প্রবাসীর চোখে

ইউরোপ-আমেরিকার স্বপ্ন: সংকটের পৃথিবীতে অভিবাসনের বাস্তবতা

ইউরোপ আর আমেরিকা—এই দুই নাম আমাদের দেশের মানুষের কাছে যেন কোনো গল্পের রাজ্য। যে রাজ্যে গেলে সব দুঃখ, কষ্ট দূর হয়ে যায়। মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অভাব-অভিযোগের একটা স্বপ্নময় সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে এই রাজ্যগুলোও নিজেদের সমস্যায় এতটাই ডুবে গেছে যে সেখানে পৌঁছানোর স্বপ্ন যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, বাস্তবতার মাটি ভীষণ রুক্ষ।

আজকাল ইউরোপ আর আমেরিকায় বসবাসের অনুমতি পাওয়া যেন এক অসম লড়াই। একসময় এই দেশগুলো নিজেদের দরজা খুলে রেখেছিল, কারণ তখন তাদের অর্থনীতি আর শিল্প-সংস্কৃতিতে বাইরের মানুষের দরকার ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। কোভিড মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, তার ছাপ পড়েছে উন্নত দেশগুলোর ঘরে। সেই উন্নত দেশগুলো, যারা একদিন গর্ব করে অভিবাসীদের আহ্বান জানিয়েছিল, আজ তাদের সীমান্তে কঠোর পাহারা বসিয়েছে।

ইউরোপের দেশগুলোতে জ্বালানি সংকট এখন এক দৈনন্দিন বাস্তবতা। রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর সেখানকার বাজারে পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। খাবার থেকে বাসস্থানের ভাড়া, সবকিছুরই দাম বেড়ে চলেছে। যারা সেখানকার পুরোনো নাগরিক, তারাই নিজেদের জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। অভিবাসীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা তো দূরের কথা, বরং তাদের জন্য জীবনের পথ আরও কঠিন করে দেওয়া হচ্ছে।

আমেরিকার অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। বিশ্বমঞ্চে বড় শক্তি হওয়ার গর্ব তাদের আছে বটে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আর রাজনীতি তাদেরকেও ধোঁয়াশায় ঠেলে দিয়েছে। কর্মসংস্থানের অভাব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং স্থানীয়দের মধ্যে অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভ এই দেশের অভিবাসন নীতিকে আগের চেয়ে কঠোর করে তুলেছে।

তবু আমাদের তরুণরা কেন পাগলের মতো এই দেশগুলোর দিকে ছুটে যায়? কেন তারা তাদের নিজের মাটি, নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতিকে ছেড়ে দূরের অজানা জগতে পাড়ি জমাতে চায়? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে।

আমাদের দেশে শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতার কোনো মিল নেই। যে তরুণটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে, সে আদৌ কাজের জন্য প্রস্তুত কি-না, সেটাই এক বড় প্রশ্ন। তার ওপর কাজের সুযোগও অপ্রতুল। যে সমাজে চাকরির বাজার এতটা সংকুচিত, যেখানে একজন গ্র্যাজুয়েটকে মাসের পর মাস বেকার থাকতে হয়, সেখানে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন তরুণদের জন্য এক স্বাভাবিক আকর্ষণ। তারা ভাবে, বিদেশ মানেই টাকা, বিদেশ মানেই সম্মান।

কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে রয়েছে এক অন্ধকারময় জগৎ। বিদেশে যাওয়ার নাম করে হাজারো তরুণ প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এজেন্সিগুলোর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, ভুয়া ভিসা, এবং অসহায় মানুষের সহজ সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অনেকেই তাদের সম্পদ আর সময় দুটোই হারাচ্ছে। যারা শেষ পর্যন্ত ইউরোপ বা আমেরিকায় পৌঁছায়, তাদের অনেকেই বুঝতে পারে যে বাস্তবতা স্বপ্নের থেকে অনেক বেশি কঠিন।

ইউরোপ-আমেরিকা এখন কেবল দক্ষ এবং যোগ্য মানুষের জন্য। অদক্ষ শ্রমিকদের সুযোগ ক্রমশ কমছে। অভিবাসনের নীতিগুলো কঠোর হচ্ছে, ভিসা পাওয়ার জন্য অনেক অর্থ আর সময় লাগছে। যারা সেখানকার মাটিতে পা রাখছে, তাদের জন্য কাজের বাজার প্রতিযোগিতায় ভরা। বিদেশে গিয়ে কাজ করার মানে হলো দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা খাটুনি, কোনো সামাজিক সুরক্ষা ছাড়া। অনেকেই অমানবিক অবস্থায় কাজ করে, কিন্তু দেশের মানুষের কাছে তাদের গল্প শোনানোর সাহস পায় না।

তবুও এই তরুণদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের সমাজে এমন একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বিদেশে যাওয়াকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। কেউ নিজের দেশেই সাফল্য অর্জন করলে সেটা ততটা বড় বিষয় নয়, যতটা বিদেশ থেকে টাকা পাঠালে। ফলে তরুণরা নিজের মাটিতে থেকে লড়াই করার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলে।

আমাদের উচিত এই প্রবণতা বদলানো। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশেই যাতে তারা নিজেদের একটা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। দেশের ভেতরে যদি একটা সুন্দর ব্যবস্থা তৈরি হয়, তবে বিদেশে যাওয়ার জন্য এই দৌড় কিছুটা হলেও কমবে।

বিদেশে যাওয়া মানেই যে জীবনের সব সমস্যার সমাধান, এই ধারণা পাল্টানো দরকার। কারণ পৃথিবীর কোনো দেশই এখন অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়। নিজের মাটিতেই যদি দাঁড়ানোর জায়গা তৈরি করা যায়, তবে হয়তো একদিন আমাদের তরুণরা সেই মাটি ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাববে না।

সজীব খান, উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী, লিসবন, পর্তুগাল ।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।