ফেব্রুয়ারিতে বাড়তি একটা দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় চার বছর। উপরন্তু এবারের ২৯ ফেব্রুয়ারি ছিল বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যা থেকেই ঢাকায় ছিল সাজ সাজ রব। প্রাণহীন এ শহরের বিনোদনের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম রেস্টুরেন্ট। দিনভরই ছিল সেদিন ঢাকার রেস্তোরাঁগুলোতে উপচে পড়া ভিড়।
২৯ তারিখ রাতে ধানমন্ডির এক রেস্টুরেন্টে আমিও ছিলাম। আর ঠিক সেসময়ই ঢাকার আরেক প্রান্তে প্রিয়জনদের নিয়ে একটা সুন্দর সময় কাটাতে গিয়ে জীবন দিতে হলো ৪৫ জন মানুষকে। আমরা সাক্ষী হলাম এক ভয়াবহ ২৯ ফেব্রুয়ারির।
এমন অনুভূতির মিশ্রণ বোধহয় এ শহর দেখেনি বহুদিন। মার্চের এক তারিখ শহরে একদিকে স্বজনদের আহাজারি, প্রতিবার ফেসবুক স্ক্রলে সামনে আসে আগুনের লেলিহান শিখা। এই শহরেই আরেক প্রান্ত মেতে উঠেছে তখন বিপিএলের ফাইনাল আর বাদশাহর কনসার্টে।
বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পর সংবাদমাধ্যম থেকে গণমাধ্যম সবর্ত্রই একটি প্রশ্নের আধিপত্য ছিল প্রবল। এই হত্যাকাণ্ডের দায় কার? রাজউক, ভবন মালিক, রেস্টুরেন্ট মালিক নাকি সরকারের?
বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পর সংবাদমাধ্যম থেকে গণমাধ্যম সবর্ত্রই একটি প্রশ্নের আধিপত্য ছিল প্রবল। এই হত্যাকাণ্ডের দায় কার? রাজউক, ভবন মালিক, রেস্টুরেন্ট মালিক নাকি সরকারের?
মুহূর্তের মধ্যেই ভবন পুড়ে ভস্মীভূত হওয়ার ভিডিও দেখতে দেখতেই আমরা জানলাম নতুন কিছু তথ্য। বেইলি রোডের জাঁকজমক এই গ্রিন কোজি কটেজ নাকি আদতে ছিল এক মৃত্যুকূপ! ফায়ার সার্ভিস তিনবার নোটিশ দিয়েছে। ছিল না রাজউকের অনুমোদনও। এই খবর কখনো পৌঁছায়নি আমাদের কাছে। ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো আরও নতুন কিছু তথ্য। এই শহরের আমাদের যাওয়ার একমাত্র জায়গার অধিকাংশগুলোই নাকি একেকটা মৃত্যুকূপ। সিলগালাও করা হলো বেশ কিছু ভবন, বন্ধ হলো কয়েকটি রেস্টুরেন্ট।
কিন্তু আদতে কি তা আনবে কোনো সমাধান?
আমার প্রায়ই মনে হয়,আমরা জাতি হিসেবে একটা সম্মিলিত স্মৃতি বিভ্রমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমরা ভুলে গিয়েছি, পুরান ঢাকার নিমতলীতে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া শতাধিক প্রাণের কথা, ভুলে গিয়েছি চট্টগ্রামে রাস্তায় নিছকই হাঁটার সময় ৬০ ফুট ময়লার নিচে পড়ে প্রাণ হারানো মেয়েটার কথা। এই শহরে নির্মাণাধীন স্থাপনার ইট খুলে পড়ে মানুষ মরে যায়, রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে মরে যায়, ছোট শিশুরা প্রাণ হারায় খতনা করতে গিয়ে আর বড়রা এন্ডোসকপিতে। খুব শিগগিরই হয়ত আমরা ভুলে যাব বেইলি রোডে প্রাণ হারানো এই ৪৬ জন মানুষের কথাও।
আমার ব্যক্তিগত মতামত, “জাদুর শহর” ঢাকার এমন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়ার পেছনে দায় আসলে আমাদের এই সম্মিলিত স্মৃতিবিভ্রমের। এই শহরে এত অভিনব সব উপায়ে মানুষের প্রাণ চলে যায়, এরপরেও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসে না। কারণ সবাই খুব ব্যস্ত হয়ে যাই “নেক্সট বিগ ইস্যুতে”। ফেসবুক ট্রেন্ডের হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দেই। নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দলে ভাগ হয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় শুরু করি যুদ্ধ। আমরা ভুলে যাই, আমরা মেনে নিই। ফলে দুই-এক সপ্তাহ হতাশা প্রকাশ ছাড়া আর প্রশাসনের দায়ভার নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করা ছাড়া নতুন কোন দৃশ্যের আর অবতারণা হয় না।
এ শহরে খুব সম্ভবত সবচেয়ে কম দাম মানুষের জীবনের। সবাই একেকটা সংখ্যা। সংখ্যাদের যেহেতু অনুভূতি থাকে না, তাই আমরাও খুব অবলীলায় ৪৬ জনকে একত্রে “হত্যার” মতো ঘটনা একপাশে রেখে উল্লাস করতে পারি। শহরের প্রতি কোণায় কোণায় মৃত্যুফাঁদ পাতা আছে জেনেও অনায়াসে দিনের পর দিন স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে পারি। সব ধরনের অত্যাচার, অনাচার দেখে নির্দ্বিধায় চোখ বন্ধ করে ফেলতে পারি।
এইটুকু পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি, ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর জমকালো রেস্টুরেন্টগুলোও হয়ত খুব দ্রুতই খুলে যাবে আবার। সিলগালা ভবনগুলোও ফের জমে উঠবে আপনার-আমার পদচারণায়। কারণ এই শহরের মানুষের বিনোদনের জন্য যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।
অতীতের ঘটনার আলোকে এইটুকু পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি, ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর জমকালো রেস্টুরেন্টগুলোও হয়ত খুব দ্রুতই খুলে যাবে আবার। সিলগালা ভবনগুলোও ফের জমে উঠবে আপনার-আমার পদচারণায়। কারণ এই শহরের মানুষের বিনোদনের জন্য যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।
আমাদের এই ভুলে যাওয়া রোগের মাশুল হয়ত দেবেন আরও কিছু মানুষ তাদের জীবন দিয়ে। প্রাণ হারানো মানুষেরা সমাজের উচ্চস্তরের হলে পাবেন আমাদের হা-হুতাশ, আর দরিদ্র হলে তাদের ভাগ্যে জুটবে না সেটুকুও। তবে প্রতিবারই আমরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাব, অন্তত আমাদের সাথে তো হয়নি। আমরা তো বেঁচে (?) গেলাম!
এত নৈরাশ্যের মধ্যে আশার কথা হয়ত এটুকুই যে, এখনো এই শহরের সব মানুষের জীবন সংখ্যায় পরিণত হয়নি। গুটিকয়েক মানুষের জীবন এখনো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই স্বস্তি আমার দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পরক্ষণেই মনে পড়ে বিখ্যাত সেই উক্তি, “নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়?”