সার্বজনীন পেনশন স্কিম প্রসঙ্গে

প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন দর্শন ও সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনের অংশ হিসাবে সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও দপ্তর নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখার চেষ্টা করছে। যদিও প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়ন করা, কিন্তু বাস্তবায়নের কর্মপদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের মধ্যে সঠিক সময়ে যথাযথ সমন্বয় অপরিহার্য। অন্যথায়, একটি প্রতিষ্ঠান/দপ্তরের গৃহীত পদক্ষেপ অন্য প্রতিষ্ঠান/দপ্তরের লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। যখন কোন সমস্যা সমাধানের জন্য নেওয়া পদক্ষেপ, নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি করে তাকে আমরা প্যারাডক্স বলি। এই লেখার মাধ্যমে আমরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব কিভাবে সার্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রত্যয় স্কিমটি এমন কিছু প্যারাডক্সের জন্ম দিচ্ছে। একদিকে সর্বজনীন পেনশন স্কিম দেশের সকল নাগরিককে অবসরকারলীন সুরক্ষা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসছে। অন্যদিকে, এই স্কিমের ফলে দেশের নাগরিকরা শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ হারাবে এবং অনেকেই এই পেশা ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাবে যা দেশকে মেধাশূন্যতার দিকে ঠেলে দিবে। 

আমরা ধারণা করছি যে প্রত্যয় স্কিমের মতো করেই সরকারী অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরণের স্কিমের চালু করা হলে সরকার তার কার্যক্রম পরিচলানার জন্য নাগরিকদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হবে এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান সুশাসনের ঘাটতিকে আরো বেশি বাড়িয়ে দিবে। কাজেই প্রত্যয় স্কিমটি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ চালু করলেও তার খারাপ প্রভাব সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরে পড়বে। এমনকি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ নিজেও দেশের নাগরিকদের তাদের কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হবেন। প্রত্যয় স্কিমের পজিটিভ এবং নেগেটিভ দিক বিবেচনায় আমরা এটিকে ‘পলিসি প্যারাডক্সে’-র একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে দেখছি।  

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ও সর্বজনীন পেনশন স্কিম 

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ৫টি পেনশন স্কিম বাস্তবায়ন করেছেন। নতুন আরেকটি স্কিমের ব্যাপারে ২০২৪ সালের বাজেটে আলোচনা হয়েছে যা ১লা জুলাই ২০২৫ থেকে কার্যকর হবে।  সব মিলিয়ে আমরা ৬টি সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ব্যাপারে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানতে পেরেছি। 

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ও সর্বজনীন পেনশন স্কিম

সেবক ছাড়া বাকি পাঁচটি স্কিম ইতিমধ্যেই কার্যকর করা হয়েছে। পাঁচটি স্কিমের মধ্যে প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা, ও সমতা স্কিমগুলোতে নাগরিকের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়। এই স্কিমগুলোতে একজন নাগরিককে তার নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, প্রত্যয় পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করে স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং তাদের অধীনস্থ অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাগরিকদের সে অধিকার খর্ব করার মাধ্যমে অসমতা করা হয়েছে। 

প্রতিটি পেশার ভিন্নতাকে উপেক্ষা করে পাঁচটি স্কিমের ক্ষেত্রেই অবসরকালীন সময় সম্ভাব্য মাসিক পেনশনের সুবিধার পরিমাণ সমান রাখা হয়েছে।  উদাহরণস্বরূপ, প্রবাসী, প্রগতি, সুরক্ষা এবং প্রত্যয় এই চারটি স্কিমে মাসিক চাঁদার হার ৫ হাজার টাকা করে ৪২ বছর চাঁদা প্রদানের পর সম্ভাব্য মাসিক পেনশন হবে ১,৭২,৩২৭ টাকা। সমতা স্কিমে একমাত্র চাঁদার হার ১০০০ টাকা, যা সুরক্ষা স্কিমের ১০০০ টাকার হারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমতা ও সুরক্ষা স্কিমে মাসিক চাঁদার হার ১ হাজার টাকা করে ৪২ বছর চাঁদা প্রদানের পর সম্ভাব্য মাসিক পেনশন হবে ৩৪,৪৬৫ টাকা। কাজেই আমরা বলতে পারি যে অবসরকালীন সময়ে সম্ভাব্য পেনশন সুবিধার পরিমাণ নির্ধারণে নাগরিকদের মধ্যে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হয় নাই। 

 

