বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে সুসম্পর্ক, নানা সুবিধা আদায়ে সফলতা এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনের বাধা থাকা সত্ত্বেও ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) সদস্যরা প্রায় ৪,১০০ কিলোমিটার স্থল সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে গত কয়েক দশকে শত শত বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করেছে। গুলিতে বা মারধরের কারণে আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আরও অনেকেই।
মানবাধিকার কর্মী ও গবেষকরা বলছেন, সীমান্তে চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিনাবাধায় চালিয়ে নিতে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীরা ঘুষ নেন। ঘুষ ছাড়া মানুষের চলাচল, এবং গরু বা অন্য কোনো পণ্য পারাপার করতে চাইলেই গুলির ঘটনা ঘটছে। অথচ আইন বলছে, অপরাধী যদি সশস্ত্র হয় এবং আক্রমণ করে তবেই একজন সীমান্তরক্ষী তাকে গুলি করতে পারে। অন্যথায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের মাধ্যমে আদালতে হাজির করতে পারে।
ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ তিনদিকে ভারতের দ্বারা পরিবেষ্টিত। এছাড়া ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিসম্পন্ন দেশ, যারা চীন ও পাকিস্তানকে হুমকি মনে করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী বলে পেশীশক্তি খাটিয়ে এবং নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে যুগ যুগ ধরে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে নানাবিধ অন্যায় সুবিধা নিচ্ছে।
অথচ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা ও বাংলাদেশের সরকার প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছে। দিল্লীর এ ধরনের দ্বিচারিতা বাংলাদেশের নাগরিকদের সঙ্গে উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
এটি তাই একটি লজ্জার বিষয় যে, সীমান্তহত্যার মতো বেআইনি ও অমানবিক আচরণ পুরোপুরি বন্ধ করার ক্ষেত্রে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরেও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস উভয় সরকারই চরম অবহেলা দেখিয়েছে।
পত্রিকা মারফত জানা যায়, গত কয়েক দশকে সীমান্তে নিহত অধিকাংশ ব্যক্তিই ছিল আশেপাশের এলাকায় বসবাসকারী গরু চোরাচালানকারী। তাই ধরে নিই যে, এসব সীমান্তহত্যা কোনো রাজনৈতিক নয় বরং স্থানীয় ইস্যু। কিন্তু নিহত গরু চোরাচালানকারীরা তো নিরস্ত্র ছিল। নিহতদের মধ্যে অনেকেই আবার নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিক যারা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে বা কাজের সন্ধানে সীমান্ত পার হতে গিয়ে বা সীমান্ত সংলগ্ন জমিতে কৃষিকাজ করতে গিয়ে বিএসএফ সদস্যদের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
ফলে দেখা যাচ্ছে, বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি না মেনে মারণঘাতি অস্ত্র ও গুলি ব্যবহার করছে। তারা কখন-কাকে গুলি করবে বিষয়টা তাদের খেয়ালখুশির ব্যাপার। দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের জন্য অপমানজনক ও উদ্বেগের কারণ।
২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার আগে কংগ্রেস আমলেও সীমান্তহত্যার পাশাপাশি ঘুষের বিনিময়ে গরু-সোনা-অস্ত্র-তেল-চিনি চোরাচালান এবং অপরাধী ও সাধারণ মানুষদের অবাধ চলাচল ছিল। কিন্তু বিজেপি এসে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করলে বাংলাদেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। তথাপি বাংলাদেশে সস্তা ভারতীয় গবাদি পশুর চাহিদা এবং অবৈধ বেচা-কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ভারত শুধু মাংস রপ্তানি বাড়ানোর জন্যই নয়, বরং গায়ে পড়ে ভারতবিরোধী মনোভাবকে উস্কে দেওয়ার জন্য এমন তাড়াহুড়ো করে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।
দেশের আয়তন-জনসংখ্যা-অর্থনৈতিক শক্তির কারণে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব প্রকাশ করা ছাড়াও, অভিন্ন নদীর পানি বন্টনে অনিয়ম, রেল ও সড়ক পরিবহনে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়া, সমুদ্রবন্দর এবং স্পর্শকাতর এলাকায় বড় প্রকল্প পাওয়া এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সুবিধা ভোগ করার জন্য ভারতের উপর ক্ষিপ্ত বাংলাদেশি নাগরিকরা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারত এসব সুবিধা বেশি পেয়েছে। ফলে আওয়ামী বিরোধীরা সবসময় সেই সরকারকে তার নতজানু পররাষ্ট্রনীতির জন্য সমালোচনা করেছে।
