দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এবং বিলম্বিত চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর সেরে ভারত থেকে বৃহস্পতিবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে অভিমুখী বা বহির্গামী উচ্চপর্যায়ের সফর মাত্রই যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তা নতুন উচ্চতা যোগ করে তা একেবারেই অনভিপ্রেত নয়। তবে ভারত-বাংলাদেশে শীর্ষ নেতৃত্বের মোলাকাত মানেই, দুদেশের মানুষের রাশি রাশি প্রত্যাশা। জনমানসে নানা রঙের, বিচিত্র বর্ণের জল্পনা এবং জিজ্ঞাসারাজি।
গত সোমবার শরতের এক রোদ ঝলমলে দুপুরে শেখ হাসিনা তার প্রতিনিধি নিয়ে নয়াদিল্লি সফরে আসেন। নয়াদিল্লির সঙ্গে ব্যক্তি শেখ হাসিনার পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে বৃক্ষমূলের মতো। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যার পর ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ দীর্ঘ ছয় বছর দিল্লি তাকে সান্ত্বনা ও কিঞ্চিৎ স্বস্তি দিয়েছে।শিখিয়েছে বৃক্ষরাজির মতো সাবলীল এবং সুদৃঢ় হতে, শিখিয়েছে হিন্দি ভাষা। দিল্লি এসেই বিনম্রচিত্তে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, "ম্যাঁয় হামেশা আভারি হু”।
প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর মঙ্গলবার সকালে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছালে একটি অশ্বারোহী দল তাকে স্বাগত জানায়৷ দেওয়া হয় লাল গালিচা সংবর্ধনা, প্রথামাফিক ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর দল গার্ড অব অনার দেয়৷ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷ ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকরের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা ও দ্রৌপদী মুর্মু/সংগৃহীতপ্রসঙ্গত, ভারতের প্রটোকল অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ভারত সফরে এলে তাকে বিমান বন্দর থেকে নিয়ে যেতে বা বিদায় জানাতে প্রধানমন্ত্রী বা সেই রাষ্ট্রদূতের সমপর্যায়ের কোনো মন্ত্রীর সশরীরে থাকা আবশ্যিক নয়।তবে মোদির আমলে প্রটোকল ভেঙে শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েক রাষ্ট্রনেতার ক্ষেত্রে অতীতে তার অন্যথা হয়েছে।
মঙ্গলবার অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে শেখ হাসিনা যান রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে৷
সফরের দ্বিতীয় দিনে, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সই সাতটি সমঝোতাপত্র। এগুলো যথাক্রমে- ১. রহমিপুর হয়ে বাংলাদেশের সিলেটে কুশিয়ারা নদী থেকে সুরমা-কুশিয়ারা প্রকল্পের আওতায় ১৫৩ কিউসেক পানিবণ্টনে সমঝোতা স্মারক, ২. ভারতের কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর) এবং বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (বিসিএসআইআর) মধ্যে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতায় সমঝোতা স্মারক, ৩. ভারতের ভোপালের ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি এবং বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, ৪. বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মীদের ভারতীয় রেলওয়ের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণের জন্য ভারত ও বাংলাদেশের রেল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, ৫. বাংলাদেশ রেলওয়ের আইটিবিষয়ক সহযোগিতার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের রেল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, ৬. ভারতের সরকারি সম্প্রচার সংস্থা প্রসার ভারতী ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক এবং ৭. মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতার মধ্যে সমঝোতা স্মারক।
এ সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং শেখ হাসিনা যৌথভাবে রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্পের ইউনিট-১ উন্মোচন করেন। প্রকল্পটি ভারতের রেয়াতি অর্থায়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মিত এবং বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করবে। খুলনা-মোংলা বন্দর ব্রডগেজ রেল প্রকল্পের ৬৪.৭ কিলোমিটারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ৫.১৩ কিলোমিটার রূপসা রেল সেতুও উদ্বোধন করেন দুই দেশের নেতা।