প্রত্যয় স্কিম এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলন 

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সেবক স্কিমটি এখনো চালু হয়নি। যেখানে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিজেদের জন্য সেবক চালু করে অন্যদের জন্য উদাহরণ তৈরী করতে পারতো সেখানে সবার শেষে তাদের অন্তর্ভুক্তি জনমনে সন্দেহ তৈরী করেছে। প্রত্যয় ছাড়া অন্য স্কিমের কেউ যেহেতু পূর্বে পেনশনের আওতায় ছিলোনা তাই এই সব স্কিমের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কত বেশি পেনশন সুবিধা পাওয়া যেত সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলেনি কিন্তু প্রত্যয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন। এই প্রশ্ন তোলার পেছনে যে সমস্ত বিষয় নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে তা হলোঃ 

১। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিলো সর্বজনীন পেনশন স্কিমে শুধুমাত্র যাদের পেনশন ব্যবস্থা নাই তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাহলে তড়িঘড়ি করে কেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রত্যয় স্কিম চালু করা হলো?

২। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সেবক স্কিমের সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ইতিমধ্যে একি পেনশন পদ্ধতির আওতায় ছিলেন। তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেন আলাদা করা হলো?  

৩। ২০১৫ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরোধীতা স্বত্তেও শিক্ষক ও সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একই জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুবিধা খর্ব করা হয় যার জন্য শিক্ষকদের মনে এখনো অসন্তোষ বিরজামান। এই বেতন স্কেল অন্যান্য সরকারী দপ্তরে নাগরিকদের চাকরির ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে পারলেও শিক্ষকতা পেশার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। পরবর্তীতে শিক্ষকরা দেখেছে কিভাবে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শিক্ষকদের নানাবিধ সুবিধা কর্তন করেছে এবং এককভাবে তাদের জন্য সুবিধা বর্ধিত করেছে। ফলে শিক্ষকদের মনে এই প্রশ্ন ছিলো যে, যদি শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তই করা হবে তা হলে একি স্কেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এতো বৈষম্য করে পলিসি কেন? প্রত্যয় স্কিমের বাধ্যতামূলক প্রবর্তন এবং সেবক সম্পর্কে এখনো জনগনকে কিছু না জানানো, সে প্রশ্নগুলোকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসছে। তাহলে কি শিক্ষকরা আবারো বৈষ্যম্যের সম্মুখীন হচ্ছেন? তাহলে কি ভবিষ্যতে এই পেশায় আসার জন্য কোন যোগ্য নাগরিককে পাওয়া যাবে না? প্রত্যেক শিক্ষকের মনে হয়ত এখন এই প্রশ্নগুলো যার উত্তরের উপর হয়তো নির্ভর করছে শিক্ষকতার ভবিষ্যত তথাপি দেশের টেকসই উন্নয়ন।   

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে শিক্ষকরা যা পেয়েছেন তা ভেবে যারপরানই তারা ব্যথিত হয়েছেন। তারা অর্থের সময় মূল্য বিবেচনায় ও বর্তমান পেনশন ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে এটি শতভাগ নিশ্চিত হয়েছেন যে এই প্রত্যয় স্কিমটি শিক্ষকতা পেশাকে অনিশ্চিয়তার দিকে ঠেলে দিবে।  গত ৩ মাস ধরে  শিক্ষকরা তাদের শান্তিপূর্ণ ভাষার মাধ্যমে সরকারকে বিষয়গুলো বুঝানোর চেষ্ঠা করেছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এই স্কিম বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা বাংলাদেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক কালো অধ্যায়ের সূচনা করবে। কারণ, এর ফলে দেশের নাগরিকরা একদিকে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ হারাবে, অন্যদিকে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাবে। তাই 'প্রত্যয়' স্কিম দেশকে মেধাশূণ্য করার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রত্যয় স্কিম ও বর্তমান পেনশন স্কিমে আর্থিক সুবিধার তুলনামূলক আলোচনা 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষকরা গাণিতিক হিসাব করে প্রমাণ করেছেন যে, এই স্কিমটি তাদের বিদ্যমান পেনশন স্কিমের তুলনায় অনেক কম আকর্ষণীয়। তাদের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, নতুন স্কিমে যোগদানকারী শিক্ষকদের অবসরকালে কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। যেহেতু ভবিষ্যতের প্রকৃত মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার কত হবে তা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়, তাই প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ জানা সম্ভব নয়। তবে শতভাগ নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকার কম হবে না। লেখার দৈর্ঘ্য বিবেচনা করে বিস্তারিত হিসাব এই লেখা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের মতামত হলো, অসবরকারলীন সময়ে আর্থিক সুবিধা বিবেচনায় প্রত্যয় স্কিমটি বর্তমান পেনশন স্কিম থেকে অনেক কম সুবিধা দিচ্ছে এটি নিয়ে আর তর্কের সুযোগ নাই।