ফেলানি হত্যা ও বিচারের আইওয়াশ
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি সীমান্তে ১৫ বছর বয়সী নিরস্ত্র কিশোরী ফেলানি খাতুনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ঢাকা এবং অন্যত্র মিছিলের ঢেউ বাংলাদেশকে উত্তাল করেছিল। সেদিন ফেলানি লাল জামা ও নীল সালোয়ার পরে তার বাবার সঙ্গে দিল্লি থেকে কুড়িগ্রামে দেশের বাড়িতে ফিরছিল। বিয়ে দেওয়ার জন্য তার বাবা তাকে নিয়ে দেশে ফিরছিল বলে পরে জানা যায়।
সীমান্ত পার হতে তারা দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে মই ব্যবহার করছিল। তার বাবা প্রথমে পার হয়ে গেলেও ফেলানির জামা সেই কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে যায়। তখন ভয়ে চিৎকার করলে বিএসএফ টহল দলের কনস্টেবল অমিয় ঘোষ তাকে গুলি করে। সেই গুলিবিদ্ধ নিথর দেহটা কাঁটাতারে ঝুলে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
এই নৃশংসতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ এবং নিন্দার ঝড় উঠলে ভারত বিএসএফ জওয়ানদের নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য করেছিল। তখনই যৌথ আলোচনায় ভারত মারণঘাতি নয় এমন বুলেট ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেটা ছিল লোকদেখানো একটা পদক্ষেপ।
এরপর ভারত একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেয়; দুই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিএসএফ একটি বিশেষ আদালতে ফেলানি হত্যার বিচার শুরু করেছিল। তবে কয়েক মাসের মধ্যে অপর্যাপ্ত প্রমাণের কারণে আত্মস্বীকৃত অভিযুক্তকে খালাস দেয় সেই আদালত। এরপর বিএসএফের এই বিচারকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট পিটিশনগুলো বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।
গত তিন দশকে সীমান্তে অসংখ্য হত্যা ও নির্যাতন সত্ত্বেও, ভারত শুধুমাত্র একটি ঘটনায় খুনী মনোভাবের বিএসএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে: ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ঘুষ না দেওয়ায় একটি ক্যাম্পে ২৩ বছর বয়সী বাংলাদেশি এক গরু ব্যবসায়ীকে বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন করার জন্য আট জওয়ানকে বরখাস্ত করেছিল এবং ক্ষতিপূরণ হিসাবে নির্যাতিতকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, ভারতীয় টিভি চ্যানেল এনডিটিভিতে নির্যাতনের ফুটেজ প্রচার করার কারণেই এটুকু বিচার করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ২০২০ সালে থেকে প্রতি বছর ১৭-৩০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তার আগের বছরগুলোতে গড়ে প্রায় ৫০ জন নিহত হয়েছেন। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিএসএফ সদস্যদের গুলিতে অন্তত ১৩ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
যুদ্ধ না থাকা সত্ত্বেও দুইটি প্রতিবেশী দেশ এভাবে চলতে পারে না। ভারতের উচিত নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হত্যার জন্য বাস্তবসম্পন্ন যুক্তি পেশ করা, অন্যায়ভাবে হত্যার জন্য দোষ স্বীকার করা, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের জন্য দায়ী বিএসএফ সদস্যদের বিচার করা এবং দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা।
দিল্লিকে মনে রাখতে হবে যে বর্তমান বাংলাদেশ একটি ভিন্ন ধরনের সরকারের অধীনে চলছে; এটি এমন কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে নয় যাকে ভারত সহজেই তার আজ্ঞাবহ ভাবতে পারে। দিল্লি নিশ্চয়ই জানে বাংলাদেশ একাধিক উন্নত দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ঈর্ষান্বিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আর তাই প্রতিবেশী, মিত্র এবং বাণিজ্য অংশীদারদেরও দায়িত্বশীল আচরণ শুরু করা উচিত। নতুন বাংলাদেশ এবং এর স্পষ্টভাষী-প্রতিবাদী জনগণ পরাশক্তি প্রতিবেশীকে প্রভু মানবে না।
চোরাকারবারিদের ধরতে চেয়েছিলেন রইসউদ্দিন