ভারত সফরের তৃতীয় দিনে মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সেনানীদের পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে বৃত্তির অর্থ তুলে দিয়ে স্কুলপড়ুয়াদের জন্য “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রবৃত্তি” চালু করেন শেখ হাসিনা। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উপস্থিতিতে ১০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে সেই বৃত্তি তুলে দিয়ে তিনি বলেন, “জওয়ান পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম দুই দেশের মৈত্রী দৃঢ় করতে সেতুর ভূমিকা পালন করবে।” এসএসসি পর্যায়ে ১০০ এবং এইচএসসি পর্যায়ে ১০০ জন, সর্বমোট ২০০ জন ছাত্রছাত্রী এই বৃত্তি পাবে এ বছরে। বৃত্তির পরিমাণ এসএসসি স্তরে এককালীন ৫০০ ডলার, এইচএসসি স্তরে ১০০০ ডলার রাখা হয়েছে । দুই দেশের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান, বঙ্গবন্ধুর সফল ও সুদৃঢ় নেতৃত্ব এবং ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্ক নিয়ে নিবিড় এক আলোচনা হয়।
এ সফরে এসে হাসিনা ফিরে যান অতীতে, তার দিল্লির দিনগুলোতে। সাক্ষাৎ করেন প্রণব মুখার্জির ছেলে, মেয়ে ও পরিবারের সঙ্গে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। পরবর্তীতে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবে না বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অর্ধনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে দুই দেশ সই করতে যাচ্ছে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট। ভারতের সঙ্গে এটিই হবে কোনো দেশের সঙ্গে ঢাকার প্রথম বাণিজ্যচুক্তি। পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ব ও ই-কমার্সের মতো অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকছে সেপার মধ্যে।প্রস্তাবিত এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১৯০% এবং ভারতের ১৮৮ % বৃদ্ধি পাবে। বাড়বে দুই দেশের মোট দেশজ উৎপাদনও। সফরের অন্য উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যিক সম্পকের উন্নতি। শিল্পপতি গৌতম আদানি তার নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে দ্রুত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেন।
সফরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তা, তথ্য যোগাযোগ, মহাকাশপ্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব ও সুনীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে দুই পক্ষই। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার নিয়েছেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের বিস্তার রুখতে তাদের আলোচনা হয়েছে। কোভিড পরবর্তীকালে অর্থনীতির প্রবাহ ফেরাতে এই সফরের গুরুত্ব থাকবে আগামী বেশকিছু সময় অবধি।
উচ্চপর্যায়ের ঘন ঘন সফর দু'দেশকে দিতে পারে এক নতুন দিগন্তের দিশা।
প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরতেই বিহ্বল প্রতীক্ষিত তিস্তার পানি বাংলাদেশে জোয়ার আছড়ে ফেলবে না। তবে খাদ্যভাণ্ডারে ভাঁটা পড়লেই ভারত যে পাশে থাকবে তার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রী হাসিনা পেয়েছেন।
বাংলাদেশেরও উচিত খাদ্য সংকটের আশঙ্কা হওয়া মাত্রই আগে থেকেই দিল্লিকে জানিয়ে রাখা।
ভারতের প্রদত্ত $৫০০ মিলিয়ন ক্রেডিটলাইন থেকে বেশকিছু সামরিক সরঞ্জাম কিনতে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ। তাদের মধ্যে রয়েছে ট্যাংক ও বিশেষ পরিবাহী যানবাহ। বাংলাদেশ যখন তার সেনাবাহিনীকে আধুনিকীকরণের এক প্রয়াস নিয়েছে, ভারতের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হবে আরও মজবুত ।
বৃহস্পতিবার সফরের শেষ দিনে আজমিরে মঈনুদ্দিন চিশতির দরগায় প্রার্থনা করেন। এটি এখানে তার চতুর্থ দর্শন। এখানকার সায়েদ কলিমুদ্দিন চিশতি শেখ হাসিনার পরিবারের খাদিম। দরগার সায়েদ ওয়ালিউদ্দিন চিশতি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খাদিম।
সব রাষ্ট্রীয় সফর চুক্তিকেন্দ্রিক হয় না। সব বোঝা-পড়াই চুক্তিতে সম্পন্ন হয় না, বিশেষত তা যখন দুই নিবিড় প্রতিবেশীর মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এই রাষ্ট্রীয় সফরের মধ্যে ছিল অনেকগুলো গন্তব্য, অনেকগুলো উদ্দেশ্য ।
অয়নাংশ মৈত্র, ভারতীয় সাংবাদিক ও কূটনীতি গবেষক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



