বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৩ কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবে প্রচলিত টাইপ-১ বা টাইপ-২ ছাড়াও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখন ডায়াবেটিসের সম্পূর্ণ নতুন এক ধরন নিয়ে আলোচনা করছেন, যা ‘টাইপ-৫’ ডায়াবেটিস নামে পরিচিত। দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির কারণে সৃষ্ট এই রোগটি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে না পারায় বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ রোগী ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া) বা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
টাইপ ৫ ডায়াবেটিস কী এবং কেন হয়?
সাধারণত টাইপ-১ হলো একটি অটোইমিউন অবস্থা যেখানে শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না এবং টাইপ-২ হলো ইনসুলিন প্রতিরোধের সাথে সম্পর্কিত। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, ‘টাইপ-৫’ সরাসরি দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির সাথে জড়িত, যা মানবদেহের ইনসুলিন উৎপাদনকারী অঙ্গ অগ্ন্যাশয়ের (প্যানক্রিয়াস) স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
এই রোগে আক্রান্তদের শরীরে সামান্য ইনসুলিন তৈরি হলেও তা শরীরের জন্য পর্যাপ্ত নয়। অথচ, তারা ইনসুলিনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হন। ফলে প্রচলিত টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মতো সাধারণ মাত্রার ইনসুলিন দেওয়া হলেও তা এই রোগীদের শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। এশিয়া এবং সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো যেসব অঞ্চলে শৈশবকালীন অপুষ্টির হার বেশি, সেখানে এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
লক্ষণ ও ভুল চিকিৎসার শিকার রোগীরা
টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলোর সাথে টাইপ-১ এর হুবহু মিল রয়েছে। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো: গুরুতরভাবে কম ওজন বা হঠাৎ দ্রুত ওজন হ্রাস পাওয়া, একটানা তীব্র ক্লান্তি অনুভব করা, ঘন ঘন মুখ শুকিয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগা এবং রোগ নির্ণয় না হলে অন্ধত্ব, কিডনি বিকলতা, স্নায়ুর ক্ষতি এবং ক্ষত না শুকানোর ফলে অঙ্গচ্ছেদের ঝুঁকি।
যেহেতু এই রোগটি সাধারণত কম ওজনের তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তাই চিকিৎসকেরা প্রায়ই এটিকে ভুল করে টাইপ-১ হিসেবে শনাক্ত করেন। উদাহরণস্বরূপ, উগান্ডায় বসবাসকারী ৩০ বছর বয়সী নোয়েলা মুকুম্বি এবং লন্ডনের ২৬ বছর বয়সী সাংবাদিক সোফিয়া শেয়ারার - উভয়ই শৈশবে গুরুতর অপুষ্টি ও কম ওজনের সমস্যায় ভুগেছেন এবং পরবর্তীতে ভুল চিকিৎসার কারণে তীব্র শারীরিক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন। নোয়েলার ক্ষেত্রে ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে মেটফরমিন (যা টাইপ-২ এর ওষুধ) দেওয়ার পর তার স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিতর্ক
টাইপ-৫ ডায়াবেটিস নির্ণয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো ল্যাব টেস্ট বা ‘মার্কার’না থাকায় বিশ্বে এটি নিয়ে এখনো বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে।
আইডিএফ-এর স্বীকৃতি: ২৫১টি জাতীয় ডায়াবেটিস সংস্থাকে নেতৃত্ব দেওয়া ‘আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন’ (আইডিএফ) গত বছর (২০২৫ সালের এপ্রিল) এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত ৫০ জনেরও বেশি বিজ্ঞানীর একটি গবেষণার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডব্লিউএইচও-এর অবস্থান: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন এখনো এটিকে আলাদা রোগ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ড. ভি মোহানের মতে, সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা পদ্ধতি ছাড়া এটিকে আলাদা ধরন বলা কঠিন; এটি কম ওজনের মানুষের মধ্যে টাইপ-১ বা ২ এর একটি ভিন্ন রূপও হতে পারে। তবে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, পর্যাপ্ত বৈশ্বিক প্রমাণ মিললে ভবিষ্যতে তারা এটিকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
অর্থায়ন সংকট ও ভবিষ্যতের বড় শঙ্কা
সুনির্দিষ্ট ল্যাব টেস্টের অভাবে চিকিৎসকেরা এখনো শৈশবের অপুষ্টি, কম ওজন এবং ইনসুলিনের প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার মতো লক্ষণ দেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আইডিএফ ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্ণয় মানদণ্ড ও চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু রোগী উন্নত পুষ্টি ও সাবধানে ব্যবস্থাপিত ওষুধে সাড়া দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৬ লাখেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালে ‘ডায়াবেটিস কেয়ার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, স্থূল বা মোটা নয় এমন মানুষের মধ্যে তথাকথিত 'লিন ডায়াবেটিস' বা অপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিসের হার বাড়ছে।
তবে বর্তমানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বাজেট এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় দাতাদের বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় এই গবেষণার অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটে আক্রান্ত অঞ্চলগুলোতে এ রোগ আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রফেসর হকিন্স সতর্ক করে বলেছেন, “আমরা সম্ভবত একটি গুরুতর বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। এটি আগামী প্রজন্মের জন্য খুব খারাপ সংবাদ বয়ে আনবে।”