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি বিজিবির সেপাই মোহাম্মদ রইসউদ্দিন মর্মান্তিকভাবে খুন হন। তিনি যশোরে বিজিবি-৪৯ ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেদিন তিনি একটি টহল দলের নেতৃত্ব দেন যেটি বেনাপোলের ঝিলেপাড়া পোস্ট এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টাকালে একদল গরু পাচারকারীর মুখোমুখি হয়। বিজিবি জানায় একপর্যায়ে চোরাকারবারীরা আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরে যায় এবং ঘন কুয়াশার মধ্যে রইসউদ্দিন তার দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। পরে জানা যায়, তাকে মৃত অবস্থায় ভারতের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
বাংলাদেশ এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং তদন্ত দাবি করে। বিএসএফ কর্তৃপক্ষ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিজিবিকে নিশ্চিত করেছে, যে তারা ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করবে। তবে বিএসএফ কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত করেনি বরং হাসপাতালে লাশ নেওয়ার পর ভারতীয় পুলিশ তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে।
বাংলাদেশি নাগরিকরা বিএসএফ-এর এমন নির্মমতার কথা জানতে পেরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল এবং ভারতীয় পণ্য বয়কটের আহ্বান জানিয়েছিল, যা দৃশ্যত ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের অনুভূতিতে আঘাত করেছিল।
পশ্চিমবঙ্গ-ভিত্তিক অধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে জানায় যে, ঘটনাস্থলে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই, এবং কোটলা নদীই সীমানা হিসেবে কাজ করে। সেই নদীও তখন শুকিয়ে কাদায় ভরে গেছে।
দুই সীমান্ত বাহিনী পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দিয়েছে। বিএসএফ দাবি করেছে সেদিনের ঘটনার সময় নিহত ব্যক্তি গরু পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল। অন্যদিকে বিজিবি জানিয়েছে, রইসউদ্দিন চোরাকারবারিদের ধরার চেষ্টা করেছিল। তবে, মাসুমের কর্মীরা পর্যবেক্ষণে দেখতে পেয়েছেন যে, বিএসএফ সদস্যরা চোরাকারবারিদের বাধা দিলে তারা গরুর পাল ফেলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এরপর ধন্ন্যাখোলা ফাঁড়ির বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে কয়েকটি গবাদি পশু নিয়ে যায় এবং বাকি গবাদিপশুগুলোকে ১০৭ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের সুটিয়া বিওপির সদস্যরা নিয়ে যায়।
মাসুম অভিযোগ করেছে যে, ঘটনার সময় রইসউদ্দিন আগ্নেয়াস্ত্র থেকে কোনো গুলি করেনি, কিন্তু তথাপি বিএসএফ সদস্যরা তার পেটে গুলি করে। তারা জল্লাদ হিসেবে কাজ করেছিল। বিএসএফের উচিত ছিল তাকে গুলি করে হত্যা না করে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা। অধিকন্তু, ২২শে জানুয়ারি বনগাঁও এসডি হাসপাতালে রইসউদ্দিনের ময়নাতদন্ত করার পরেও ভারতীয় পুলিশ একই দিন ও পরের দিন সাব-ডিভিশনাল কর্মকর্তা সুরতহাল প্রতিবেদন করে আইন লঙ্ঘন করেছে। আবার ২২ জানুয়ারি মৃত রইসউদ্দিনের নামে মামলা করে বনগাঁও থানা পুলিশ।
মানবাধিকার সংগঠন মাসুম জানায়, আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান বা ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য বিএসএফ কোনো অবস্থাতেই কাউকে মেরে ফেলতে পারে না।
দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন ইস্তাফান
মেহেরপুর সদর উপজেলার শালিকা গ্রামের মৃত কোমর আলীর মেয়ে ইস্তাফান খাতুন এ বছরের ১ জুলাই বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টাকালেও বিএসএফ সদস্যরা আইন মানেনি। সেদিন রাতে ভারতীয় দালালের সহায়তায় ইস্তাফান যখন কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে অন্যপাশে অপেক্ষারত ভাইয়ের কাছে যাচ্ছিল, তখনি বিএসএফ ৮ম ব্যাটালিয়নের অধীন নদীয়ার তেহাট্টোর নাটনা ক্যাম্পের সদস্যরা গুলি ছুঁড়ে তাকে হত্যা করে।
৩০ বছর বয়সী ইস্তাফান মেহেরপুরে জন্মগ্রহণ করলেও শৈশব থেকেই বিহারে বসবাস করছিলেন। ভারতীয় একজন ব্যক্তির সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল, তবে সেই স্বামী কিছুদিন আগে মারা যান। সে কারণে ইস্তাফান তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন।
