সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে হাজার বছর ধরে টিকে আছে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণ। বিয়ে হোক কিংবা নিরাপদ বিনিয়োগ - মানুষের জীবনের সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক অস্থির বাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছানোয় অনেকে যেমন কেনার পরিমাণ কমিয়েছেন, তেমনি অনেকে একে নিরাপদ বিনিয়োগ ভাবছেন। তবে স্বর্ণ কেনার সময় ‘ক্যারেট’, ‘হলমার্ক’ বা ‘খাদ’- এই শব্দগুলো নিয়ে অনেক ক্রেতাই জটিলতায় পড়েন।
ক্যারেট কী এবং গহনায় কেন খাদ মেশানো হয়?
স্বর্ণের বিশুদ্ধতা মাপার আন্তর্জাতিক একক হলো ক্যারেট। খনি থেকে উত্তোলনের পর প্রায় শতভাগ খাঁটি নরম স্বর্ণই ২৪ ক্যারেট হিসেবে পরিচিত, যা সাধারণত বার, কয়েন বা বিস্কুট আকারে সংরক্ষণ করা হয়। অত্যন্ত নরম হওয়ায় ২৪ ক্যারেটের স্বর্ণ দিয়ে গহনা তৈরি করা যায় না।
তাই গহনাকে শক্ত ও টেকসই করতে এর সাথে তামা, রুপা, দস্তা বা নিকেলের মতো ধাতু মেশানো হয়, যা খাদ নামে পরিচিত। খাদ মেশানো মানেই ঠকানো নয়, বরং গহনা তৈরির জন্য এটি আবশ্যক। এই খাদের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করেই ক্যারেট নির্ধারিত হয়:
২২ ক্যারেট: এতে ৯১.৬৭% খাঁটি স্বর্ণ থাকে। চুড়ি, কানের দুল, নাকফুলসহ অধিকাংশ জুয়েলারি এই ক্যারেটেই তৈরি হয়।
২১ ক্যারেট: এটি ৮৭.৫% খাঁটি। ২২ ক্যারেটের চেয়ে শক্ত হওয়ায় নিত্যদিনের ব্যবহারের আংটি, চেইন, ব্রেসলেট ও সূক্ষ্ম ডিজাইনের গহনার জন্য এটি বেশি জনপ্রিয়।
১৮ ক্যারেট: এতে ৭৫% স্বর্ণ থাকে এবং বাকি ২৫% অন্য ধাতু। এটি অনেক বেশি শক্ত হওয়ায় হীরার (ডায়মন্ড সেট) গহনা বা দামি পাথর মজবুতভাবে ধরে রাখতে এই ক্যারেট উপযুক্ত।
খাঁটি স্বর্ণ চিনবেন যেভাবে
খাঁটি স্বর্ণ চেনার সবচেয়ে সহজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উপায় হচ্ছে গহনার গায়ে খোদাই করা ‘হলমার্ক’ সিল দেখে নেওয়া। আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, ক্যারেট অনুযায়ী গহনায় নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যা লেখা থাকে।
আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, হলমার্ক সংখ্যা হিসেবে ২৪ ক্যারেট সোনার জন্য ৯৯৯.৯, ২২ ক্যারেটের জন্য ৯১৬, ২১ ক্যারেটের জন্য ৮৭৫ এবং ১৮ ক্যারেটের জন্য ৭৫০ সংখ্যা ব্যবহার হয়। এই সংখ্যাগুলো নির্দিষ্ট ক্যারেটের পরিচয় হিসেবে গহনার গায়ে খোদাই করে লেখা থাকে। গহনা কেনার সময় ক্যারেট অনুযায়ী গহনার গায়ে থাকা হলমার্ক সিল দেখে নেওয়া জরুরি।
এছাড়া স্বর্ণের আসল-নকল যাচাইয়ে নাইট্রিক এসিড টেস্ট, চুম্বক পরীক্ষা, পানির পরীক্ষা এবং সিরামিক প্লেট টেস্টের মতো কিছু প্রচলিত পদ্ধতিও রয়েছে।
হলমার্ক করার পাশাপাশি ‘কেডিএম স্বর্ণ’ নামেও এক ধরনের স্বর্ণের প্রচলন রয়েছে, যেখানে নরম স্বর্ণ গহনা তৈরির উপযোগী করতে ক্যাডমিয়াম নামের ধাতু মেশানো হয়। তবে এটি কারিগর ও ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় বর্তমানের স্বর্ণে ক্যাডমিয়াম মেশানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বাংলাদেশে হলমার্ক করা অলংকার বিক্রি বাধ্যতামূলক হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই তা মানছে না। জালিয়াতি রোধে বাজুস বর্তমানে একটি অনলাইন পদ্ধতি চালু করছে। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট কোড মোবাইল অ্যাপে দিয়ে গ্রাহকরা সহজেই জানতে পারবেন গহনাটি কোন দোকানের, কত ক্যারেটের এবং সেটি আসল নাকি নকল।
ভরি বনাম গ্রাম: ওজনের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় হিসাব
গত কয়েক বছর ধরেই ঊর্ধ্বমুখী স্বর্ণের বাজার। অস্থির স্বর্ণের বাজারে দাম ওঠানামা করছে অনেক বেশি। এমন প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ এবং এর একক সম্পর্কেও ধারণা রাখা জরুরি। কারণ স্বর্ণের ওজন মাপার আন্তর্জাতিক একক এবং বাংলাদেশে প্রচলিত এককের কারণে সঠিক দাম বুঝতে অনেক সময় জটিলতা তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে সোনা, রুপাসহ এ ধরনের দামি ধাতুর ওজন মাপার জন্য ‘ট্রয় আউন্স’ একক ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ আউন্স এককের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এক আউন্স সমান ২৮.৩৫ গ্রাম হলেও, এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১.১০ গ্রাম।
অবশ্য বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্বর্ণের ওজনের ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয় ওজন পরিমাপের একক ‘ভরি’ শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত। সংখ্যার হিসাবে, এক ভরি সমান ১১.৬৬ গ্রাম এবং ২.৪৩ ভরিতে এক ট্রয় আউন্স হয়। এছাড়া ৮ রতিতে এক আনা এবং ১৬ আনায় এক ভরি হিসাব করা হয়।
বাজুস সভাপতি জানান, প্রবীণরা ভরির হিসাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘গ্রাম’ ব্যবহার করাই সবচেয়ে নির্ভুল।