তবে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কত হতে পারে সেটা নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলোতে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকেরা বিস্তারিত জানতে চাইলে সেগুলো পড়ে দেখতে পারেন। এক্ষেত্রে, ৮ই জুলাই প্রথম আলো পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত ‘প্রত্যয় স্কিমের ‘ডাবল বেনিফিট’ এবং ‘শুভংকরের ফাঁকি’ শিরোনামের লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন। এছাড়া যারা ফেসবুক ব্যবহার করেন তারা নিম্নের লিংকে গিয়ে প্রত্যয় ও বর্তমান পেনশন স্কিমের একটি তুলনামূলক চিত্র দেখতে পারবেন। সেখানে লেখক দেখিয়েছেন যে প্রত্যয় স্কিমে একজন নতুন শিক্ষকের সর্বমোট ক্ষতির পরিমাণ হবে ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ফেসবুক লিংকঃ https://www.facebook.com/share/p/S5TnASi9tip9NHs2/

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের দুইটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। প্রথমত, সর্বজনীন পেনশন স্কিমগুলো দেশের সকল নাগরিককে পেনশনের আওতায় আসার সুযোগ করে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই স্কিমগুলো কন্ট্রিবিউটরি পেনশন স্কিম যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। কাজেই এই উদ্যেগটির জন্য সরকারের ভূয়সী প্রশংসা না করে পারছিনা। প্রত্যয় স্কিমের এই ভালো দিকগুলো ধরে রেখে কিভাবে প্রত্যয় স্কিমে পরিবর্তন আনলে সেটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য গ্রহণ যোগ্য হবে সেটি সরকারের ভেবে দেখা উচিত। এই বিষয় গত ১০ই জুলাই যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মসফিক উদ্দিন প্রথম আলো পত্রিকায় প্রত্যয় স্কিমের উপর মতামত প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি কিভাবে প্রত্যয়ের সুবিধাগুলোকে ঠিক রেখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় সে ব্যাপারে বিস্তারিত কথা বলেছেন। পাঠক ও নীতি নির্ধারকদের লেখাটি বিস্তারিত পড়ার অনুরোধ রইলো। লেখাটির শিরোনাম ছিলোঃ ‘প্রত্যয় স্কিমে প্রত্যয়ের অভাব, ভালো উদ্যোগ যেন ব্যর্থ না হয়’। 

তবে মোটাদাগে বলতে গেলে বলতে হয়, প্রত্যয় যেন বিদ্যমান পেনশন সুবিধা না কমায় সেটি স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে গ্র্যাচুইটি সুবিধা বাতিল না করা, প্রতি বছর পেনশনের পরিমাণ মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয় করার সুযোগ রাখা, অর্জিত ছুটির আর্থিক সুবিধা বাতিল না করা, কন্ট্রিবিউটরি পেনশন স্কিম চালুর আগে বেতন স্কেলে সংশোধন আনা উল্লেখযোগ্য। 

প্রত্যয় স্কিম কেন এই পলিসি প্যারাডক্স তৈরী করলো? 

যেকোনো পাবলিক পলিসি প্যারাডক্স তৈরি করতে পারে, এবং এর ফলে অপ্রত্যাশিত পরিণতি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এই প্যারাডক্সগুলো পূর্ব থেকেই অনুমান করা সম্ভব, আবার অনেক সময় নীতি বাস্তবায়নের পরে সেগুলো প্রকাশ পায়। প্রত্যয় স্কিমের ক্ষেত্রে, আমরা বাস্তবায়নের পরে এই সমস্যাগুলি সম্পর্কে জানতে পারছি। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ এই প্যারাডক্স সমাধানের জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আশঙ্কা দূর করার জন্য এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছে। এই প্যারাডক্স তৈরির পেছনে আমরা দুটি মূল কারণ চিহ্নিত করতে পেরেছি।

প্রথমত: প্রত্যয় স্কিমটি চালু করার আগে বিদ্যমান পেনশন সুবিধাভোগী সকল স্টেকহোল্ডারের সাথে কোন ধরণের আলোচনা করা হয়নি। সাধারণত, কোন চাকরিতে সুবিধা কমানো হয় না বরং বৃদ্ধি করা হয়। প্রত্যয় স্কিমের ক্ষেত্রে যেহেতু সুবিধা হ্রাস করা হচ্ছে, অবশ্যই সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সাথে আলোচনা করা আবশ্যক ছিল।

দ্বিতীয়ত: দক্ষ জনবল নিয়োগের সাথে জড়িত সরকারি দপ্তর বা বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ না করেই প্রত্যয় স্কিম চালু করা হয়েছে।

এই মূহুর্তে কি করণীয় থাকতে পারে? 

