Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এই শহরে দারুণ দরকার আড্ডার…

অনেকদিন পর আমরা মিলিত হই, আলাপ জমাই। নতুন নতুন ইস্যুতে কথা বলি, নতুন নতুন আইডিয়া আসে। আবার সেগুলো হারিয়ে যায়। এগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আড্ডার বিকল্প নাই

আপডেট : ২০ মে ২০২৩, ০৬:০৭ পিএম

মাস দশেক ধরে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে বেঙ্গলের সাত তলায় আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠে প্রায় নিয়মিতই আসি। কিছু মুখ নিয়মিতই দেখি। সবাই সবার মতো কাজ করছে। বেশিরভাগই নিজস্ব ল্যাপটপে। দু-একজনের সাথে একান্ত প্রয়োজনে দু-একটি বাক্যবিনিময় ছাড়া সেই অর্থে আলাপ জমে নাই, আড্ডা হয় নাই একদিনও। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়রের সঙ্গে দেখা হয়েছে দুই-তিন বার। দুইদিন আড্ডাও হয়েছে জম্পেশ।

কয়েকদিন আগে নিচে নেমে চা খেয়ে সামনের ফুটপাতে রেখে আসা বাইকটা ঠিকঠাক আছে কি-না, একবার দেখে আবারও বেঙ্গলে ঢুকব- এমন সময় ফুটপথে দাঁড়ানো এক তরুণ জিজ্ঞেস করলেন, “মসজিদে গিয়েছিলেন?” বললাম, “না। চা খেতে গিয়েছিলাম।”

তারপর ধীরে ধীরে আলাপ জমলো, এই লাইব্রেরিতে কেন মানুষজন তেমন আসে না, যারা আসেন, তারা কি সবাই পড়তে আসেন? আরও মানুষ এলে এখানকার পরিবেশ কেমন হবে? শাহবাগ, নিউমার্কেট, বেইলি রোড এবং ধানমন্ডি ছাড়া ঢাকা শহরের অন্য এলাকায় কেন লাইব্রেরি নাই? সাত মসজিদ রোডের গাছ কাটা এবং সেটার বিরদ্ধে প্রতিবাদ। ঢাকা-চট্রগ্রাম সড়ক থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরে যাওয়ার লিংক রোডের দুই-ধারে কত বটগাছ ছিল। ফোর লেন করার জন্য সেগুলো কাটা হয়েছে। তার ফলে কী বিপর্যয় ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগরের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সৌন্দর্য কীভাবে চোখের সামনে নষ্ট হলো। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি কী ছিল না সেদিনের সেই ঘণ্টা দেড়েকের আলাপে। 

মনে হলো, এই বদ্ধ শহরে অনেকদিন পর মন খুলে কথা বললাম। নিজেদের বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য আদান-প্রদান ছাড়াই সেদিন দু'জন দুজনকে বিদায় জানালাম। 

মাঝখানে ছুটি ছিল দুইদিন। ছুটির পর একদিন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে নিচে চা খাচ্ছি, পাশ থেকে সেই তরুণ সালাম জানালেন। আবারও কুষ্টিয়া, কালিকাপ্রসাদ, লালন, শাহ আব্দুল করিম, ভাসানী, কাগমারি সাংস্কৃতিক সম্মেলন, বঙ্গবন্ধু, ড. আকবর আলি খান…কোথা থেকে কোথায় চলে গেলাম। আজও প্রায় ঘণ্টা-দুয়েক পার করে দু'জন দুজনকে বিদায় জানালাম।

ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

বিদায় জানানোর পর আবারও নতুন করে মনে হচ্ছে, এই শহরে প্রাণখোলা আড্ডা দারুণ জরুরি। সেটা প্রতিবাদ, প্রতিকার, প্রতিরোধের জন্য কিংবা যৌথ প্রত্যয়ের জন্য হোক। নতুন কিছু করার জন্য ভাবনা দরকার, আলাপ দরকার, দরকার আড্ডা। আড্ডায়ই মানুষ প্রাণ খলে কথা বলেন, সেই কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকে নতুন চিন্তার খোরাক, নতুন কাজের উৎসমুখ। 

