Monday, June 17, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রসঙ্গ বিদ্যানন্দ: সমাজের ভালো কাজগুলো যেন বন্ধ হয়ে না যায়

ফেসবুকে কিছু ছবির অসংলগ্নতা নিয়ে আমরা তাদের এই মহৎ কাজের হিসেব টানতে শুরু করেছি। কতটা সন্দেহপ্রবণ হলে আমরা এইসব চিন্তা ভাবনা করতে পারি তা মাথায় আসে না

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৩, ০৮:৪১ পিএম

কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের কথা নিশ্চয় সবার মনে আছে, ওই যে কয়েক মাস পর পর দানবাক্স খুলে কয়েক কোটি টাকা করে পাওয়া যায়, পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিষয়টি এমন যে, মসজিদে কোটি টাকা জমা হওয়ার পর সবাই পুলকিত হন, কিন্তু  কারা কেন এতো টাকা দান করেন সেই বিষয়ে কারও প্রশ্ন থাকে না। কারণ, মসজিদ হচ্ছে পবিত্র স্থান, যেখানে ব্যাংক ডাকাতি, পকেটমার কিংবা ভেজাল পণ্য বিক্রির অর্থ মন বাসনা কিংবা পাপমোচনের ইচ্ছায় রাতের অন্ধকারে দান করলে পবিত্র হয়ে যাওয়া যায়। ফলে, এই দাতাদের অস্বাভাবিক দানের অর্থের উৎস মানুষ আর জানতে চায় না কিংবা আগ্রহ দেখায় না।

অন্যদিকে এই পাগলা মসজিদের দানবাক্স ভরে তোলা দাতারা কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে নজর দেন না। সেই দাতব্য প্রতিষ্ঠান যদি সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের জন্য দুই বেলা ডালভাতের ব্যবস্থা করে সেখানেও তাদের মন যায় না। কারণ এখানে দান করলে পাপমোচনের সুযোগ কম থাকে কিংবা মনোবাসনা পূরণের সম্ভাবনাও থাকে না। 

মসজিদ-মাদ্রাসা কিংবা মন্দিরে দানকর্তারা হালের “বিদ্যানন্দ”র মতো চ্যারিটিগুলোতে কতটা দান করে তা সত্যি আমার অজানা, তবে বিদ্যানন্দের মতো দাতব্যগুলোতে যারা দান করে তাদের মনুষ্যত্বের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। মসজিদ-মন্দিরে দানকর্তারা মানুষের যতটা কল্যাণের আশা করেন, তার চেয়ে তারা পরকালে কামিয়াব হওয়ার চিন্তাটা প্রকট থাকে। অন্যদিকে “বিদ্যানন্দে” যারা দান করেন তারা মূলত মানুষের কল্যাণটাই কামনা করেন। মানুষের ভালোর জন্য যারা নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে যাচ্ছেন, তারা কালোবাজারি কিংবা দুর্নীতির টাকার প্রায়শ্চিত্ত করতে নয় বরং মানবিকতার খাতিরে দান করেন।

বিদ্যানন্দের কাজ সরাসরি এই সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষদের নিয়ে। বিদ্যানন্দের মত শত শত দাতব্য প্রতিষ্ঠান, এনজিও রয়েছে যারা এই গরিব মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, বিদেশিদের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিয়ে আসছে। এই কাজগুলো যারা করে তাদের একটি বড় অংশই মানুষকে ভালোবাসার জায়গা থেকে করে আসছে। এর মধ্যে দিয়ে যেমন ঈশ্বরের ভালোবাসা পাওয়া যায় তেমনি, নিজের বিবেকটাকে পরিশুদ্ধ রাখা যায়।

বিদ্যানন্দে আপনি দান করুন বা না করুন কিন্তু এর কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা আমাদের অন্তত উচিত নয়। 

যে মানুষগুলো এখানে লেগে আছে, দয়া করে তাদের খোঁজ-খবর নিন, দেখবেন এদের বড় একটি অংশ স্বেচ্ছাসেবী, যারা নিজের খেয়ে অন্যের মহিষ তাড়িয়ে বেড়ান। আবার যারা বেতন নেন, তাদের ব্যাংক-ব্যালেন্স চেক করুন দেখবেন সেখানে বেতন ব্যতীত অতিরিক্ত টাকা পান কি-না। এরা কেবল মানুষকে ভালোবাসে বিধায়, তাদের দুই বেলা খাবার দেওয়ার জন্য আপনার কাছে হাত-পাততে দ্বিধা করছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নেওয়ার পর, বন্ধুরা যেখানে মোটা বেতনে চাকরি করে, সেখানে এমন বিদ্যানন্দের মত একটি প্রতিষ্ঠানে আপনি চাকরি করতে চান কি-না নিজের কাছে প্রশ্ন করুন? অথচ এরা ওই ছিন্নমূল পথশিশুর জন্য আপনার কাছে হাত পাতছে ভাবা যায়? 

ফেসবুকে কিছু ছবির অসংলগ্নতা নিয়ে আমরা তাদের এই মহৎ কাজের হিসেব টানতে শুরু করেছি। কতটা সন্দেহপ্রবণ হলে আমরা এইসব চিন্তা ভাবনা করতে পারি তা মাথায় আসে না। তবে এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে না, তা তো বলা মুশকিল। 

যে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এতিমদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের মামলায় অভিযুক্ত, যেদেশের গরিবদের ত্রাণের ঢেউটিন, খাদ্যসামগ্রী মন্ত্রী, এমপি ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা মেরে দেয়, সেই দেশে গরিবদের জন্য পাওয়া অর্থ যে লোপাট হতে পারে না তা তো নয়। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে মানুষের বিচরণ নয়। এটি হতেই পারে।

শুধু কিছু পোস্টের অসংলগ্নতা নিয়ে তবে বিদ্যানন্দের কর্মকে অমূল্যায়ন করার কোনো হেতু আছে বলে আমি অন্তত মনে করছি না। যে-সব পোস্ট নিয়ে কথা হচ্ছে, তার বড় অংশই প্রকাশ পেয়েছে কয়েক বছর আগে। কিন্তু হঠাৎ করে সেইসব পোস্টকে সামনে এনে, অর্থ আত্মসাতের কাঠগড়ায় তোলার পেছনে কারণ কি? তা আমার বোধগম্য নয়। 

বিদ্যানন্দের কেউ যদি দু-টাকা তছরুপ করে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা উচিত, তবে এমন অভিযোগ না পেয়ে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুলভাল ছবি প্রচারের দায়ে “সমাজের এই মহৎ” উদ্যোগে আপনি কোণঠাসা করতে পারেন কি-না তা নিয়ে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন। আমরা যারা প্রশ্ন তুলছি, তারা আদৌও বিদ্যানন্দকে “দুই টাকা” সহায়তা করেছি কি-না সন্দেহ আছে। তবে সাম্প্রদায়িক ছুঁতো তুলে বিষবাষ্প ছড়ানো কেবল সাম্প্রদায়িক চিন্তার ফসল হতে পারে। আপনার অর্থ সহায়তায় কেউ যদি এক মুঠো অন্ন পায়, সেটাকে সাধুবাদ জানান। তা করতে না পারলে এমন কাজ করবেন না যাতে করে এই সমাজের ভালো কাজগুলোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।


ড. নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি


প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links