Saturday, June 15, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে

ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য ড. বিওন লম্বোগের লেখা এই বিশেষ নিবন্ধে দেখানো হয়েছে কীভাবে অতিরিক্ত দেড় বিলিয়ন ডলার প্রতি বছর ০.৫ মিলিয়ন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৩, ০৪:১১ পিএম

বিশ্বে মানবকল্যাণকর কাজগুলোর মধ্যে টিকাদান অন্যতম। চিকিৎসাখাতের অন্য যেকোনো আবিষ্কারের চেয়ে টিকার মাধ্যমেই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ করা গেছে বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারি। এই আবিষ্কার মানুষের জীবনমানে কতখানি উন্নতি এনেছে, তা অনেক সময়ই বুঝতে পারি না আমরা।

গত শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে সংক্রামক রোগে। এই সংখ্যা বর্তমান সময়ে ক্যান্সার এবং হৃদরোগে মৃত্যুর চেয়েও অনেক বেশি। টিকা আবিষ্কারের ফলে ডিপথেরিয়া, টাইফয়েড, হাম এবং হুপিং কাশির মতো রোগগুলো কার্যত বিলুপ্তির পথে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি মার্কিন নাগরিক এসব রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা ৯৮% কমে গেছে।

বিশ্বের দরিদ্র অংশের দিকে তাকালে এই পরিস্থিতির আরও ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাই। নির্মূল হওয়ার আগে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত গুটিবসন্ত ছিল বিশ্বের অন্যতম গুরুতর সংক্রামক রোগ, সহস্রাব্দ ধরে যা ছিল অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ। বিংশ শতাব্দীতে গুটিবসন্তে বিশ্বে ৩০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। টিকা না দেওয়া হলে এই রোগটি এখনও বছরে ৫০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।

বর্তমানে থাকা বিপজ্জনক সংক্রামক রোগগুলোর বিবেচনায় দেখা গেছে, টিকার কারণে এসব রোগ থেকে বছরে ৩৮ লাখ মানুষের জীবন বেঁচে যাচ্ছে।

তবে, এখনও প্রতি বছর বিশ্বের দরিদ্র অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ টিকা থেকে বঞ্চিত। সাম্প্রতিক কোভিড মহামারি এই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে, যা গোটা বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চাপে ফেলে দিয়েছিল। এই মহামারির কারণে ২০২১ সালে আড়াই কোটি শিশু বিভিন্ন রোগের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৫ লাখ ৯০ হাজার বেশি এবং ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চসংখ্যক। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রশংসনীয়ভাবে ব্যতিক্রম ছিল। কোভিড মহমারির সময়েও এদেশে শিশুদের টিকা দেওয়ার ৯৮% হার অব্যাহত ছিল।

এদিকে, মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি এবং অন্যান্য অনেক বৈশ্বিক সংকটের কারণে টিকাদানের ওপর থেকে মনোযোগ সরে যাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের অংশ হিসেব শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনার বিষয়ে ২০১৫ সালে বিশ্বনেতারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। তবে, এটি কেবল তখনই সম্ভব যখন টিকার মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এসডিজির ১৬৯ লক্ষ্যমাত্রার অনেকগুলো  প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে আমরা এখনও অনেক দূরে রয়েছি। ১৬৯টি লক্ষ্য থাকার অর্থ বিশেষ কোনো বিষয়ে অগ্রাধিকার না থাকার মতোই। এসডিজির মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে টিকাদান সম্প্রসারণ, শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিশ্চিত করার মতো বিষয়ের পাশাপাশি রিসাইকেলিং কিংবা জলবায়ু বিষয়ক উন্নয়নের মতো সুদূরপ্রসারী বিষয়গুলোও রয়েছে।

এসডিজিতে অনেক বেশি  প্রতিশ্রুতি থাকায় অনেকগুলোই পূরণে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা এসডিজির অর্ধেক সময় পার করে ফেলেছি। কোভিড মহামারি পূর্ব ও পরবর্তী অগ্রগতি মিলিয়ে যে অবস্থা তাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগে যাবে।

এই পরিস্থিতিতে যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেই আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই বিষয়গুলো নির্দিষ্টকরণের জন্য বিগত বছরগুলোতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও কয়েকজন নোবল বিজয়ীর সঙ্গে কাজ করেছেন।আমরা এসডিজিতে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারের কিছু খাত চিহ্নিত করেছি।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাকসিন অ্যাক্সেস সেন্টারের (আইভিএসি) গবেষকরা বিশ্বব্যাপী টিকাদান সম্প্রসারণ করতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। এই খাতে বিনিয়োগের বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রচলিত রোগগুলো থেকে ৩৮ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে।

আর এই বিনিয়োগের পরিমাণ যদি কিছুটা বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির আরও বেশি উন্নতি হবে। সেক্ষেত্রে ২০২৩ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪১ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।

এই ব্যয় হতে হবে বাস্তবসম্মত। টিকা সম্পর্কে সচেতন নয় এমন অঞ্চলগুলোতে প্রচারণার জন্য বাড়তি খরচ প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে ভারতকে অনুকরণ করা যেতে পারে। দেশটিতে টিকাদান সম্প্রসারণ করতে খাদ্য সহায়তা এবং টিকা ক্যাম্প কর্মসূচি রয়েছে।

এক্ষেত্রে বর্তমান ১.৫ বার্ষিক বরাদ্দ থেকে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাড়াতে হবে। এই বাড়তি বরাদ্দ  প্রতি বছর ৫ লাখ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে মানুষের জীবনের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে পরিত্রাণ বেশি জরুরি। আর টিকাখাতে এই অতিরিক্ত বাড়তি বরাদ্দের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিও ১৭০ বিলিয়ন ডলারের।

অর্থাৎ, এই খাতের পেছনে ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ১০১ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে। ১ ডলার ব্যয় করে ১০০ ডলার অর্জন বেশ লাভজন, এবং এর ফলে বিশ্বব্যাপী টিকাদান সম্প্রসারিত হবে।

এসডিজির শতাধিক প্রতিশ্রুতির অনেকগুলো থেকেই কার্যকরী ফল পাওয়া যাবে না, আবার অনেক বিষয় আছে যেখান থেকে বেশ ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। টিকাদান সম্প্রসারণ সেরকম একটি ইতিবাচক খাত। বিশ্বের সর্বোচ্চ কল্যাণের জন্য তাই টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং এই খাতে জনবল বৃদ্ধি অত্যাবশ্যকীয়।


ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।


এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের তৃতীয় অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-

-  এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব

- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব

শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে

About

Popular Links