‘খালে হবে’ তারুণ্যে নির্ভরতার চাবি

কী নেই আমাদের? দেশটুকু ৫৬ হাজার বর্গমাইলের। ছোট্ট নয়। বরং বলা উচিত এক টুকরো স্বর্গ। আছে হাজারো নদী আর সংযুক্ত খালসহ বিশাল জলাধার। দক্ষিণে আছে এক অনন্য ম্যানগ্রোভ বন। তাতে গর্জন করে বিশ্বের বিস্ময় রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৌকতও আমাদের। সেন্টমার্টিন নামে অনবদ্য এক প্রবাল দ্বীপ আছে আমাদের বাংলাদেশের। বাদ নেই পার্বত্য এলাকায় স্তব্ধ করে দেওয়া উচ্চতার পাহাড়। 

তবু বাংলায় অভাব। মরার দেশ, জ্বরার দেশ। একের পর এক নেতিবাচক কারণে বিশ্বগণমাধ্যমে বাংলাদেশ। এর দায় অবশ্যই পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় দেশ চালানো রাজনীতিবিদদের। যাদের প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তে উপেক্ষিত জনগণ। 

এমন অবস্থা হতাশার। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি পর্বে এমন আঁধারে আলো জ্বালে তারুণ্য। বহু সমস্যার শহর ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি খাল নিজেদের উদ্যোগে পরিষ্কার করে নজির হয়েছেন কিছু যুবা। “এখনের পোলাপাইন ক্যারিয়ারস্টিক, ফেসবুক, টিকটক করে। এদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না।” - ইত্যকার কথার পাল্টা জবাব এই “খালে হবে”। 
পুরো কাজটির নেতৃত্বে থেকে অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন স্যাটায়ার ম্যাগাজিন “উন্মাদ” এর কার্টুনিস্ট মোর্শেদ মিশু। এ কাজে অনেকের মতো ব্যাপকভাবে সমর্থন জানিয়েছেন দেশসেরা কার্টুনিস্ট, “উন্মাদ” সম্পাদক ও গ্রাফিক নভেল শিক্ষক আহসান হাবীবসহ গোটা “উন্মাদ” পরিবার।

অর্থনীতি, রাজনীতি ও নির্বাচনের আগে এই টালমাটাল সময়ে বহু বার্তাবাহী এই “খালে হবে” প্রকল্প। এর থেকে ধারণা মেলে তারুণ্যের ক্ষমতার। “পাগল” বা “উন্মাদ” শব্দও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। সব নেতারা এখন ব্যস্ত গদির আলাপে। নিজের ধান্দায় এমন ব্যস্ত থাকা আসলে পাগলামি। সমাজের জন্য, দেশের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দেওয়ায় আছে বরং প্রকৃত মানসিক শান্তি।

অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাওয়া শহরের অন্যতম এক মৌলিক সমস্যা সমাধানের পথ দেখিয়েছে এই “খালে হবে”। ঢাকার ঐতিহাসিক ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় হয়ে ছিল নদীর সঙ্গে খালের মিলন। বেহুঁশ উন্নয়ন সে পথ থেকে গর্বের শহরকে বিচ্যুত করেছে। কিন্তু দেরিতে হলেও সবার এখন বোধোদয় হচ্ছে। শহরের নতুন বিনির্মাণ পর্বের এক সূচনা তাই বলা যায় এই “খালে হবে” কর্মসূচিকে। 

গালি-গালাজ আর সমালোচনা সহজ। শিল্পের দায়, শিল্পীর কর্তব্য নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা কম হয়নি সেমিনার রুমে বসে। কিন্তু দায় নিতে চান না কেউ মাঠে নেমে সমাধান যাত্রায়। সমস্যার কারণ এখানেই। এই শহরকে আপন ভাবতে পারছেন না যেন কেউ। ডাস্টবিনের যা ফেলার কথা তা অনেকে ফেলছেন সড়কে। বাড়ির পাশের খালেও ঘটেছে একই ঘটনা। দিনের পর দিন এভাবেই চলেছে। গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে। এর দায় এককভাবে কোনো কর্পোরেশনকেই দেওয়া যায় না। নিজেদের শহরকে ভালোবাসার তাগিদে নাগরিক কর্তব্যের বোধ জাগিয়েছে এই “খালে হবে” কর্মসূচি।   

মোহাম্মদপুর নিবাসী নন “খালে হবে”র প্রধান উদ্যোক্তা মোর্শেদ মিশু। তিনি থাকেন মিরপুরে। কিন্তু নিজেদের সামর্থ্যে যতটুকু করা সম্ভব তাই তিনি ও তার সহযোদ্ধারা বাস্তব করেছেন মোহাম্মদপুরে। এতে প্রমাণ মেলে একাত্মতার। বড় করে দেখার ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি। নিজের এলাকার বাইরেও পুরো শহরটি আমাদের। এমন ভাবে ক’জনায়? 
অথচ তাই প্রকাশ হয়েছে এই তরুণদের কাজে। “খালে হবে” কর্মসূচি বাস্তব হওয়ায় আমরা এখন দেখতে চাই দেশ ও  শহরের অন্য সব প্রান্তেও এমন নিষ্ঠাবান উদ্যোগ। শুরুর স্ফূলিঙ্গ জ্বলে গেছে। এখন অগণন মশাল জ্বালতে দেরি হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সমস্যা সমাধানে অন্য কারও ভরসায় বসে থেকে লাভ নেই। কবিগুরুর “একলা চলো” মন্ত্রে উজ্জীবিত তরুণ উদ্যোমীরা তা প্রমাণ করেছেন। তারা এমন পথে হেঁটেছেন যেখানে পথচলা ছিল অনিশ্চয়তায় ঠাঁসা। আর এটি হয়েছে তারুণ্যের কাছে এক চ্যালেঞ্জ। সাফল্য ধরা দিতে তাই দেরিও হয়নি এতটুকু।

দেশের সার্বিক দশায় এমন উদ্যোগ আমাদের আশাবাদী করে। “খালে হবে” প্রকল্প এভাবে তারুণ্যের অমিত সম্ভাবনাকেই সুস্পষ্ট করেছে।

ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়। ২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
 
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।