থানে ফেলা। আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিবহনের সময় সতর্কতা অবলম্বন করা।

ফুটপাতগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা। বাইরে থেকে ঢাকায় প্রবেশ করা যানবাহনগুলো যথাযথভাবে পরিষ্কার করা। সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধূলাদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তার উৎসগুলোকে বন্ধ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে নতুন করে আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন জরুরি। এজন্য শুরুতেই দরকার দায়হীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে নগরবাসীর কল্যাণসম্মত ভাবনা।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links