একটু পেছন ফিরে দেখি, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমার নিজের গ্রাম এক নিস্তরঙ্গ অজ পাড়াগাঁ। একবার গ্রামে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে মনে হলো, আমাদের গ্রামে একজন বৈষ্ণব থাকতেন। তিনি প্রতি অমাবস্যা, পুর্ণিমাতে রাতের বেলা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষ্ণ নাম বিলাতেন। পরদিন সকালে আবার আসতেন, গ্রামবাসী তাকে আলাদা আলাদা পাত্রে চাল, ডাল, তেল, লবণ, হলুদ দিতেন। মূলতঃ তার পরিবারের জীবিকা নির্বাহের একটা অংশ আসত এভাবেই। তিনি মারা যাওয়ার পর সেই মধ্যরাত কিংবা ভোরবেলাতে সেই গান আর আমরা শুনি না। এক পূর্ণিমার রাতে আমরা তিন বন্ধু মিলে বেরিয়ে পড়লাম, গ্রামে নাম বিলাতে। গ্রামের বাড়ি থেকে মধ্য রাতে নারীপুরুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সেই বৈষ্ণব মারা যাওয়ার পর থেকে তো আর রাতের বেলা এই নাম তারা শোনেন নাই। অনেকেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন। 

পরদিন দুপুরের পর আমরাও তার স্মৃতি স্মরণ করে বেরিয়ে পড়লাম পাত্র নিয়ে। অবিশ্বাস্যভাবে অনেক চাল উঠল। সেই চাল বিক্রির টাকা দিয়ে আমরা আশে-পাশের দুই-তিন গ্রামের মানুষকে একত্রিত করেছিলাম এক মিলনমেলায়। গ্রামে স্কুলজীবনে এরকম অনেক স্মৃতি আছে। 

এই শহরেও আড্ডায় অনেক নতুন, নতুন ধারণা মাথায় এসেছে, উদ্বেলিত হয়েছি কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারি নাই। একবার এক আড্ডায় উঠে এলো একসময় গ্রামের নারী-পুরুষ মিলে সন্ধ্যার পরে নিজের গ্রাম তো বটেই অন্যগ্রামে পালাগান শুনতে যেতেন, গাজীর গান শুনতে যেতেন, সার্কাস দেখতে যেতেন। সেই দেশে এখন গ্রামের নারীরা সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে পা রাখতে ভয় পান, তাদের ভয় পাওয়ানো হয়। অগত্যা প্রায় সারা শীতকাল জুড়েই মাইকে রাতভর নারীদের নিয়ে হাস্যরসাত্মক বক্তব্য, ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য শোনা যায়। 

একজন অগ্রজ বললেন, “এখন গ্রামে গিয়ে তো তুমি পালাগান, গাজীর গান, সার্কাস আয়োজন করতে পারবা না। সময়ের সাথে অন্যভাবে ভাবতে হবে। গ্রামে গিয়ে একজন ভ্যান কিংবা রিকশাওয়ালাকে দিনের জন্য চুক্তি করে একটা মাইক ভাড়া করে লালন, হাসন, বিজয় সরকারের গানের সিডি চালিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। গ্রামের রাস্তায় মেঠোপথে সারাদিন সেই চালক ঘুরবেন আর গানগুলি বাজতে থাকবে।” আমার মনে হলো দারুণ আইডিয়া। আমরা ছোটবেলায় আমাদের অজপাড়াগাঁয়ে মাঠের ওপার থেকে অন্য গ্রাম থেকে ভেসে আসতে শুনতাম কবিয়াল বিজয় সরকারের গান, পরীক্ষিৎ বালার গান এমনকি সেই অজপাড়াগাঁয়েই ভেসে আসতে শুনেছি, কিশোর কুমার, মান্না দে এবং কুমার শানুর গান। 

সেইসব গান মানুষের কানে এলে নিশ্চয় তারা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়বেন। মাঠে কাজ করতে থাকা কৃষক, গ্রামীণ নারীরা পরস্পরের সঙ্গে সেইসব সময় নিয়ে গল্প করবেন। তাদের একটা ভালোলাগা কাজ করবে। উদ্দেশ্য আহামরি কিছু না। 