মৃত্যুর আগে তিন দিন ধরে তিনি তেহাট্টোর নবীনগরের একটি বাড়িতে অবস্থান করে মেহেরপুরে স্বজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। তার স্বজনরা বলছেন, ২-৩ বছর আগেও সে একবার একইভাবে বাংলাদেশে এসেছিল এবং কয়েক সপ্তাহ থেকে আবার চলে যায়। এরপর গত দেড় বছরে কয়েকবার চেষ্টা করেও তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেননি। স্বজনরা ইস্তাফানের লাশ ফেরত পেতে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করলে কর্মকর্তারা তাদের কোনো আশ্বাস দিতে পারেননি; কারণ ঘটনাটি ভারতের অভ্যন্তরে ঘটেছে।
স্বর্ণা তার ভাইকে দেখতে চেয়েছিল
সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর ১৪ বছর বয়সী স্বর্ণা দাসের মৃত্যু শিরোনাম হয়েছে এবং সরকার ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে অনেক ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। সেদিন রাত ৯টার দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লালারচক সীমান্ত এলাকায় নিরস্ত্র স্বর্ণা, তার মা এবং অন্যরা ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিএসএফ সদস্যরা গুলি ছুঁড়ে এবং এতে স্বর্ণা ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এরপর বিএসএফ স্বর্ণার লাশ নিয়ে চলে যায়।
তার বাবা জুড়ী উপজেলার কালনিগড় গ্রামের বাসিন্দা পোরেন্দ্র দাস জানান, স্থানীয় দুই দালালের সহায়তায় স্বর্ণা, তার মা সঞ্জিতা রাণী দাস তাদের বড় ছেলেকে দেখতে ত্রিপুরা যাচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিল চট্টগ্রাম থেকে আসা এক দম্পতি। তারাও গুলিতে আহত হয়ে সিলেটের ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
ফেলানির মৃত্যুর পর যেমন গণবিক্ষোভ হয়েছিল, এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে বাংলাদেশে। সরকার ও জনগণ উভয়েই বিএসএফ-এর নৃশংসতার ইতি চায়। এর ফলে সীমান্ত নীতি পর্যালোচনা এবং দায়িত্বশীল আচরণ করার জন্য ভারত সরকারের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া এমনই ইঙ্গিত দেয়। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই হত্যাকাণ্ডকে জঘন্য, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেছে। সীমান্তে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ১৯৭৫ সালে নির্ধারিত ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নির্দেশিকার লঙ্ঘন এবং পুনরাবৃত্তি রোধ করে প্রতিটি ঘটনার তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবিও জানিয়েছে বাংলাদেশ।
গরু কেনাবেচা নাকি অন্য কিছু?
গ্রেপ্তারকে অগ্রাধিকার না দিয়ে বিএসএফের গুলি করে হত্যার প্রবণতা সম্পর্কে অবসর গ্রহণের ঠিক আগে ২০১২ সালের নভেম্বরে তৎকালীন বিএসএফ প্রধান ইউকে বনসাল কিছু পর্যবেক্ষণ জানিয়েছিলেন। তিনি পরামর্শ দেন যে, ভারত গরু রপ্তানি করলে সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ হবে। তবে তার সময়েও বিএসএফ-এর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করতে ভারত সর্বদা আত্মরক্ষার অজুহাত দিত।
গরু চোরাচালান ছাড়াও দুই দেশের সীমান্তে কিছু নিয়মিত সমস্যা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্তঃসীমান্ত চলাচল, অস্ত্র, সোনা এবং জাল মুদ্রার চোরাচালান, অবৈধ মাদক কারখানা এবং মাদক চোরাচালান এবং মানবপাচার। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি দিনের মতো পরিষ্কার যে বিজিবি ও বিএসএফের সদস্যরা ঘুষের বিনিময়ে সব অবৈধ কাজ চালিয়ে যেতে দেয়।
বিগত বছরগুলোতে বিজিবি সদস্যরা সবসময় সংযম দেখিয়েছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য তারা কোনো ভারতীয় নাগরিক বা বিএসএফ সদস্যদের হত্যা বা নির্যাতন করেনি। আবার আইন অনুসরণ করে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বিএসএফ-কে একই ধরনের মানসিকতা দেখাতে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এখন আর আগের মতো নমনীয়তা দেখাবে না বাংলাদেশ। সমবেতভাবে আওয়াজ তুলে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের মাধ্যমে সীমান্তে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও অপহরণ চিরকালের জন্য বন্ধ করাই হোক বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য।