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলি গ্রহণের মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আশঙ্কা দূর করার উদ্যোগ নিতে পারেন:

১। যেহেতু সরকারের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা একি বেতন স্কেলে আছেন, তাই পেনশন স্কিম এক হওয়া উচিত। একি বেতন কাঠামোতে ভিন্ন ভিন্ন স্কিম প্রশাসনিক জটিলতা তৈরী করবে।

২। প্রত্যয় স্কিম যেন বিদ্যমান পেনশন সুবিধা না কমায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে এবং সেটি স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই নিশ্চিত করতে হবে।

৩। প্রত্যয় স্কিম চালুর পূর্বেই বেতন স্কেলে সংশোধনী আনতে হবে যাতে নাগরিকদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা যায়। বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে জাতীয় পে-স্কেল চালুর মাধ্যমে এই ধরণের সংশোধনী এনেছিল। তখন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে আমরা সরকারকে দুটি বিষয়ে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে পরামর্শ দিচ্ছি। প্রথমত: বেসরকারি চাকরির বেতন কাঠামো বিবেচনা করে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সরকারের সকল ধরণের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করা উচিত। দ্বিতীয়ত: সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন ধরণের পেশা রয়েছে। পেশার ভিন্নতা বিবেচনা করে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মধ্যে ভিন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।

৪। এক্ষেত্রে সরকার চাইলে শিক্ষকের মর্যাদা, জ্ঞান ভিত্তিক সমাজে শিক্ষকের গুরুত্ব এবং এই পেশার অনন্যত্ব বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল চালু করতে পারেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকতার ক্ষেত্রে কমন পে-স্কেলের সাথে ভিন্ন ভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং প্রতিযোগিতার জন্য বিভিন্ন পেশা ও একই পেশার মধ্যে সুযোগ-সুবিধার ভিন্নতা থাকা প্রয়োজন।  

আমরা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিয়ে পুনরায় বলতে চাই, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য 'প্রত্যয়' ও সমজাতীয় স্কিম বাস্তবায়নের পূর্বে জাতীয় পে-স্কেলে সংশোধনী আনা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায়, আন্দোলনরত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আশঙ্কা সত্য হতে পারে। নাগরিকদের সরকারী পেশার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে না পারলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে দক্ষতার উন্নয়ন আমরা লক্ষ্য করছিলাম তা ব্যাহত হবে। শুধু তাই নয়, এটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের ঘাটতি আরো বাড়িয়ে দিবে। 'প্রত্যয়' স্কিমের 'প্যারাডক্স' সমাধানের মাধ্যমেই প্রত্যয়কে প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন করা সম্ভব। পাশাপাশি, 'প্রত্যয়' স্কিম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অন্যান্য স্কিমের 'প্যারাডক্স' থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

উপসংহার 

প্রত্যয় স্কিমটি বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থায় কি প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা থাকার কারণেই মূলত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই স্কিম বাতিলের জন্য আন্দোলন করছেন। কাজেই আন্দোলনটি ব্যক্তিস্বার্থে চালিত নয়, বরং দেশের বৃহত্তর কল্যাণে। বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবী উপেক্ষা করে জাতীয় বেতন স্কেল প্রবর্তন করে যা সরকারের অন্যান্য পেশায় নাগরিকদের আগ্রহী করে তুলতে সক্ষম হলেও শিক্ষকতায় সম্ভব হয়নি। সর্বেশষ বেতন স্কেল প্রবর্তনের পরে মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় গত ৯ বছরে বেসরকারীখাতে সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও সরকারী বেতন স্কেলে কোন ধরণের পরিবর্তন আসেনি। নাগরিকদের সরকারী পেশার প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য এবং বিদ্যমান যারা এই পেশায় আছেন তাদের ধরে রাখার জন্য সময় যখন বেতন স্কেল সংশোধণের, তখন প্রত্যয় স্কিম প্রবর্তন করা হলো। এমতবস্থায় শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছে যে, প্রত্যয় স্কিমটি বোধহয় শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্ববংসের শেষ পেরেক। মুদ্রাস্ফীতি, দীর্ঘদিন স্থবির বেতন কাঠামো ও প্রত্যয় পেনশন স্কিমের মধ্যে দিয়ে বিদ্যমান সুবিধা কেড়ে নেয়া, সবমিলিয়ে দেশের নাগরিকরা শিক্ষকতা পেশায় প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে ব্যহত করবে। 

লেখকদ্বয় যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।