এখন তো গ্রামে হয় রাজনৈতিক দলের বাজানো ক্যাসেট, ওয়াজ না হলে হিন্দি গান এর বাইরে মাইকে কিছু শোনা যায় না। রবীন্দ্রনাথের সেই গানের কথার মতো “প্রতিদিন যদি কাঁদিবি কেবল, একদিন নয় হাসিবি তোরা-একদিন নয় বিষাদ ভুলিয়া সকলে মিলিয়া গাহিব মোরা” একটা আবহ তৈরি করা।

আর একদিনের আড্ডায় এক সহযোদ্ধা বন্ধু বললেন, এই শহরে গ্রাম থেকে আসা কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীদের বটেই এই শহরেই অনেক সংস্কৃতিসেবী মানুষের তিনবেলা খাবার ব্যবস্থা নেই, থাকার বন্দোবস্ত নেই। এমন একটা জায়গা ব্যবস্থা করা যায় কি-না, যেখানে তারা এসে থাকবেন, খাবেন, প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিজেদের মতো চলে যাবেন। 

আর এক আড্ডায় একদিন উঠে এলো এই শহরে অনেক প্রবীণ মানুষ আছেন, তাদের বাড়ি আছে, অর্থ আছে কিন্তু তারা নিঃসঙ্গ। তাদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে হলেও কিছু করা কি-না। হতে পারে সেটা ক্লাবের মতো, নাম হতে পারে “ফিফটি প্লাস ক্লাব”। যেখানে তারা আনন্দময় পরিবেশ পাবেন।

কিন্তু এই আলোচনা, আলোচনাতেই থেকে যায়। কারণ আমাদের আলাপ, যোগাযোগ এবং আড্ডা বড় অনিয়মিত। অনেকদিন পর আমরা মিলিত হই, আলাপ জমাই। নতুন নতুন ইস্যুতে কথা বলি, নতুন নতুন আইডিয়া আসে। আবার সেগুলো হারিয়ে যায়। এগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আড্ডার বিকল্প নাই। 

সত্যজিৎ রায়ের “আগন্তুক” সিনেমাতে আমরা দেখি কেন্দ্রীয় চরিত্র যে চরিত্রে উৎপল দত্ত অভিনয় করেছেন, তার ভাগ্নিজামাইয়ের বন্ধু (রবি ঘোষ) যখন বলেন, “বিদেশে আপনি একটা জিনিস নিশ্চয় আপনি মিস করছেন। কী সেটা? রসগোল্লা?” এভাবে একাধিক উত্তরের পর রবি ঘোষ নিজেই উত্তর দেন, “আড্ডা।” সংলাপের এক পর্যায়ে উৎপল দত্ত বলেন, “গ্রিসের এথেন্সে এক সময় আড্ডা হতো। সেই আড্ডায় আলোচনার বিষয় ছিল, ম্যাথেমেটিক্স, ফিজিক্স, ফিলোসফি…পরনিন্দা নয়; পরচর্চা নয়; কুৎসা নয়…আমরা হয়ত, সেই স্তরে যেতে পারব না কিন্তু সমমনাদের কিংবা ভিন্ন চিন্তার মানুষদের আড্ডা থেকে ভালো কিছু বের হয়ে আসতে পারে।”

প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের কোনো এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম, উনি বলছেন, “আমাদের সময় একসাথে হাঁটা যেন সংস্কৃতির অংশ ছিল। এই যে বন্ধুরা মিলে হাঁটা, কথা বলা এটাও তো আড্ডা।”

যদিও এই শহরে চন্দ্রিমা উদ্যান, রমনা কিংবা ধানমণ্ডি লেক ব্যতীত একসাথে হাঁটা এবং কথা বলা-আড্ডার সুযোগ কম। তারপরও ইট-কাঠের এই নগরীতে আড্ডা বড় জরুরি। আড্ডার মাধ্যমেই প্রাণ ফিরে পেতে পারে এই শহর। এই শহরকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় বেরিয়ে আসতে পারে আড্ডা থেকেই। তাই আড্ডা খুব জরুরি। হোক না সিলি আড্ডা, তবুও মানুষ মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলবে, প্রাণ খুলে হাসবে, পরস্পরকে স্পর্শ করবে। কথিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে, ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তব জগতে মানুষ মানুষের মুখোমুখি দাঁড়াবে।


মানবাধিকার কর্মী অপূর্ব দাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমি অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x